সন্তোষবাবু বীরেনবাবুর সঙ্গে কানে কানে কথা বলে নিয়ে তার পক্ষে যতটা আস্তে সম্ভব ততটা আস্তে বলে দেন, তা হলে অন্তত এটুকু প্রমাণ হল যে কংগ্রেসিরা উত্তরখণ্ড করছে না। কারণ, উপেনবাবু চিরকাল কংগ্রেসি।
সন্তোষবাবুর কথাটা সবাই শুনতে পায়, সবাইকে শোনানোর জন্যেই তিনি বলেছেন। হয়ত তার আসল উদেশ্য ছিল–উপেনবাবুর নাম করায় মিটিঙে সরকারের বক্তব্যের পক্ষে যে-সমর্থন তৈরি হয়ে যাচ্ছিল সেটা নষ্ট করে দেয়া।
শিল্পমন্ত্রী মাথা ঝাঁকিয়ে বলে ওঠেন, সন্তোষবাবু, উপেনদাকে এ-সব কথার মধ্যে টানবেন না। আফটার অল হি ইজ অ্যাবাভ পেটি পলিটিক্স। আমাদের সকলেরই শ্রদ্ধেয়। উনি যদি আসেন খুব ভাল
সন্তোষবাবু বলে ওঠেন, আরে, আমরা কখন উপেনদার নাম করলাম, আপনারাই ত করলেন। উনি ত এ-সবের কিছু জানেনই না। আপনারা কী ব্রিফ করেছেন তা আপনারাই জানান। এখন আপনারা তার নাম করে একটা ডিসিশন আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন।
সুবিমলবাবু একটু হেসে, তোমার মত এ্যাডভোকেটকে কুচবিহার থেকে ধরে এনেছে ডিসিশন কি আর সহজে হবে?
সন্তোষবাবুও একটু হেসে বলেন, সে ত তোমাকেও ভাই কুচবিহার থেকেই ধরে এনেছে। তা হলে তুমিও কথা বলো না, আমিও বলব না–এরা জলপাইগুড়ির ব্যাপার এখানে বসেই মিটিয়ে নিক।
ময়নাগুড়ির এম-এল-এ হো হো করে হেসে ওঠেন। অফিসাররাও হেসে ফেলেন। সম্মিলন ও অনুষ্ঠানের লোকজনের মধ্যেও একটা গুঞ্জন ওঠে–সমর্থনের। এই হাসাহাসির ফলে মিটিঙে যে-একটা তাপ জমেছিল সেটা কেটে যায়।
সেই হাসাহাসিটা থামলে বীরেনবাবু গলা পরিষ্কার করেন কিন্তু কেউ খেয়াল করে না। তিনি একটা হাত তোলেন। সেটাও কেউ খেয়াল করে না। হঠাৎ সন্তোষবাবু ইংরেজিতে বলে ওঠেন, মিস্টার মিনিস্টার্স, দয়া করে একটু মনোযোগ দিন, বীরেন্দ্রনাথ বসুনিয়া, এই জেলার একজন প্রথম শ্রেণীর উকিল, কলকাতা হাইকোর্টও যার দ্বারা উপকৃত হতে পারত এবং শ্রদ্ধেয় উপেনবাবুর মতই যিনি শ্রদ্ধেয়, যদিও আপনাদের কাছে এখনো সম্ভবত অজ্ঞাত, কিছু কথা বলতে চান। এবং আপনাদের অবগতির জন্যে এই সুযোগে জানিয়ে রাখি যে আজ আমাদের মধ্যে দেবনাথ রায়ও আছেন-রাজবংশী সমাজের প্রথম পি-এইচ-ডি।
ময়নাগুড়ির এম-এল-এ হেমেনবাবু ও বনবিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রী ভুবনমোহনবাবু টেবিলের ওপর হুমড়ি খেয়ে বীরেনবাবুর দিকে তাকান। বীরেনবাবু টেবিলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি হয়ত ওঁদের দেখতে পান না। হেমেনবাবু বলেন, কাকা, বলেন। ভুবনমোহনবাবুও বলে ওঠেন, দাদা, বলেন, বলেন। সবাই চুপ করে যায়। বীরেনবাবু গলাটা আবার পরিষ্কার করে বলেন, আমার একটা কথা জানার আছে–এটাকে কি আমরা আইনের দিক থেকে দেখছি, নাকি রাজনীতির দিকে থেকে দেখছি, নাকি প্রশাসনিক আইন-শৃঙ্খলার দিক থেকে দেখছি।
