সার্কিট হাউস এখনো সার্কিট হাউসই। মন্ত্রীরা, বড়বড় অফিসাররাত এখানে এসে ওঠেন। কিন্তু মন্ত্রীদের আসার সুবাদেই সার্কিট হাউসের ব্যবহার একটু বদলেছেও। মন্ত্রীদের সঙ্গে মিটিঙগুলো সার্কিট হাউসেই হয়–সে-মিটিং অফিসারদের সঙ্গেও হতে পারে, তা সর্বদলীয় মিটিঙও হতে পারে। মিটিঙের জন্যে কোনো হল না থাকায় খাওয়ার জায়গায়, খাওয়ার লম্বা টেবিলটাকে ঘিরেই মিটিং বসে। অনেক সময়ই তাতে জায়গা কুলোয় না–তখন দ্বিতীয় সারি চেয়ার সাজাতে হয়। কিন্তু এই খাবার ঘরটার টেবিল ও এক সারি চেয়ারের পেছনে দ্বিতীয় সারি চেয়ার সাজালে নড়াচড়ার আর-জাগয়া থাকে না। ভেতর থেকে কেউ বাইরে বেরতে গেলে স্টিলের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চেয়ার ভাজ করে জায়গা দিতে হয়। তাই বেশির ভাগ সময়ই তেমন বড় মিটিঙের ভিড়টা ঘর থেকে বারান্দায় উপছে আসে। বারান্দার দরজায় লোজন ভিড় করে থাকে। তা ছাড়াও বসার জায়গা ও খাওয়ার জায়গাটা ভাগ করে যে-পার্টিশন আছে, সেই পার্টিশনের কাছেও লোকে ভিড় করে আসে।
সেদিনের মিটিঙে ভিড় অতটা হয় নি কারণ বিষয়টা শহর নিয়ে নয়, ময়নাগুড়ি নিয়ে। কিন্তু শ্রীদেবীর ফাংশন বাতিল হতে পারে এরকম একটা কথা মাত্র একদিনের মধ্যে জলপাইগুড়ি শহরে সামান্য একটু রটেছিল। ফলে, ব্যাপারটা কী জানতে কেউ-কেউ এসেছিল। কিন্তু মিটিঙের ভেতরে যাবে না অথচ মিটিঙে কী হচ্ছে সে ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ময়নাগুড়ির লোকজন অনেকেই চলে এসেছে। যারা এসেছে তাদের মধ্যে এই উত্তরখণ্ড সম্মেলন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নানা ধরনের কর্মী ত আছেই, তা ছাড়াও যারা টিকিট কিনেছে–ফাংশন দেখতে যাবে, তাদেরও একটা বড় অংশ আছে।
কর্মীদের মধ্যে যারা মিটিঙে ঢুকতে পারে নি তারাই যে শুধু বাইরে আছে, তা নয়। এমন অনেকেই বাইরে বারান্দায় ঘোরাফেরা করছে বা বারান্দার কিনারে মাটিতে পা ঝুলিয়ে বসে আছে, যারা এই সম্মেলন অনুষ্ঠানের কর্মকর্তা ও তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্যেই এই মিটিঙ ডাকা হয়েছে। কিন্তু এই কর্মকর্তারা যেন মিটিঙের দায়িত্ব অন্যদের ওপর ছেড়ে দিয়ে নিজেরা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে–মামলা-মোকদ্দমার সময় যেমন এজলাশের বাইরে থাকে, উকিল-মোক্তাররা ভেতরে মামলা লড়ে।
যারা বাইরে বসে ছিল ও ঘোরাঘুরি করছিল, তাদের চোখের ওপর দিয়েই সম্মিলন ও অনুষ্ঠানের পোস্টারমারা বাস কোর্টের দিকে যাচ্ছিল, কোর্ট থেকে ফিরছিল। এমন-কি, একটা মিনি বাসের পেছনে মিস্টার ইন্ডিয়া ফিল্মে শ্রীদেবীর একটা নীচের রঙিন ছবি টাঙানো।
