মামলাটা এমন কিছু না–জেতারই মামলা। তখনকার আইনকানুনও ছিল অনেক সোজা। কিন্তু গোলাম মুস্তফা, কে, বীরেন বসুনিয়াকে উকিল রেখেছেন–এ থেকেই তার পশার বাড়তে শুরু করে। মুস্তফা সাহেবই বীরেনবাবুকে বলেছিলেন, হাময়ালার বাহের ঘর তোমাক মামলা দেয় না কেনে, কহেন ত? তারপর নিজেই উত্তর দিয়েছিলেন, এই আইনকানুন সম্পত্তি কোর্টকাছারি এইগুলা সব ভাটিয়ার ভদ্দরমানুষের তৈরি। তা সগায় ভাবে–এই সব মামলা মোকদ্দমা ভাটিয়ার ঘরই ভাল বুঝে, তোমার রাজবংশীয় ঘর কি আর অনং ইংরাজি কহিবার পারে হাকিম সাহেবের মুখত? মুস্তফা সাহেব পাকিস্তানে যান নি অনেক দিন, বোধহয় যাবেন নাই ঠিক করেছিলেন, কিন্তু সুতান্ন সালের একটা ছোট দাঙ্গার পর হঠাৎ সমস্ত সম্পত্তি বিনিময় করে চলে গেলেন। মুস্তফা সাহেবের দৌলতেই বীরেনবাবু তার সেরেস্তা তৈরি করতে পেরেছেন। তার ধারণা মুস্তফা সাহেব দাঙ্গার জন্যে ইন্ডিয়া ছেড়ে পাকিস্তানে যান নি। তিনি হঠাৎ বুঝতে পেরেছিলেন, ইন্ডিয়ার জোতদারি-জমিদারির দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ কথা কোনো-দিন কাউকে বলেন নি বীরেনবাবু। কিন্তু মনে-মনে এটাই তিনি এখনো বিশ্বাস করেন যে মুস্তফা সাহেব প্রথমত ছিলেন একজন জোতদার, দ্বিতীয়ত ছিলেন একজন রাজবংশী আর তৃতীয়ত ছিলেন একজন মুসলমান। নইলে সেই লিগ আমলে গোলাম মুস্তফার মত একজন মুসলমান ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান অন্তত হতে পারতেন কিন্তু লিগ না করেই মুস্তফা সাহেব চালিয়ে গেছেন। একবার বীরেনবাবুকে বলেছিলেন, তোমরালা বাহের ঘর ক্ষত্রিয় সমিতি বানাইছেন, ভাল, কিন্তু দেখেন ত কেনে তোমার মহাভারত মুসলমান ক্ষত্রিয় আছে কি নাই। না-থাকিলে হামরালা যাম কোটত-হামরালা বাহে মুসলমানের ঘর, যাম কোটত, কহেন!
বীরেনবাবুও কি গোপনে-গোপনে প্রথমত একজন রাজবংশীই? নইলে উত্তরখণ্ড দল যখন তাকে সম্পাদক করে এই সম্মিলনের ব্যবস্থা করল তিনি রাজি হয়ে গেলেন কেন? আবার, নাগরিক কমিটিরও তিনিই সম্পাদক- যারা এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করছে। নইলে তিনি এখনো তার সেরেস্তাটা ছোট ছেলের জন্যে রক্ষা করতে নিয়মিত কোর্টে যাতায়াত করছেন কেন, একথা জেনেও যে তার ছেলে ময়নাগুড়ি বা জলপাইগুড়িতে বসে প্র্যাকটিশ করবে না হয়ত, হয়ত কলকাতাতেই বসবে? বসুক, এটা যেন বীরেনবাবু চানও, না-জেনেই চান। আজকাল প্রায় কোনো মামলাই জজকোর্টে নিকেশ হয় না, সব মামলাই হাইকোর্ট পর্যন্ত চলে। তা যদি চলে, তা হলে, একজন রাজবংশী উকিল তার এই সেরেস্তার মামলা দিয়েই তার প্র্যাকটিশ শুরু করতে পারে–তার সেই ভাবী এ্যাডভোকেট ছেলের জন্যে বীরেনবাবু সেরেস্তা আগলাচ্ছেন।
বীরেনবাবু সবগুলো কপিচারার ওপর কলার খোলের ঢাকনি দেয়া শেষ করেন। কাজটা করতে তার একটু সময় লাগে। দাঁড়িয়ে কোমর বেঁকিয়ে সরাতে গেলে তাড়াতাড়ি হত, কিন্তু তাতে তার কোমরে ব্যথা হয়। সেজন্যে তিনি উটকো পায়ে-পায়ে এগিয়ে যান। এতেও ব্যথা হয়–হাঁটুতে। কিন্তু এক-একটা সারির শেষে উঠে দাঁড়িয়ে পাটা টানটান করে নিলে ব্যথাটা থাকে না।
