পেছন থেকে একজন এগিয়ে এসে বলে, হে হেমেন দাদা, আজেবাজে কথা বাদ দাও। এই ফাংশন বাতিল করা ধরিলে কিন্তুক কুরুক্ষেত্র হবা ধরিবে। একখান বুদ্ধি করেন।
এম-এল-এ হেমেনদা হেসে বলেন, আরে, কুরুক্ষেত্ৰখান বন্ধ করিবার তানেই ত মিটিংখা ডাকাছি। তা তোমরালা করিছেন উত্তরখণ্ড আর আনিবার ধইচছেন সেই বোম্বাইঠে শ্রীদেবীক।
স্যালায় আবার মাদ্রাজের বেটিছোঁয়া। এ ক্যানং উত্তরখণ্ড তোমরালার-ময়নাগুড়ি-মাদ্রাজ-বোম্বাই?
পেছন থেকে একটা লুকনো গলা শোনা যায়, তোমরালা যা শিখাছেন–দুনিয়ার মজদুর এক হো।
কায় রে? বলে এমএল-এ সমবেত হাসির মধ্যে মাথা নিচু করে লুকনো গলাটিকে খোঁজেন।
এই কায় রে? যে প্রথম কথাটা তুলেছিল সে ঘাড় ঘুরিয়ে ধমক দিয়ে আবার এম-এল-একে বলে, এখন আপনি মিটিঙের আগত একখান বুদ্ধি করি দেন, তারপর মিটিঙে যান।
বুদ্ধি আর আমারঠে কোটত। কংগ্রেসের তামান মানষিলা ত উত্তরখণ্ড করিবার ধরিছেন। য্যালায় বুঝি গেইছে পশ্চিমবঙ্গত আর কংগ্রেসের সরকার হওয়ার কুনো আশা নাই, স্যালায় এইঠে উত্তরখণ্ড বানি, ঐঠে গোখাল্যান্ড বানি, ঐঠে ঝাড়খণ্ড বানি বামফ্রন্টের সরকারক বাশ দিবার ধইচছে। বুদ্ধি ন্যান কেনে কংগ্রেসের দেউনিয়ারঠে। হামারঠে বুদ্ধি কোটত? এম-এল-এ হাসতে-হাসতেই কথা শুরু করেছিলেন, কিন্তু কথাটা শেষ করেন একটু রাগ মিশিয়েই। যে-লোকটি কথা শুরু করেছিল, সে বলে–আচ্ছা ধরেন কেনে, কংগ্রেসই সম্মিলনও করিছে, শ্রীদেবীকও নাচাছে। স্যালায় ত তোমরালা কিছু করিতেন না। এই হেমেনদা, একখান বুদ্ধি করো।
ঘরের ভেতর থেকে ডাক আসে, হেমেন, এসো।
এতক্ষণ পর্যটনমন্ত্রী তৈরি হচ্ছিলেন। সকালে তৈরি হতে ওঁর কিছুটা সময় লাগে। তার ডাক আসতেই এম-এল-এ ঘরের দিকে ঘোরেন, ভিড়টা ছড়িয়ে যায়, অনেকে এম-এল-এর সঙ্গে-সঙ্গেই ঘরের ভেতরে ঢোকে। কেউ-কেউ আবার বারান্দা থেকে মাঠে নেমে যায়। দু-একজন মিটিঙের ঘরের জানলার কাছে দাঁড়ায়।
.
১৬৩. সম্মিলন ও অনুষ্ঠান নিয়ে সরকারি আলোচনা
টেবিলটা ঘিরে সকলের বসতে একটু সময় যায়। ডেপুটি কমিশনার, এ্যাডিশন্যাল ডি-সি, এ্যাডিশন্যাল এস-পি, সদর এস-ডি-ও, ডি-এস-পি, এরা বসার জায়গার সোফাতে, ও ময়নাগুড়ির ও-সি, ভেতরে যাবার দরজার পাশে একটা কাঠের চেয়ারে বসে ছিলেন। পর্যটনমন্ত্রী বেরন নি বলে মিটিঙটা শুরু হচ্ছিল না বটে কিন্তু তার আগেই শিল্পমন্ত্রী বেরিয়ে এসে, কই, সুবিমলদার হল, বলে দাঁড়াতেই অফিসাররা সবাই উঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন। শিল্পমন্ত্রী তাঁদের বসুন বললেও তাঁরা বসেন না। কিন্তু তার লোকজন তাকে খাবার জায়গার ওদিকে মিটিঙের জায়গার দিকে ডেকে নিয়ে যেতেই অফিসাররা আবার বসে পড়েন। এর কিছুক্ষণ পর বনবিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রী বেরিয়ে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে একটু এদিক-ওদিক তাকান। ময়নাগুড়ি থানার ওসি দাঁড়িয়ে পড়েন। একটু পরে এস-ডি-ও। কিন্তু ডি-সি আর এ-ডি-সি ওঠার ভঙ্গিমাত্র করেন।