জলপাইগুড়ির এম-এল-এ আর কোচবিহারের নাটাবাড়ির এম-এল-এ মন্ত্রী। ডুয়ার্সের আর-এক এম-এল-এ বনবিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রী। এদের কাউকে বাইরে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু ময়নাগুড়ির এম-এল-এ বাইরে এসে অনেকের সঙ্গেই কথা বলছিলেন। এম-এল-এ যখন প্রথম বাইরে এসেছিলেন তখন তার হাতে একজন নিজের কাজের কথা বলেই তিনটি কাগজ ধরিয়ে দেয়। সেই কাগজগুলি পাকিয়ে এম-এল-এ ডানমুঠোতে আলগা করে ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু সেই ডান হাতটাই তিনি এত নাড়াচ্ছিলেন কখনো মাথার পেছনে নিয়ে যাচ্ছিলেন, কখনো কারো পিঠে আলতো করে রাখছিলেন, কখনো কাউকে ছোট কিল মারছিলেন যে মনে হচ্ছিল, ঐ কাগজগুলো পাকিয়ে হাতের মুঠোয় না রাখলে তিনি হাতটা অত ব্যবহার করতে পারতেন না। এম-এল-এর জামাকাপড়ের রঙটা আধ-ময়লা, গলায় একটা চাদর জড়ানো। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, এ-মিটিঙের সঙ্গে তার সম্পর্ক সবচেয়ে দূরের। অথচ আসলে, এ-মিটিঙের সঙ্গে তার সম্পর্ক দুদিক থেকে নিবিড়। ঘটনাটা ঘটছে ময়নাগুড়িতে। সুতরাং সরকার পক্ষের আশা, যে, তিনি আগে কথাবার্তা বলে কোনো সমাধান ঠিক করে রাখবেন। আবার, অনুষ্ঠানকর্তাদেরও আশা যে তিনি একটা উপায় বালাতে পারবেন। কিন্তু এম-এল-এর কথাবার্তায় ও চলনবলনে কোনো উদ্বেগই ধরা পড়ছিল না।
এম-এল-এ বারান্দার ওপরে কিন্তু সিঁড়ির কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিলেন, ফলে সবাই তাকে ঘিরেই গোল হয়ে কথা বলছিল। এম-এল-এ একটি পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের ছেলের কাঁধে হাত দিয়ে তাকে বলেন, এ ক্যানং কথা কহিছিস তুই? উত্তরখণ্ড পার্টি করিবারও ধরবু আবার মোর পার্টিও করিবার ধরব? ছেলেটা হেসে বলে, কেনে ধরবু না, কহেন?
বোঝা যায় এরা একটু রসিকতা করেই রাজবংশী ভাষায় পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছে।
এম-এল-এ হেসে উঠে বলেন, মোক ধাঁধা ধইচছিস? টিভির কুইজ? আচ্ছা, মুই তোক ধরছু, তুই ককেনে। হামরালার কমিউনিস্ট পার্টি চাহে এই সারা দুনিয়ার বদল, আর তোর এই উত্তরখণ্ডটা চাহে এই তোর তিস্তা পারের বদল। ত, দুনিয়াটা বদলি গেলে ত তিস্তাপারটাও বদলিবে। কিন্তু তিস্তাপারটা বদলি গেলে কি দুনিয়াটা বদলিবে, ক কেনে, ক।
ছেলেটি দুটো হাত মুখের কাছে এনে একটু-একটু হাসছিল। তার হাসির লজ্জায় অথচ তার সপ্রতিভার ঔজ্জ্বল্যে তাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। কোথায় যেন একটা মিল ছিল–ঐ এম-এল-এর জামাকাপড়ের মলিনতা আর পরিশ্রমী শরীরের স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে এই যুবকের সৌন্দর্যের। কিন্তু কোথাও একটা অমিলও যেন ছিল–এম-এল-এর মুখমণ্ডলের নিশ্চয়তাবোধের সঙ্গে এই যুবকের সলজ্জ অনিশ্চয়তাবোধের। এমএল-এর কথার শেষে একটু হাসির গমক ওঠে। সেটা শেষ হয়ে গেলে, যুবকটি বলে ওঠে, সেই তানে ত দুনিয়া বদলিবার কাজে লালঝাণ্ডা করি তোমাক এম-এল-এ বানাছু, আর উত্তরবঙ্গের কাজে উত্তরখণ্ড পাকড়িছু। একথায় হাসিটা আরো বেড়ে যায়–এম-এল-এ ছেলেটির কাধ থেকে হাত নামিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার পেছনে একটা ঘুসি মারেন। যুবকটি নাচের ভঙ্গিতে সরে যায়। ভিড়টা বদলে যায়।
