সুবিমলবাবুর ডান দিকের প্রথম চেয়ারে বনবিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রী ভুবনমোহন রায়–উনিই একমাত্র রাজবংশী মন্ত্রী। তাঁর পাশে ময়নাগুড়ির এম-এল-এ হেমেনবাবু। তারপর থেকে উত্তরখণ্ড ও অনুষ্ঠানের লোকজন বসেছেন। কিন্তু তাদের সবার জায়গা হয় না, তখন প্রথম সারির পেছনে স্টিলের চেয়ার পাততে হয়। সেই দ্বিতীয় সারির সবার বসা শেষ হওয়ার আগেই সুবিমলবাবু একবার ডাইনে-বাঁয়ে তাকিয়ে বলেন, নিন শুরু করুন, বেশিক্ষণ মিটিঙ করা যাবে না, আপনাদের যা সমস্যা সেগুলো প্রথমে বলুন।
কথাটা কে শুরু করবে তা নিয়ে একটু ইতস্তত দেখা যায়। ডি-সি তাকান ডি-এস-পির দিকে, ডি-এস-পি তাকান ওসির দিকে। সেটা ও-সি দেখতে পান না, কারণ তিনি ভেবেছেন উত্তরখণ্ডীরাই কথা আগে শুরু করবে, সেই জন্যে বীরেনবাবুর দিকে তাকান। বীরেনবাবু টেবিলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন বলে ওসির তাকানো দেখতে পান না। কিন্তু নকুল সবার দিকেই তাকাচ্ছিল বলে বুঝে ফেলে ও-সি বীরেনবাবুকে শুরু করতে বলছেন। নকু বীরেনবাবুর পাশে, সন্তোষবাবুর পরে। সন্তোষবাবুর পেছন দিয়ে বীরেনবাবুর পিঠে একটা ছোেট খোঁচা দিতেই বীরেনবাবু ধীরে মাথা ঘোরান। নকুল মাথার ইশারায় শুরু করতে বলে। বীরেনবাবু খুব ধীরে সন্তোষবাবুকে বলেন, সন্তোষ, বলো।
সন্তোষবাবুকে কোচবিহার থেকে আনা হয়েছে। তিনি গলা খাকারি দিয়ে বলেন, অনারেবল মিনিস্টারস, আমরা ত প্রপার পারমিশন নিয়ে ফাংশন করছি। আজ বুধবার। শনিবার আমাদের ফাংশন শুরু। শুধু যে লাখ-লাখ টাকা ইনভলভড তাই না, হাজার-হাজার লোক আসবে। এখন এই মিটিং ডাকা হল কেন আমরা বুঝতে পারছি না। সন্তোষবাবুর গলার জোর আছে। সে-জোরটা এতই বেশি যে এইটুকু ঘরে এই ক-জনের মিটিঙে বেখাপ্পা শোনায়। এ-মিটিঙে পরে ওরকম চড়া গলায় কথা হতে পারে বটে কিন্তু শুরু হওয়ার কথা ছিল যেন আরো অন্য রকম ভাবে।
সুবিমলবাবু শাদা চাদরে মুখ ঢেকে ছিলেন। মুখ থেকে চাদরটা নামান না কিন্তু চাদরের ভেতর থেকে হাতটা সরান যাতে তার কথাটা স্পষ্ট বোঝা যায়। তিনি তার স্বাভাবিক স্বরেই কথা বলেন কিন্তু তার স্বাভাবিক স্বরটাই খুব ভারী। তাই সন্তোষবাবুর চড়া কথার জবাবে তার কথাটা চড়া শোনাল না বটে কিন্তু কঠিন শোনাল, তোমাদের ত কিছু বলা হয় নি। তোমরা যে-ফাংশনের জন্যে পারমিশন নিয়েছ সেই ফাংশনটাই করবে। কিন্তু যারা পারমিশন নেন নি তারা তোমাদের ফাংশনের সঙ্গে মিশে কোনো ফাংশন বা কনফারেন্স করতে পারবে না।
সন্তোষবাবুর কথা ও সুবিমলবাবুর জবাবের পর সবাই হঠাৎ চুপ করে যায়। কেউই বোঝেন না কোন কথা দিয়ে সভাটা আবার চালু হবে। সুবিমলবাবু চাদরের ভেতরে তার হাতটা আবার মুখের কাছে নিয়ে এসেছেন।
