ফলে, এই শেষ দিনের অনুষ্ঠানে, ময়নাগুড়ি শহর পুরো জ্যাম হয়ে যেতে পারে। এইটুকু ত শহর, রাস্তাগুলোও সরু সরু। যদি একবার কোনো গাড়ি আটকে যায়, সেটা বের করা প্রায় অসম্ভব। সেইজন্যেই পুলিশের ওপর পুরো নির্ভর। অনুমতি ত নেয়া হয়েইছে–পুলিশই বিভিন্ন মাসে বাস ও ট্রাস পার্কিঙের ব্যবস্থা করে দেবে। কোম্পানীকে শুধু সেই মাঠে ঢোকার রাস্তা বানিয়ে দিতে হবে। আসাম থেকে আসা গাড়িগুলোকে চৌপত্তির আগেই পার্ক করাতে হবে আর বিহার বা তিস্তাব্রিজ পার হওয়া গাড়িগুলোকে পশ্চিম দিকে পার্ক করাতে হবে। মাঠগুলো বেশ বড় বড় আছে, এই যা বাঁচোয়া। শ্রীদেবীর নাচের জন্যে ময়নাগুড়ির মত এইটুকু থানা শহরে সর্বভারতীয় ব্যবস্থা গড়তে হচ্ছে, যেন আসামের গাড়ির সঙ্গে বিহারের গাড়ি মুখোমুখি না হয়, ডুয়ার্সের গাড়ির সঙ্গে তরাইয়ের গাড়ি মিশে না যায়–সব গাড়িরই মুখ যেন থেকে শ্রীদেবীর মঞ্চের দিকে, কিন্তু নানা দিক থেকে।
.
১৫৯. একটি প্রয়োজনীয় জীবনী–সংক্ষেপে
বীরেন্দ্রনাথ বসুনিয়া থানার বড়বাবুর কাছ থেকে চিঠিটা পেয়ে যান সেদিন বিকেলের মধ্যেই।, বীরেনবাবুকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সম্পাদক হিশেবে জানানো হয়েছে, যে-তেরজন আর্থিক দায়িত্ব নিয়ে ও একটি কমিটি তৈরি করে এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন তাদের জলপাইগুড়ি সার্কিট হাউসের সভায় উপস্থিত থাকতে জানানো হচ্ছে। ঐ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্যাণ্ডেলে একই সঙ্গে নিখিলবঙ্গ উত্তরখণ্ড সম্মিলন নামে যে-সম্মিলন হচ্ছে ও যে-সম্মিলন সম্পর্কে সরকারকে এখনো পর্যন্ত কিছু জানানো হয় নি তাদের সংগঠকদেরও যেন সাংস্কৃতিক সম্মিলনের উদ্যোক্তারা নিয়ে আসেন–এই নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে মাননীয় পর্যটনমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী ও বনবিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রী দয়া করে এই মিটিঙে উপস্থিত থাকবেন।
বীরেনবাবু চিঠিটা বার দুয়েক পড়ে ফতুয়ার পকেটে রেখে আবার তার কপি খেতে নেমে যান। শীতকালের শুরুতে বাড়ির পাশের ও পেছনের পড়ে থাকা বিরাট জমির মাত্র কিছু অংশেই পালং, ফুলকপি-বাঁধাকপি, মটর শাক করেন বীরেনবাবু। তার কয়েকটা গরু আছে–সেই রাখালটাই বাগানের দেখাশোনা করে থাকে। বীরেনবাবু সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে চারাগুলোর ওপর কলাগাছের খোল কেটে বানানো ছোট-ছোট আড়ালগুলো দিয়ে দেন। আবার বিকেলের শেষ দিকে বীরেনবাবু সেই কলার খোলের আড়ালগুলো সরিয়ে চারাগুলোকে খুলে দেন। এদিকে এত শিশির আর হিম পড়ে যে এই একেবারে কচি চারাগুলো সারা রাত খোলা থাকলে সেই হিমে ভিজে ঝরঝরে হয়ে ওঠে। এই সকালে ও বিকেলে তার লোকটি গরুগুলোকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তা ছাড়া মাত্র বছর তিনেক আগেও বীরেনবাবু নিজে হাতেই এই খেতটা করতেন। কিন্তু তিন বছর আগে বুকে শ্লেষ্ম জমায় আর ব্লাডপ্রেশার বাড়ায় তাকে জলপাইগুড়ি হাসপাতালে দিন দশেকের জন্যে ভর্তি হয়ে হয়েছিল। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বীরেনবাবু আর আগের মত কাজে ফিরে যেতে পারেন নি। বোধহয় চান না। তার কিছু খেতি জমি আছে, তাতে বাড়ির সারা বছরের খাবার হয়ে, সরকারের লেভি শোধ করেও কিছু বিক্রয়যোগ্য উদ্বৃত্ত ফসল থেকে যায়। চার মেয়েরই বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ছেলে জলপাইগুড়ি কলেজ থেকে বিএ পাশ করে বাড়িতেই থাকে, জমিজমা দেখাশোনা করে, পুকুর কেটে মাছচাষের ব্যবসায় নেমেছে। সে ছেলের একটিই মেয়ে। ছোট ছেলে কলকাতায় ওকালতি পড়তে। এখন অবিশ্যি নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিতেও ল ফ্যাকাল্টি হয়েছে, জলপাইগুড়িতেও ল কলেজ আছে, সন্ধ্যায় ক্লাশ করে রাতে ময়নাগুড়িতে ফিরে আসে অনেকেই। কিন্তু বীরেনবাবু চেয়েছিলেন তার ছেলে ওকালতি যখন পড়ছেই তখন কলকাতাতেই পড়ক। সেই ছোট ছেলের জন্যেই এখনো সেরেস্তা আঁকড়ে আছেন বীরেনবাবু। নইলে হয়ত ওকালতি ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে বসে থাকতেন। ওকালতি পেশার ওপর বীরেনবাবুর যা টান, তার চাইতে অনেক বেশি টান তার নিজের তৈরি এই সেরেস্তার ওপর। তিনি ময়নাগুড়িতে বসেই বরাবর প্র্যাকটিশ করে আসছেন জলপাইগুড়ি কোর্টে। আগে জলপাইগুড়িতে একটা ছোট বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন। তিস্তা ব্রিজ হয়ে যাওয়ার পর সেই বাড়িটা ছেড়ে দেন। বীরেনবাবু ওকালতি পেশাটাকে ভালবাসেন। আইনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নানা বিচার-বিশ্লেষণে তার আগ্রহ আছে। বেশির ভাগ উকিলেরই তা থাকে না, থাকার দরকারও হয় না। এমন কি জজকোর্টেও মাত্র দু-চারজন উকিলই ঐ সব ল-পয়েন্ট-টয়েন্ট নিয়ে মাথায় ঘামায়। ওকালতির ভাষা জানলেই একজন উকিলের মোটামুটি চলে যায়। কিন্তু বীরেনবাবু শুধু জামিনের উকিল হতে চান নি, ফৌজদারি মামলা তিনি জীবিকার জন্যে করতেন–বেশিই করতেন, কিন্তু তিনি তার সেরেস্তা তৈরি করতে চেয়েছিলেন প্রধানত সিভিল কেসের ওপর। আর সেইখানেই তার সারাটা জীবন তিনি সবচেয়ে বেশি বাধা পেয়েছেন, যেন, রাজবংশী উকিল বলেই তার বুদ্ধিসুদ্ধি কিছু কম, মারদাঙ্গার মামলা যদিবা করতে পারেন, তাই বলে সম্পত্তির মামলায় তার ওপর ভরসা করার মক্কেল পাওয়া যেত না। রাজবংশী সমাজের লোকরাই তাকে মামলা দিতে চাইত না। তার কম বয়সে তিনি প্রথম একটা বড় মামলা পান বাকালির গোলাম মুস্তফার কাছ থেকে। গোলাম মুস্তফা মুসলমান রাজবংশী-বিরাট জোতদার, জলপাইগুড়ি শহরের নতুন পাড়ায় তার বাংলো বাড়ি বাকালি হাউস সকলে চেনে। জলপাইগুড়ি শহরের বড়বড় উকিলরা তার মামলা করেন। তিনিই একদিন তার বাকালির বাড়িতে বীরেনবাবুকে ডেকে পাঠিয়ে একটা মামলার দায়িত্ব নিতে বলেন, কারো জুনিয়ার হিশেবে নয়, পুরো দায়িত্ব, তবে বীরেনবাবু যদি মামলার দরকারে কোনো সিনিয়ারের সঙ্গে কথা বলতে চান বা সিনিয়ারকে দিয়ে ড্রাফট করাতে চান সেটা বীরেনবাবুর ব্যাপার। কিন্তু, মামলায় হারা চলিবে না, স্যালায় হাইকোর্ট করিবার নাগে করিবেন, কিন্তু জিতিবার নাগিবে। গোলাম মুস্তফা সাহেব হেসে বলছিলেন, চেককাটা লুঙি আর ধবধবে গেঞ্জিতে কাঠের হাতাওয়ালা ও হেলান দেয়া লম্বা বেঞ্চের কিনার থেকে পিক ফেলে বলেছিলেন, হো-হো করে হেসে পিক ফেলে বলেছিলেন, হারিবার চাহিলে ত হামার ভদ্দরমানষি ভাটিয়ার ঘর উকিল আছে–ননিলী ঘোষ, মকবুল হোসেন, খগেন। মহলানবিশ–কিন্তু এই মামলাটা মুই হামার রাজবংশী উকিল দিয়া জিতিবার চাহি–জিতন কেনে ভাই, জিতি আনেন।
