আমিও সেই বলছিলাম কাকা, জগদীশ বলে, তা হলে, আপনি ত আছেনই, কিন্তু আপনি একা-একা কত কথা কহিবেন। স্যালায় জুনিয়ার উকিল দুই-একটা যদি নিগি যাওয়া যায় ত ভাল হয়। জুনিয়াররা চিল্লামিল্লি করিবার পারিবে–আপনি শ্যাষ কথাটা কহি দিবেন।
নকুল হেসে উঠে বলে, আরে কাকার ত মুখ তুলতে হবে, হাত তুলতে হবে, গলা পরিষ্কার করতে হবে–তার পরে কথাটা বলবেন। তার মধ্যে ত সরকারি পার্টির লোকরা জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ করে দেবে। সকলে হেসে ওঠে। একটু মৃদু হেসে বীরেনবাবু বলেন, তোমরা কি কারো কথা ভেবেছ? রাজি হবে?
ভাবছিলাম দেবনাথ মাস্টারের কথা আর শিলিগুড়ির উমা উকিলের কথা, নকুল বলে বীরেনবাবুর দিকে তাকিয়ে থাকে। বীরেনবাবু একটু ভাবেন। তারপর চোখটা নামিয়ে বলেন, ওরা রাজি হবে?
শুনে ওরা চুপ করে থাকে।
বীরেনবাবু যোগ করেন, দেবনাথ উপস্থিত থাকলে খুব ভাল হয়। রাজবংশী সমাজের একমাত্র পি-এইচ-ডি। কিন্তু সে ত ইউনিভার্সিটিতে চাকরির চেষ্টা করছে, সে কি এ-সবে জড়িয়ে পড়তে চাইবে? আর উমাপদও খুব ভাল কিন্তু ওরা ত কংগ্রেসের ছিল।
কংগ্রেস ত কাকা, উত্তরখণ্ডের বেশির ভাগই। জগদীশ বলে।
না, কিন্তু তাদের ত সবাই চেনে না। উমাপদ শিলিগুড়ি কোর্টে অনেক দিন ধরে প্র্যাকটিশ করছে। এখন সরকার যদি প্রমাণ করে দেয় যে উত্তরখণ্ডের পেছনে কংগ্রেস আছে তা হলে ত সেটা এমন প্রচার করবে যে তোমরা আর কথা বলতে পারবে না। বীরেনবাবুর কথার পরে সবাই চুপ করে থাকে।
বীরেনবাবু আবার বলেন, কিন্তু তোমরা এটা ভাল ভেবেছ। এক কাজ করো, দেবনাথকে রাজি করাও, তাকে কোনো কথা বলতে হবে না। কিন্তু আমরা দরকার হলে তার কথা বলব। বীরেনবাবু একটু থেমে যান, তারপর বলেন, দেবনাথকে বলো, এতে তার চাকরির সুবিধেই হবে। আর কোচবিহারের সন্তোষকে আনো।
সন্তোষ মানে সন্তোষ মোক্তার? সুরেন জিজ্ঞাসা করে।
এখন এ্যাডভোকেট। কিন্তু সন্তোষের সঙ্গে তোমাদের কি আগে কথাবার্তা হয় নি? আমি ত যতদূর জানি ও এব্যাপারে সাপোর্টই করবে। সন্তোষ যদি সবটা না জানে, তা হলে ও রাজি নাও হতে পারে। ও এলে তোমরা যেটা চাইছ সেটা খুব ভাল হত–খুব স্ট্রংলি আরগু করতে পারত। তোমরা কালই চলে যাও। আমার নাম করে বলো। ওকে আনো। বীরেনবাবু থেমে যান। সবাই একটু চুপচাপ থাকে। তারপর তরণীবাবু বলেন, যেন বসে আছেন বলেই বলেন, নইলে বলতেন না–একটা কিছু উপায় ভেবে গেলে হত না?