বীরেনবাবু তার জমির ছোট দুই টুকরোয় এখন তরকারি লাগান–বাকি প্রায় বিঘে দেড়েক জমি.ত পড়েই থাকে–গোয়াল, পোয়ালবাড়ি এ-সব সহ। আজকাল অবিশ্যি এদিকে একটা নতুন ব্যবসা চালু হচ্ছে। এরকম বড় জমির ওপর বাড়ি যাদের তাদের কাছে তরকারি চাষিরা এসে ঐ বছরের জন্যে জমিটা নিতে চায়। সমস্ত খরচ চাষির। তরকারি যা হবে তার একটা অংশ জমির মালিকের। কতটা জমির মালিকের আর কতটা চাষির তা এখনো স্থায়ী ভাবে স্থির হয় নি, কারণ এক-একজন এক-এক নিয়মে জমি, যদি দেয়, দিতে রাজি হয়। কেউ আধিভাগে দেয়–তা হলে অবিশ্যি ফলনের খরচাও বার আনি-চার আঁনি ভাগ হবে। বীরেনবাবুর কাছেও এই প্রস্তাব দিয়ে দু-তিন বছর হল লোক আসছে। কিন্তু তিনি রাজি হননি। তিনি রাজি হন নি ওকালতি বুদ্ধিতে–একই জমিতে পর-পর দু-তিন বছর একই লোক তরকারি ফলালে একটা সম্পর্কে গড়ে ওঠেই, তারপর তাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যায় না। তাছাড়া তার অতটা দরকারও নেই। কিন্তু যাদের দরকার আছে–আগে সম্পন্ন পরিবার ছিল, এখন নানা কারণে পড়ে গেছে, অথচ বাড়িটা দু-বিঘে তিন-বিঘে জমির ওপর তাদের কাছে ত এটা উপার্জনের উপায়। বীরেনবাবু চোখের সামনেই জিনিশ দেখছেন। এক বছর দু-চারের মধ্যেই শহরের বাড়িঘরের এই সব জমির ওপর তরকারি চাষিদের একটা দখল অন্তত আশ্বিন থেকে মাঘের শেষ পর্যন্ত, কায়েম হয়ে যাচ্ছে। আর, দুই? এই তরকারি চাষিদের অনেককেই টাকার যোগান দিচ্ছে ডুয়ার্স ও জলপাইগুড়ি শিলিগুড়ির কাঁচা তরকারির বড়বড় আড়তদাররা। বীরেনবাবুর হিশেব, আর দু-এক বছরের মধ্যেই এখানে আলু চাষ হবে, আলু রাখা যায় বেশি দিন, কোল্ড স্ট্রোরেজও হবে। পুরনো বাড়ি ছাড়া কাদের আর দু-তিন বিঘে বাস্তু জমি থাকবে। সে-সব বাড়ির প্রায় চোদ্দ-পনের আনাই ত রাজবংশী বাড়ি। ময়নাগুড়ির মত শহরে যদি এই বাস্তুজমিতে তরকারি চাষের দাদন চলতে থাকে তা হলে দশ বছরের মধ্যে বাস্তুজমির ঐ অংশ বেচে দিতে হবে। আগে, জলপাইগুড়ি শহরে যত রাজবংশী পরিবার থাকত, এখন আর তা থাকে না। ময়নাগুড়িতেও বাস্তুজমির রাজবংশী মালিকানার অনুপাত কমে যাবে, দ্রুত। জলপাইগুড়ি শহরে রাজবংশী বাড়ি কমে যাওয়ার একটা বড় কারণ তিস্তা ব্রিজ, বাস-মিনি-ট্যাক্সির এরকম বাড়। আগে, জলপাইগুড়ি শহরে যেতে হলে তিস্তায় খেয়াপার হয়ে, হেঁটে, সঁতরে, ট্যাক্সিতে চেপে যেতে হত। অথচ স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, অফিস, কাছারি সবই জলপাইগুড়িতে। তখন স্কুল বলতে ত যজ্ঞেশ্বর রায়ের রাঙ্গালিবাজনার স্কুল, দোমহানির রেল স্কুল আর ময়নাগুড়ির। আর, এখন কলেজইত একটা ফালাকাটায়, একটা ধূপগুড়িতে। স্কুলের ত কথাই নেই। কমার্স কলেজ আর ল কলেজের ছেলেরা রাত আটটায় শহরে ক্লাস শেষ করে ডুয়ার্সে ফিরে যেতে পারে। তারপর যারা ঐ মোটর সাইকেল কিনছে তাদের ত কথাই নেই। জলপাইগুড়িতে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্যে একটা বাড়ি রাখা ত খরচের ব্যাপার। সে-খরচ কেউ করবে কেন আর? বীরেনবাবুরই ত আগে শহরে একটা বাড়ি ছিল, এখন নেই। সুতরাং জলপাইগুড়ি শহরে রাজবংশী পরিবারের আনুপাতিক সংখ্যাহ্রাসের কারণটা বোঝা যায়।