বীরেনবাবু থেমে যান। তার নিচু স্বরের কথা শোনার জন্যে অফিসাররা টেবিলের ওপর এগিয়ে আসেন, সম্মিলন ও অনুষ্ঠানের লোকরাও মাথা এগিয়ে দেয়, শিল্পমন্ত্রী তার চেয়ারে বসে থেকেই এগিয়ে আসেন। সন্তোষবাবুই একমাত্র চেয়ারে হেলান দিয়ে হাসিমুখে সকলের মুখের দিকে তাকান। যেন, তিনি জানেন বীরেনবাবু কী বলবেন ও তা বলার ফলে অবস্থাটা কী রকম বদলে যাবে। বা, বীরেনবাবুর একেবারে পাশে বসে তিনি কথাগুলো সবচেয়ে ভাল শুনতে পাচ্ছিলেন আর সেই কারণেই শোনার জন্যে তাকে কোনো অতিরিক্ত চেষ্টা করতে হচ্ছিল না। বীরেনবাবু যেন একটু সময় দেন তার প্রশ্নের জবাবের জন্যে, তারপর আবার শুরু করেন।
মানমীয় পর্যটনমন্ত্রী এই মিটিঙের শুরুতে বলেছেন যারা অনুমতি নিয়েছেন তারা ফাংশন করতে পারবেন। তার সঙ্গে সম্মেলন করা যাবে না। তা হলে এটা আইনের প্রশ্ন। আর, তারপরে আবার নানা কথায় মনে হল, সরকার সম্মিলন ও অনুষ্ঠান এক জায়গায় হলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আশঙ্কা করছেন। আমরা সম্মিলনই করি আর অনুষ্ঠানই করি শান্তিপূর্ণ ভাবে করতে চাই। তা ছাড়াও, এখানে কংগ্রেস ও উত্তরখণ্ডের কথা উঠেছে। সেটা রাজনীতির প্রশ্ন। আমরা কোনটা আলোচনা করব সেটা আগে ঠিক করে না নিলে, এ মিটিঙে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না। বা, আমাদের মনে হতে পারে, যে, সরকার যেভাবেই হোক তাদের ইচ্ছা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। বীরেনবাবু থেমে যান। কিন্তু তার ভঙ্গি একটুও বদলায় না। সবাইকেই অপেক্ষা করতে হয় যে তিনি আরো কিছু বলেন কিনা।
শিল্পমন্ত্রী চেয়ারটা একটু এগিয়ে আনেন। সুবিমলবাবু চেয়ারের ওপর কনুই রেখে হাতদুটো খাড়া রাখেন আর পাদুটো নাড়াতে থাকেন। ময়নাগুড়ির এম-এল-এ মুখটা বাড়িয়ে বলেন, কাকা, আপনিই বলেন না কেন, আইনের কথা বাদ দেন, কিন্তু এক দিনে শ্রীদেবীর নাচ আর আপনাদের সম্মিলন হলে ত সাংঘাতিক অবস্থা হবে, পুলিশ দিয়েও ত সামলানো যাবে না, শ্রীদেবীর নাচে ত শুনছি আসাম বিহার থেকেও লোক আসবে ট্রাক-ট্রাক।
সুবিমলবাবু পা নাড়াতে-নাড়াতেই মুচকি হেসে বলেন, সন্তোষই ত কুচবিহার থেকে দুই ট্রাক লোক নিয়ে আসবে।
সন্তোষবাবু সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, দুই ট্রাক কেন? তুমি যে সেদিন ফোন করে বললে তোমার একটা আলাদা ট্রাক চাই কিন্তু মন্ত্রীর নামে ভাড়া করলে খারাপ দেখায়, আমি যেন ভাড়া করে রাখি, সেটা ধরলে তিন ট্রাক।
