নকুল নবীনকে বলে, এই, লিস্ট বানাও, নবীন।
নবীন বীরেনবারুকে বলে, কাকা, আমরা যদি মিটিঙত না যাই কী হয়?
বীরেনবাবু মুখ তুলে নবীনকে দেখেন–যেন, তিনি যাচাই করতে চান এরকম একটা বিকল্পের বাস্তবতা কতটা?
নবীন বলে যায়, কী করিবে? পুলিশ আসি উত্তরখণ্ডক বাধা দিবে আর শ্রীদেবীকে ছাড়ি দিবে–তা কেমন করি করিবে? আর যদি গ্রেপ্তার করে, ত করুক। আমরা গ্রেপ্তার হন।
বীরেনবাবু হঠাৎ উঠে দাঁড়ান, তোমরা তা হলে লিস্ট বানিয়ে খবর দাও। আর এদেরও মিটিঙে আসতে বলল, কথাটা নকুলকেই বললেন তিনি, তোমরা রাত্রিতে আমার বাড়িতে এসো, কী হল শুনব। নকুল পাশে-পাশে হাঁটে, অন্যরা পেছনে-পেছনে। বীরেনবাবু হঠাৎ দাঁড়িয়ে নকুলকে বলেন, তোমাদের তের জন পার্টনারের মধ্যে কারো এটা বলা ঠিক হবে না কিন্তু নকুল, যে, উত্তরখণ্ড শেষ দিনের জল্পেশ্বর অভিযান আলাদা জায়গায় নিয়ে যাক।
নকুল একটু চুপ করে থাকে, যেন সে বীরেনবাবুকে আভাসে জানাতে চায় সেরকম কেউ-কেউ ভাবতেও পারে। কিন্তু নীরবতাটা ভেঙে সে বলে, সে আগে হলে না হয় ভাবা যেত, থানার মিটিঙো হলে কথা ছিল। কিন্তু এখন হলে ত মনে হবে সরকার জোর করে উত্তরখণ্ডকে শাস্তি দিচ্ছে আর আমরা, তার সুযোগ করে দিলাম। সবাই সব জায়গায় একসঙ্গে কাজ করছে কে উত্তরখণ্ড আর কে শ্রীদেবী তা কে ঠিক করবে? আর তা হয় কী করে কাকা, এখন আর তা হয় না।
৫.২ উত্তরখণ্ডের ফাংশনের আলোচনা
বীরেনবাবুর বাড়িতে রাত সাড়ে নটা নাগাদ নকুল, জগদীশ, সুরেন, নবীন, তিলক, তরণীবাবু আসতে পারলেন।
বীরেনবাবু মাঝের ঘরটাই তার কাছারি ঘর। সে-ঘরে ওকালতির কাগজপত্রে ভর্তি টেবিলের সামনে গোটা চারেক কাঠের চেয়ার, আর এক পাশে একটা লম্বা কাঠের বেঞ্চি–হেলান দেয়া ও হ্যান্ডেলওয়ালা। বীরেনবাবু আলো জ্বেলে পড়ছিলেন, এরা ঘরে ঢোকার পরও চোখ তোলেন না। কিন্তু চেয়ার-বেঞ্চে এরা বসে যাবার পর বইটার ভেতরে একস্টা কাগজ দিয়ে পাশে সরিয়ে রেখে তিনি বেঞ্চ ও চেয়ারে যারা বসে আছে তাদের সবাইকে দেখে নেন।
নকুল বলল, বেণীবাবুর শরীরটা খারাপ বলে আসতে পারলেন না, কাল প্যান্ডেলের মিটিঙে নিশ্চয়ই আসবেন।
বীরেনবাবু কোনো কথা বলেন না, সামনে তাকিয়ে থাকেন।
সুরেন বলল, বীরেনকাকা, এখন এত রাতে আপনাকেও ত বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখা যাবে না। আমরা মেটামুটি কথাবার্তা বলতে বলতে এলাম। একটা জিনিশ আমরা ঠিক করেছি–উত্তরখণ্ড সম্মিলন আর আমাদের অনুষ্ঠানটাকে যদি আলাদা করে চায় আমরা তাতে রাজি হব না।
