কিন্তু সেসব কোনো কারণই ত ময়নাগুড়িতে নেই। এরকম একটা জংশন-গঞ্জের মত জায়গা ময়নাগুড়ি, যেখান থেকে শিলিগুড়ি হয়ে পাহাড়-বিহার, ধুবড়ি হয়ে আসাম পর্যন্ত ঘণ্টাকয়েকের মধ্যে মালপত্র পাঠানো যায়, সেখানে পুরনো রাজবংশী পরিবাররা দু-বিঘে চার-বিঘে জমির বেশির ভাগটাই ফেলে রেখে দুটো-একটা ছোট টিনের ঘরে মাত্র বসবাস করবে, তা তরিতরকারির আড়তদাররা চলতে দেবে কেন? শুধু নগদ টাকার স্বাদ দিয়েই ত এ জমিগুলো তারা হাতিয়ে নেবে। এখনো নেয় নি বটে, কিন্তু জলপাইগুড়ির জজ কোর্টে গত পঁয়ত্রিশ বছর প্র্যাকটিশের অভিজ্ঞতা থেকে বীরেনবাবু বুঝতে পারছেন ময়নাগুড়ি, ধূপগুড়ি, ফালাকাটার মত জায়গায় ভূসম্পত্তির মালিকানার এই বদল আসন্ন, সাত-আট মাসের পোয়াতির মত আসন্ন। ডুয়ার্সে রাজবংশীরা সংখ্যালঘু হয়ে যাবে–সম্পত্তির মালিকানাতেও। আইনের পথে একে ঠেকানোর আর-কোনো উপায় নেই– একমাত্র উপায় সমস্ত রাজবংশীকে এক করে আসামের মত কোনো আন্দোলন। তা হলে গোলমালের ভয়ে ভূসম্পত্তি এখনই কেউ কিনতে চাইবে না হয়ত। কিন্তু তাতেও ত স্থায়ী সমাধান হবে না। স্থায়ী সমাধানের জন্যে আসামের মত বিদেশী খেদাও আন্দোলন হয়ত করা যাবে না, কিন্তু, অন্তত এটাও আদায় করা যায় যে রাজবংশীদের কাছ থেকে কোনো সম্পত্তি অরাজবংশী কেউ কিনতে পারবে না। অর্থাৎ আদিবাসী-উপজাতি অঞ্চলের এই নিয়ম জলপাইগুড়ি ও ডুয়ার্সেও প্রয়োগ করতে হবে। তার মানেই রাজবংশী-অঞ্চলের জন্যে কিছু স্বতন্ত্রতা দাবি করা। তার নাম হয়ত আপাতত দেয়া হয়েছে উত্তরখণ্ড। সে নাম পরে বদলাতেও পারে। কিন্তু রাজবংশী বা উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের স্বার্থরক্ষার জন্যে আর-কোন্ বিকল্প রাস্তা আছে? না হলে এটা মেনে নিতে হয়–সারা দেশে যা হচ্ছে এখানেও তাই হোক; সেখানে রাজবংশীর কথা আলাদা ভাবে তোলা কেন? তরকারি খেতের কাজ বীরেনবাবুর হয়ে গিয়েছিল। তিনি সেখান থেকেই কুয়োপাড়ে গেলেন–জল তোলাই ছিল, একটা ঘটিতে তুলে খানিকটা মুখে দিলেন, খানিকটা পায়ে। বারটা সিঁড়ি ভেঙে তাকে বারান্দায় উঠতে হয়। আগেকার দিনের বাড়িগুলো এরকম দেড়তলার মত উঁচু হত। বীরেনবাবুও গল্প শুনেছেন–বাঘের ভয়েই নাকি উঁচু করা। কাঠের বাড়ি, রাতে মইটা তোলা থাকত। কিন্তু তার আমলেই ত কাঠের বাড়ি বদলে ইটের হল, কই তিনি ত উচ্চতা কমান নি। এক-এক ধরনের বাড়িতে থাকা অভ্যেস হয়ে যায়। বীরেনবাবুদের অভ্যাস এরকম উঁচু বাড়িতে থাকা।
বারান্দায় টাঙানো তারে গামছা ছিল, তাতে মুখ আর পা মুছে, বীরেনবাবু ঘরে ঢোকেন। বাগানের কাজ করার সময় ধুতিটা একটু তুলে নিয়েছিলেন, এখন ঘরে এসে নামালেন। তারপর ফতুয়ার ওপর গরম কাপড়ের পাঞ্জাবি ও তুষটা নিয়ে, পাম্প শুটা পরে বেরিয়ে এসে একটু উঁচু গলায় স্ত্রীকে বললেন, আমি উত্তরখণ্ডে যাচ্ছি। সম্মিলন আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জায়গাটা এখন এই নামেই চলছে।