সুস্থির একটু পরে বলে ওঠে, আমাদের একটা কথা বলার ছিল। যেন কেউ তাকে অনুমতি দেবে। সুস্থির এমন একটু অপেক্ষা করে। তারপর বলে, তা হলে আমাদের এই মিটিঙে ডাকার কোনো দরকার। ছিল না। সরকার আমাদের জানিবার পারিতেন যে উত্তরখণ্ড সম্মিলনের পারমিশন নাই। আমরা স্থির করি নিতাম সরকারের নিষেধ সত্ত্বেও আমরা সম্মিলন করিব কি না করিব। সুস্থিরের কথার সমর্থনে পেছনের সারি থেকে গুঞ্জন ওঠে। গুঞ্জনটা ওঠে এমন স্বরে যেন মনে হয় সেটাকে থামিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু অফিসাররা ও সুবিমলবাবু শুধু সেদিকে তাকিয়ে থাকেন। ফলে গুঞ্জনটা আরো একটু ওঠে। তারপর থেমে যায়।
তারও একটু পরে সুবিমলবাবু বলেন, এবার চাদরটা মুখ থেকে সরিয়ে, উত্তর খণ্ড কি কোন্ খণ্ড কোথায় কী সম্মিলন করবে তা নিয়ে সরকারের মাথাব্যথা নেই। যদিও আইন অনুযায়ী এই সম্মিলনের জন্যেও পুলিশের পারমিশন নিতে হয়। কিন্তু ফাংশনের জন্যে যে-জায়গার অনুমতি দেয়া হয়েছে, সেখানে ও-ধরনের কোনো রাজনৈতিক সম্মেলন হলে আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। সেই জন্যেই সরকার বলছে, ফাংশনের জায়গায় ফাংশনই হবে, কোনো সম্মিলন-টম্মিলন করা চলবে না। এটাই সোজা কথা।
.
১৬৪. শ্রীদেবীর নাচ ও জল্পেশ অভিযান নিয়ে আরগুমেন্ট
মিটিঙটা আবার চুপ করে যায়। কিছুক্ষণ পর ডি-সি ডাকেন, স্যার। সুবিমলবাবু ডি-সির দিকে তাকান। এই সব কালচারাল ফাংশনের ব্যাপার বলে আমরা দুজনকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছি আসতে–উপেনবাবু আর সমীরবাবু। উপেনবাবুর শরীরটা খারাপ
পেছন থেকে শিল্পমন্ত্রী বলেন, উপেনবাবু মানে উপেনদা? মানে, উপেন বর্মন মশাই?
ডি-সি সেদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলেন, হ্যাঁ, স্যার।
তিনি কি এসবের মধ্যে আছেন নাকি?
না স্যার। কিন্তু জেলার ওল্ড সিটিজেন হিশেবে তার কথার ত একটা বিশেষ মূল্য থাকতে পারে। তিনি দুপুরের দিকে একবার আসার চেষ্টা করবেন বলেছেন। কিন্তু আমাদের কাছে বলেছেন, এই সব কালচারাল ফাংশনের সঙ্গে কোনো পলিটিক্যাল ব্যাপার যুক্ত করা উচিত নয়। ডি-সি ঘাড় ঘুরিয়ে কথাটি শিল্পমন্ত্রীকে বলেন বলে মিটিঙে সবাই সেটা শুনতে পায় না। কিন্তু কথাটা শুনে শিল্পমন্ত্রী সোজা হয়ে বলেন, সেটা মিটিঙে বলুন যে উপেন্দ্রনাথ বর্মনের মত সিনিয়ার লোকও বলেছেন যে ফাংশন হোক কিন্তু সম্মিলন-টম্মিলন যেন না হয়। শিল্পমন্ত্রী এত জোরে বলেন যে মিটিঙের সবাই নড়েচড়ে বসে। যেন উপেনবাবুর কথার পর এ নিয়ে আর-কোনো কথা হতেই পারে না, মিটিঙ যেন শেষ হয়ে গেল। উপেন্দ্রনাথ বর্মনের নামের একটা প্রতিক্রিয়া বিশেষত উত্তরখণ্ডীদের মধ্যে হয়। রাজবংশী সমাজে আর-কোনো লোক সারা দেশে এত সম্মানিত নন। কিন্তু তার জীবনের এই সাফল্য সত্ত্বেও তিনি কখনো নিজের রাজবংশী পরিচয়কে ছোট করে দেখেন নি। রাজবংশী সমাজের আর-যারা দেশের নানা জায়গায় নানা ভাবে কিছু কিছু সম্মান পেয়েছেন তারা হয় আর রাজবংশী নেই, বা, রাজা প্রসন্নদেব রায়কতের মত জমিদার। উপেন্দ্রনাথকে অস্বীকার করার কোনো উপায় উত্তরখণ্ডীদেরও নেই, সরকারেরও নেই।