কথাটা শুনে বীরেনবাবু আবার সকলের মুখ দেখেন যেন যাচাই করতে যে যারা এসেছে তাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রধান উদ্যোক্তা ক-জন, আছেন। সম্মিলন আর অনুষ্ঠানকে আলাদা করার ব্যাপারে অনুষ্ঠানেই যারা টাকা খাঁটিয়েছে তাদের সমর্থন থাকতে পারে কিন্তু উত্তরখণ্ডী কারো সমর্থন ত থাকবে না। বীরেনবাবু এটাতে আশ্বস্ত হন যে যারা এসেছে অনুষ্ঠানের সঙ্গেই তাদের সম্পর্ক বেশি।
সুস্থিরকে ত দেখছি না, বীরেনবাবু জিজ্ঞাসা করেন।
ও ত সম্মিলনের কাজেই সব জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাতেই ফিরে আসবে। কালকের মিটিঙে থাকবে। নকুল জানায়।
রামকিশোরের ময়নাগুড়ি বাজারে ব্যবসা আছে। সে বলল, স্যার, আমরা একটা কথা ভাবছিলাম। এই সরকারের মিটিঙে যদি বিলকুল সব লোগ আমরা গিয়ে হাজির হই ত কাজের কথা কেইসে হবে। আর আমরা ব্যবসায়ী লোগ। এই সব পাটিটাটির মিটিঙে গেলে কে গুসা হবে, কে খুশ হবে–আমাদের এই সব করা চবে না। আমাদের ছেড়ে দেন স্যার।
বীরেনবাবু কথাগুলো শুনছিলেন টেবিলের দিকে তাকিয়ে। শেষ কথাটা শোনার পর চোখ তুলে রামকিশোরকে দেখেন, তুমি ত ঐ তেরজন পার্টনারের মধ্যে নেই।
না স্যার, তা নাই, লেকিন কমিটিতে আছি।
মানে, তুমি কমিটি ছেড়ে দিতে চাচ্ছ?
না, না, স্যার, কমিটিতে আমি থাকব, আছি রামকিশোর তাড়াতাড়ি বলে। তাকে থামিয়ে দিয়ে তরণীবাবু বলে ওঠেন, আমরা বলছিলাম বীরেনদা, আমরা যেমন আছি, থাকব, আপনারা যা ঠিক করবেন আমরা তাই মেনে নেব, আপনারা যে মিটিং-টিটিং ডাকবেন তাতেও থাকব, মানে যেমন ছিলাম থাকব। কিন্তু এই সরকারি মিটিঙে আমরা যেতে চাই না। আমরা ত কথাও বলতে পারব না, মাঝখান থেকে ভিড় বাড়বে আর ঐসব পার্টির লোকজন আমাদের ওপর খেপবে। আমাদের ত ব্যবসা করেই খেতে হয়।
ময়নাগুড়ি বাজারে তরণীবাবুর বড় সাইকেলের দোকান। আরো নানা রকম জিনিশের এজেন্সি আছে। তরণীবাবুর কথা শুনে বীরেনবাবু রঘুনাথের দিকে তাকান–তারও দোকান আছে, তারও নিশ্চয়ই একই মত।
কাকা, আমরা কথা বলে এটা বুঝে গেছি যে সরকারের প্রস্তাবে কেউ রাজি হবে না, কেউ ভয়ও পাবে না। আমাদের তের জন পার্টনারের পাঁচজনকে আপনি কোনো সময়েই পাবেন না। তারা টাকা দিয়ে খালাশ আর টাকা পেলেই খুশি। আর, ঐ পঁচজনের কেউ-কেউ কেটেও পড়তে পারে হাঙ্গামার ভয়ে। কিন্তু সেসব দু-একজনের জন্যে ত আর আমরা পেছিয়ে যেতে পারি না। তাই আপনি বরং ঠিক করুন কাকে কাকে নিয়ে ঐ মিটিঙে যাবেন, নকুল বলে।
তোমাদের তেরজনকেই কিন্তু মিটিঙে ডেকেছে। আমাকে সেক্রেটারি হিশেবে চিঠি দিয়েছে। ঐ তেরজনকে খবর দিয়ে এই চিঠিতে তাদের সই নিয়ে রাখবে। কিন্তু ঐ তেরজনকে মিটিঙে অন্তত একবার মুখ দেখাতে হবে। সেটা দেখো তোমরা। আর উত্তরখণ্ডের পক্ষে যারা ভাল করে কথা বলতে পারবে শুধু তাদের পাঠাও, বীরেনবাবু বলেন।
