প্যান্ডেলে নকুলকে পেয়ে গেলেন। পেয়ে যাবেন–সেটা আশাই করেছিলেন। নকুলকে খবর দিলে ঐ ছোটাছুটি করে সবাইকে জড়ো করবে।
পাঞ্জাবির নীচে ফতুয়া, ফতুয়ার ভেতরে-পকেট। সেই পকেটের ভেতর থেকে চিঠি বের করতে বীরেনবাবুকে কিছুটা সময় নিতে হয়। তবে বীরেনবাবুকে সব কাজেই কিছুটা সময় দেয়াটা সকলের অভ্যেস হয়ে গেছে।
বীরেনবাবুকে দেখে, আসেন, কাকা বলে নকুল সিগারেটটা ফেলে পায়ের তলায় দলে দেয় আর গিরিজা একটা ভাঁজ করা চেয়ার এগিয়ে দেয়। চিঠিটা বের করে নকুলের দিকে এগিয়ে দিতে-দিতে বীরেনবাবু বসেন। নকুল চিঠিটা না-নিয়ে জিজ্ঞাসা করে–কাকা কি আমাকে এই বয়সে আবার ক্লাশ পালানো শেখাবেন? সেই যে ক্লাশ এইটে জানলা দিয়ে পালিয়েছি আর দরজা দিয়ে কখনো মা সরস্বতীর সামনে দাঁড়াই নি। টেন্ডার নোটিশ পড়তে পারি না আর আপনি আমাকে চিঠি দেখাচ্ছেন? মা সরস্বতী লজ্জা পাবেন বলে সরস্বতী পুজোর দিন না খেয়ে থাকি কিন্তু অঞ্জলি দেই না।
বীরেনবাবু চিঠিটাসহ হাতটা কোলের ওপর রেখে নকুলের পেটের দিকে তাকিয়ে বলেন, জলপাইগুড়ির সার্কিট হাউসে মিটিং, নর্থ বেঙ্গলের মন্ত্রীরা থাকবে, তোমাদের তেরজনকে থাকতে হবে আর উত্তরখণ্ডের লোকদের সঙ্গে নিতে হবে।
মানে? কবে? নকুল যেন আকাশ থেকে পড়ে, সে হাঙ্গামা, সেদিন থানার মিটিঙে মেটে নি? তারপর ত ওরা আর-কিছু জানায় নি, কাকা? এখন ত চারদিনের মাথায় ফাংশন-এখন মিটিং? মন্ত্রীরা আসবে? নকুল থেমে যায়, দুপা হাটে, ফিরে আসে, তারপর জিজ্ঞাসা করে, কবে?
পরশুদিন। বীরেনবাবু জবাব দিয়েও আবার খাম থেকে কাগজটা খুলে মিলিয়ে নিয়ে কাগজটা ভাজ করে খামে ভরে রাখেন।
পরশু? মানে, বুধবার? আর শনিবার উদ্বোধন? এ সবের মানে কী? কী, চায় কী?
বীরেনবাবু হাত তোলেন-নকুলকে থামানোর ভঙ্গিতে। নকুল থেমে গেলে আবার তার পেটের দিকে তাকিয়ে বীরেনবাবু বলতে থাকেন, উত্তেজিত হয়ো না। সরকারের উদ্দেশ্যে পরিষ্কার-উত্তরখণ্ড সম্মিলনটা হতে দেবে না। তাও প্রথম দিকে ওসব হতে দিতে আপত্তি নেই। সরকার শেষ দিনের জল্পেশ্বর অভিযান ও তিস্তা বুড়ি পূজাটাকে ঠেকাতে চায়। সুতরাং উদ্বোধন-টুদ্বোধন নিয়ে ভেবো না। তোমরা, কাঠের মিস্ত্রির হাতুড়ি ঠোকার আওয়াজে বীরেনবাবু থেমে যান। নকুল সেদিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে, এই থামাও ত তোমাদের হাতুড়ি। হাতুড়ির আওয়াজ থামলে বীরেনবাবু বলেন, আগে ফাংশনের ও কনফারেন্সের যারা রিয়্যাল লিডার তারা বসো, পারলে আজ রাতেই, আবার ওখানেও বসতে পারো। অন্তত, যে-কজন অ্যাভেইলেবল। তারপর তোমাদের তের জনের ও উত্তরখণ্ডের এক্সিকিউটিভ কমিটির একটা জয়েন্ট মিটিং করতে হবে-কাল বিকেলেই। সেখানে ফর্মাল প্রস্তাব নিতে হবেনা-হলে যারা ঐ মিটিঙে যাবে তারা বলবেটা কী?