উপায় মানে? সুরেন জিজ্ঞাসা করে।
ধরেন, সরকার বলল–উত্তরখণ্ড করা চলবে না আর আপনারা বললেন উত্তরখণ্ড আর ফাংশন দুটোই করতে হবে এতে ত আর সমাধান হবে না। আমি বলছিলাম–শেষদিনের মিছিলটা শুরু হওয়ার জায়গাটা যদি বদলাতে রাজি থাকেন তা হলে সরকার হয়ত আর-কিছু বলতে পারবে না, মানে ইচ্ছে থাকলেও বলতে পারবে না।
মিছিল মানে জল্পেশ্বর অভিযান? তিলক জিজ্ঞাসা করে।
হ্যাঁ, তরণীবাবু বলেন।
মানে, মিছিল হবে না? তিলক জিজ্ঞাসা করে।
না, না, মিছিল হবে। ধরেন, আপনারা রাজি হলেন যে ঐ শ্রীদেবীর নাচ থেকে মিছিল বের না হয়ে চৌপত্তি থেকে হবে, তাতে ত আর-কোনো ক্ষতি নেই। তরণীবাবু বলেন।
সে রকম আপোশের কথা ভাবতে হবে বৈকি। তা হলে তোমরা এসো, কালকে ঘোরাঘুরি করে কী হয় জানিও, বীরেনবাবু উঠে দাঁড়ান।
.
১৬২. জলপাইগুড়ি সার্কিট হাউসের স্থাপত্য
জলপাইগুড়ি সার্কিট হাউসে মিটিঙের ঘরটা খুব ছোট। আসলে এটা মিটিঙের ঘরই নয়, খাওয়ার ঘর। একটা ছোট্ট পার্টিশন দিয়ে বসার জায়গা আলাদা করা। সেই ইংরেজ আমলে টুরে আসা গরমেন্ট অফিসারদের জন্যে এরকম বাংলো ধরনের সার্কিট হাউসটা তৈরি হয়েছিল। জলপাইগুড়ি শহর জেলার সদর, তদুপুরি কমিশনার জলপাইগুড়িতেই থাকেন। সুতরাং জেলার অফিসারদের টুরে আসার। কোনো সুযোগই ছিল না। এক আসতেন কলকাতা থেকে গবর্মেন্টের সবচেয়ে বড় কর্তারা। অন্য জেলা থেকে অফিসাররা কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে বা জেলা কোর্টে সাক্ষী দিতে আসতেন। ভারতীয় অফিসাররা স্বাধীনতার আগে এই সার্কিট হাউসে বোধ হয় খুব একটা উঠতেন না–তাঁরা বরং স্টেশনের কাছে ডাকবাংলোটা পছন্দ করতেন। সার্কিট হাউস প্রধানত ছিল সাহেবদেরই জন্যে। সাহেবদের কথা ভেবেই জায়গাটা বাছা হয়েছিল। এখন এই রাস্তার পুবে, তিস্তার পাড়ে কমিশনারের, ডিস্ট্রিক্ট জজের, ডেপুটি কমিশনারের ও ডিভিশন্যাল ফরেস্ট অফিসারের বিরাট-বিরাট বাংলো–লাল ইট, ঢালু ছাদ আর বিঘে-বিঘে বাগান। রাস্তার পশ্চিমে বিরাট জামবাগানের মাঠ, তার পাশে করলা নদী। এই করলা নদীর পাড়ে, জামবাগানের মাঠের দক্ষিণ সীমায়, একতলা ছিমছাম এই একটেরে সার্কিট হাউস।
এর স্থাপত্যও বাংলোগুলো থেকে আলাদা। তিনদিকে–সামনে, বয়ে ও ডাইনে চওড়া বারান্দা, খিলান দেয়া। নিচু মেঝে–এতটা নিচু মেঝে এদিকে দেখাই যায় না। সামনের বারান্দা দিয়ে ঢুকে বসার জায়গা আর পার্টিশন দিয়ে ভাগ করা খাবার জায়গা। সেই ঘরটার দিকে মুখ করে পেছনে তিনটি মাত্র বড় শোয়ার ঘর। খিলানের সঙ্গে মিল রেখেই, ছাদটা একঢালাইয়ের নয়, বারান্দাগুলোর ওপর একটা ছাদ আর তার এক ধাপ ওপরে ঘরগুলোর ওপর আর-একটা ছাদ। ওপরের ছাদের মাঝখান দিয়ে একটা চিমনির বাধানো নল। সেটা এখন আর কোনো কাজে আসে না–শীত কমেছে বলে নয়, শীতে কাঠের আগুন জালানোর লোক আর-নেই বলে। কিন্তু রাস্তার বিপরীতের বাংলোগুলো ও এই সার্কিট হাউসের সারিতেই পরে, কোর্ট বিল্ডিঙের ইন্ডিয়ান রেড রঙের বিপরীতে এই ছিমছাম বাড়িটির আবছা হলদে রঙ এখনো যখন ফেরানো হয়, তখন এই চিমনির রঙও বদলায়।