হঠাৎ সরকারের চিঠিটা পেয়ে তার ওকালতি জীবনের স্মৃতি, তার ছোট ছেলের কলকাতা হাইকোর্টে প্র্যাকটিশের স্বপ্ন, আর জলপাইগুড়ির ডুয়ার্সে রাজবংশীদের সম্পত্তিহ্রাস যে বীরেনবাবুর ধারাবাহিক মনে পড়ে গেল, তা নয়। তিনি উত্তরখণ্ড ও শ্রীদেবীর অনুষ্ঠানের কর্মকর্তা হলেন কী করে–ঐ স্মৃতিসহ প্রত্যাশা তারই যেন কারণপঞ্জি। বীরেনবাবুর মনে ঐ সব কথা একসঙ্গে এখন এই বৃত্তান্তের প্রয়োজনের সুযোগমত এসে যায় নি। বীরেনবাবুর নিজের কাহিনী, রাজবংশী হয়েও উকিল হিশেবে প্রতিষ্ঠার কাহিনীই ত একটা আলাদা বৃত্তান্তের লোভনীয় বিষয় হতে পারে। তার মত লোক কেন উত্তরখণ্ডের মত আন্দোলনে ঢুকে পড়েন সে-সবের আভাস দেয়ার জন্যেও বীরেনবাবু সম্পর্কিত এই সব কথা ওঠে নি। কিন্তু বীরেনবাবুর মত একজন উকিল মানুষ, ও বয়স্ক লোক, যিনি সারাটা কর্মজীবন কাটিয়েছেন জেলা। শহরের কেন্দ্রে, জেলার রাজনীতি ও প্রশাসনের মাঝখানটিতে, তার কাছে, দারোগার এই চিঠিটা কী করে ও কেন লেখা হল সেটার জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় চিঠি পাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই। ওরা চাইছে সম্মিলন ও অনুষ্ঠানের মধ্যে একটা ভাগাভাগি ঘটিয়ে সম্মিলনটাকে বন্ধ করাতে ও অনুষ্ঠানটা করাতে। বামফ্রন্টের সরকার ও সরকারের পার্টিগুলির কাছে বম্বের কোন সিনেমাওয়ালি শ্রীদেবীর নাচ অনেক নিরাপদ। কিন্তু রাজবংশীরা আলাদা ভাবে বসে কিছু কথাবার্তা বলাটা অনেক বেশি বিপজ্জনক–উগ্রপন্থী, বিচ্ছিন্নতাবাদী। তিনি অত্যন্ত কম কথা বলেন বলেই অমন চিঠি পেয়েও সেটা ফতুয়ার পকেটে ভরে ফুলকপির চারা থেকে কলার খোল খুলে দেয়ার কাজটা অব্যাহত রেখে, চিঠিটাকে উপেক্ষা ও অপমান করে, নিজের ও নিজেদের বহু বহু প্রাচীন উপেক্ষা ও অপমানের শোধ নেন। তার জীবনের এই খবরগুলি সেই সব উপেক্ষা অপমানেরই প্রাসঙ্গিক।
.
১৬০. উত্তরখণ্ডের ফাংশনের আলোচনা-এক
বীরেনবাবুর বাড়ি থেকে সম্মিলন ও অনুষ্ঠানের জায়গায় যেতে বেশ কিছুটা হাঁটতে হয়। তিনি হেঁটেই, যান, রিক্সা নেন না। কিন্তু হাঁটার পক্ষে এই রাস্তাটা আর ভাল নেই। সব সময় ট্রাক, বাস আর মিনি যাচ্ছে। রাস্তাটাও ছোট, দোকানপাট বসায় সেটা আরো ছোট হয়ে গেছে। একটু যে পাশ দিয়ে যাবেন, তেমন পাশও নেই। প্যান্ডেল তৈরি হচ্ছে ব্লক অফিসের পাশে। এখন পুরোদমে কাজ হচ্ছে-সকলকে সেখানেই পাওয়া যাবে। তবু যাওয়ার সময় চৌপত্তিতে মরণচাঁদের দোকানটাতে একবার উঁকি দিলেন–অনেক সময় ওরা সন্ধ্যায় এখানে বসে। কিন্তু এখন কেউ নেই।