নকুল হঠাৎ হাত জোড় করে উটকো হয়ে বসে পড়ে, কাকা, আমাকে ছেড়ে দেন। এই মিটিং-মুটিং প্রস্তাব-ট্রস্তাব শুনলে আমার মাথা ঘোরে। আমি চললাম। যা টাকা এর মধ্যে দিয়েছি তা ফেরৎ চাই না–ও আমি একটা টেন্ডার পেলে সরকারের কাছ থেকে দশগুণ উশুল করে নেব। কিন্তু এ আমি পারব না কাকা। এলাম, একটু ফুর্তি করতে, আর এ ত শালা ফেঁসে যাচ্ছি মিটিঙে।
বীরেনবাবু চুপ করে থাকলেন। প্যান্ডেলের অন্যান্য জায়গায় আরো দু-চারজন যারা ছিল, তারা, হাতুড়ির আওয়াজ থামার পরে নকুলের চেঁচামেচি শুনে এগিয়ে আসে। নবীন দূর থেকেই বলে, কী। হইল? নকুলদা নিজেই যাত্রা ধরিলেন নাকি?
এবার নকুল দাঁড়িয়ে তাদের দিকে ফিরে বলে, এই ত ভাই, তোমরা আছ–উত্তরখণ্ড-শ্রীদেবী যা-ইচ্ছে বুঝে নাও, আমাকে ছাড়ো ভাই, আমার সাধ মিটে গেছে।
ততক্ষণে ওরা এদের কাছে পৌঁছে গেছে। কী হল আর জিজ্ঞাসার দরকার হয় না। কিন্তু বীরেনবাবু কোনো কথা না বলায় নকুলকেই বলতে হয়–পরশুদিন জলপাইগুড়ির সার্কিট হাউসে মন্ত্রীরা মিটিং ডেকেছে, উত্তরখণ্ড আর এই ফাংশন নিয়ে কথা বলতে হবে। সবাইকে যেতে হবে।
নবীনের পাশে ছিল তিলক। সে জিজ্ঞাসা করে, কী কথা হবে?
কী আর কথা হবে। গবমেন্ট চায় না উত্তরখণ্ড হোক, কিন্তু চায় শ্রীদেবী হোক।
বীরেনবাবু মুখটা তোলেন কিছু বলতে কিন্তু তার আগেই তিলক বলে ওঠে, সে ত ভালই। কাইল কাগজে একখান বিজ্ঞাপন ছাড়েন যে সরকারের নির্দেশে শ্রীদেবীর অনুষ্ঠান বাতিল করা হইল। আমাদের কোনো কারণ জানানো হয় নাই। যাহারা কারণ জানিতে চান তাহারা মন্ত্রীদের কাছে যান–তা হলেই লোকে মন্ত্রীদের শ্রীদেবীর নাচ নাচাইয়ে ছাড়বে–একেবারে মিস্টার ইন্ডিয়া। তাতে সামান্য যে সমবেত হাসি ওঠে তাতেও তিলকের কথার নিহিত রাগ চাপা পড়ে না। কিন্তু তিলকের কথা শোনামাত্র বীরেনবাবু তিলকের মুখের দিকে তাকাল। যেন, তিনি যাচাই করতে বলে এরকম একটা বিকল্প দেয়ার বাস্ততটা কতটা?
তাতে বীরেনবাবু হাত তোলেন, সকলে একটু কাছে আসে। বীরেনবাবু সোজা তাকিয়ে তার নিম্নস্বরে বলতে থাকেন, শোনো, পরশুদিন সকালে মিটিং, মন্ত্রীরা থাকবেন, মিটিঙে তারা নিশ্চয়ই নির্দিষ্ট প্রস্তাব দেবেন, তোমাদের সেই প্রস্তাবের জবাবে নির্দিষ্ট কথা বলতে হবে, হ্যাঁ কি না, বা নির্দিষ্ট প্রস্তাব দিতে হবে। সেটা তোমাদের নিজেদের মিটিং করে লিখিত প্রস্তাব নিতে হবে যে এই প্যান্ডেলে উত্তরখণ্ড সম্মিলন করতে দিতে সরকার যদি আপত্তি করে তা হলে শ্রীদেবীর অনুষ্ঠান, মানে কালচারাল ফাংশন, হবে কি হবে না। এক-একজন এক-এক মত দিলে হবে না। ঐ মিটিঙেও এক-একজন এক-এক রকম কথা বললে হবে না। এখন একটা লিস্ট করে যাদের-যাদের পার, খবর দিয়ে দাও।