কিছু একটা মনে পড়ায় এস-ডি-ও, তাঁর কাছে গিয়ে বলেন, স্যার, এটা একেবারেই অন্য মিটিঙ বলে ডি-এফ-ও আসেন নি। কিন্তু উনি ওঁর অফিসে আছেন। আপনার সময় হলে বলবেন। আমি ওঁকে ফোন করে দেব।
সময় ত আপনাদের হাতে। মিটিঙ যখন শেষ করবেন, তখন। আচ্ছা, বলে তিনি আবার ভেতরে চলে যান।
আরো কিছুক্ষণ পর পর্যটনমন্ত্রী বেরন। ওঁর একটু হাঁফানির কষ্ট আছে। খুব পাতলা ধুতির ওপর মোটা গরম পাঞ্জাবি, তার ওপর শাদা গরম চাদর-তুষ। তবু যেন মুখচোখ একটু ফোলা ফোলা লাগছিল! তিনি এসে দাঁড়াতেই সবাই উঠে দাঁড়ান, অফিসাররা বেরিয়ে আসেন, এবার মিটিং শুরু হবে। পর্যটনমন্ত্রী মিটিঙের জায়গার দিকে যেতে গিয়ে ঘুরে জিজ্ঞাসা করেন, হেমেন কোথায়? তারই ত ব্যাপার।
এস-ডি-ও বলেন, উনি বাইরেই আছেন স্যার।
পর্যটনমন্ত্রী বাইরের দরজার দিকে দুপা গিয়ে জোরে ডাকেন, হেমেন, এসো। তারপর তিনি মিটিঙের জায়গায় গিয়ে টেবিলের মাথার চেয়ারটিতে বসে পড়েন। তার পেছনে-পেছনে অফিসাররা এসে পর্যটনমন্ত্রীর বা দিকের চেয়ারগুলোতে বসেন–একটা চেয়ার শিল্পমন্ত্রীর জন্যে খালি রেখে। প্রথমে ডি-সি, তারপর এ-ডি-সি, এ-ডি-সির পাশে এ-এস-পি, তার পাশে এস-ডি-ও, ডি-এস-পি। ময়নাগুড়ি থানার ওসি, ডি-এস-পিকে জিজ্ঞাসা করেন, স্যার, আমি তাহলে ওদিকে অপেক্ষা করি, দরকার হলে ডাকবেন।
না, না, আপনাকেই ত ব্রিফ করতে হবে, এখানে বসুন বলে নিজের পাশের চেয়ারটি দেখান। ও-সি চেয়ারটা একটু সরিয়ে ভেতরে ঢোকেন, আরো একটু সরিয়ে বসেন। কিন্তু চেয়ারটা টেবিলের প্রায় শেষ প্রান্তে বলে বোঝা যায় না তিনি চেয়ারটা একটু সরিয়ে বসলেন। মনে হতে পারে, তিনি পর্যটনমন্ত্রীর মুখোমুখি হওয়ার জন্যে একটু কোনাচে হলেন মাত্র।
এরা সব বসতে বসতেই বাইরে যারা ছিল, তারা ভেতরে ঢুকতে থাকেন। শিল্পমন্ত্রী ঢোকেন। শিল্পমন্ত্রী জলপাইগুড়ির এম-এল-এ। তাঁকে অফিসারদের পেছন দিয়ে এসে টেবিলের মাথায় গিয়ে দাঁড়াতে হয়। তিনি দেখেন, তার জন্যে একটা চেয়ার খালি রাখা হয়েছে। সে-চেয়ারটাকে টেনে তিনি একটু সরিয়ে এনে টেবিল থেকে একটু দূরে কিন্তু পর্যটনমন্ত্রীর প্রায় পাশে নিয়ে যান। তাতে ওদিক দিয়ে যাতায়াতের একটু অসুবিধা হবে কিন্তু তিনি ওখানেই বসে পড়েন। সাধারণত রীতি আছে, জেলায় এ-ধরনের মিটিঙে জেলার কেবিনেট মন্ত্রী কেউ থাকলে তিনিই সভাপতিত্ব করেন। শিল্পমন্ত্রীরই সেক্ষেত্রে সভাপতিত্ব করার কথা। কিন্তু সুবিমলবাবু যে-কোনো মিটিঙেই প্রধান আসনটিতে গিয়ে বসেন। সেটা তার বয়সের জন্যেও বটে আবার হয়ত পার্টির সুবাদেও অনেকটা। অবিশ্যি এক্ষেত্রে ত আর সভাপতির নাম কেউ প্রস্তাব করে না। বিবরণ যদি লেখা হয়, তাতে মন্ত্রীদের নাম পরপর থাকবে। কিন্তু তবু সভা পরিচালনার একটা নিয়ম থাকেই। তা ছাড়া, এই ঘটনাটার সঙ্গে সুবিমলবাবু জড়িতও নন। ঐ চেয়ারটা যে সভাপতির চেয়ার তাও ঠিক করা নেই। তবু শিল্পমন্ত্রীরই ঐ চেয়ারে বসার কথা। তিনি যদি আগে এই জায়গাটিতে আসতেন তা হলে ঐ চেয়ারটাতেই বসতেন। কিন্তু এখন সুবিমলবাবু ঐ চেয়ারটাতে বসে যাওয়ায় তিনি তার চেয়ারটাকে একটু সরিয়ে এনে নিজের বসার জায়গাটাকে বিশিষ্ট করতে চাইলেন।
