তা কেন বলেন? শুধু জোতদারির কথা নহে, ন্যায্য কথা, ধর্মের কথা। পঁচখান টাড়ি (গ্রাম) দিলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ হইত না আর সরকার আপনার এতগিলা জমি প্রথমে ভেস্ট নিল, পরে আবার এতগিলা জমি ব্যারেজের জন্যে অধিগ্রহণ করিল। পঞ্চানন মহাভারতের উদাহরণ দিয়ে কী বোঝাতে চাইলেন, তিনি নিজেও বোঝেন না, গয়ানাথ ত বোঝেই না।
আপনাদের কামতাপুরী রাজ্যে এই তিস্তা ব্যারেজ কী থাকিবে? গয়ানাথের এই সরল জিজ্ঞাসায় পঞ্চানন গম্ভীর হয়ে যান। এই প্রশ্নের জবাব তিনি ভাবেন নি। আসলে, গয়ানাথের মত বড় জোতদার উত্তরখণ্ড যোগ দিলে তার স্বার্থে এই তিস্তা ব্যারেজ সংক্রান্ত প্রস্তাব নিতেই হবে। কিন্তু সে-প্রস্তাব নিলেও পঞ্চানন এখন কী করে বলবে কামতাপুর রাজ্যে তিস্তা ব্যারেজ থাকবে কি থাকবে না।
পঞ্চানন বলে, ব্যারেজ নিয়া ত আপনার কুনো অভিযোগ নাই। আপনার অভিযোগ জমি অধিগ্রহণ বিষয়ে। কামতাপুরে দরকার হইলে ব্যারেজ করিতে হইবে কিন্তু কখনোই কৃষকের জমি অধিগ্রহণ করা হইবে না। নদীর জমি দিয়া নদীর ব্যারেজ বান্ধো। পঞ্চানন এত সুন্দর ভাবে কথাটির জবাব দিতে পেরে খুশি হন।
গয়ানাথ পাল্টা প্রশ্ন করে, আর, ফরেস্ট ডিপাটমেন্ট? কামতাপুরেও কি ফরেস্ট ডিপাটেমন্টে থাকিবে?
পঞ্চানন জবাবের যেকায়দা বের করেছেন সেটা ছাড়তে চান না, গয়ানাথবাবু, আমাদের কামতাপুর রাজ্য ত ভারতের মধ্যে একটি রাজ্য হইবে। ভারতের সব রাজ্যের যে-নিয়মকানুন, কামতাপুরেও তা, থাকিবে কিন্তু তা কখনোই কৃষকের বিরুদ্ধে যাইবে না, কৃষকের স্বার্থে থাকিবে।
কৃষক মানে লালপার্টির কৃষক না হয়, উত্তরখণ্ড দলের কৃষক? নিশ্চয়ই। কৃষক বলিতে শুধু হালুয়ামানষি আধিয়ারমানষিক বুঝাবেন কেন? যার জমি সেও ত কৃষক। শুনেন গয়ানাথবাবু, আপনি উত্তরখণ্ডে যোগ দিলে সেটা আমাদের গৌরব। এই ডুয়ার্সের সগায়, কোচবিহারের সগায়, তরাইয়ের সগায় আমাদের পুছিবার ধরে–গয়ানাথবাবু কেন আসেন নাই? আপনারা কয়েক পুরুষের মধ্যস্বত্ব ভোগী। আপনি আসিয়া আপনার বক্তব্য বলেন, আমরা সেসব নিয়া আলোচনা করি, দশজনের সঙ্গে আপনি বসেন।
গয়ানাথ একটু চুপ করে থেকে বলে, সেই তানেই ত আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিবার আসিছু। কিন্তু মোর ত এতগিলা মামলা চলিছে। স্যালায় মুই আগত যাম না। মোর পক্ষে মোর জোয়াই এই আসিন্দির উত্তরখণ্ড করিবে। মুইও আপনাদের তামান কাম করিম কিন্তু মুই নাম লিখিবার আগে দুই-চারি মাস দেখিবার চাহি।
কী দেখিতে চান? আমাদের কাজকর্ম?
না-হয়, না-হয়। মোর মামালা-মোকদ্দমাগিলা কোটত দাঁড়ায়?
মামলা চলিবে মামলার মত, তাতে আপনার উত্তরখণ্ড করিবার বাধা কোথায়? আপনি ত চাহেন তিস্তা ব্যারেজের বিষয়ে আমরা সম্মিলনে কথা তুলি? আপনি নিজে না-আসিলে কে তুলিবে? কী তুলিবে? ব্যারেজের ব্যাপারখানে ত আপনাকে নেতৃত্ব দিতে হবে আমাদের। আপনি আমাদের লিডার হবেন।
আসিন্দির গয়নাথের পাশে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে, মুই ত কহিছু বাপাক। তোমার কি এ্যালায় লুকি থাকিবার বয়স, নাকি, ভলান্টিয়ার বানিবার বয়স? তোমাক এ্যালায় লিডার হবা নাগিবে। লিডার হও কেনে, বাপা, লিডার হও। গয়ানাথ একটু চুপ করে থেকে বলে, আচ্ছা, ব্যারেজের তানে সুই আসিম। কিন্তু অন্য কাজ সব আসিন্দির করিবে।
তারপর আবার কী ভেবে বলে, না, মুই আসিলে আসিন্দিরকে বাদ দ্যান। দুইজন মিলিযোগদান হইলে সগায় ভাবিবে হামরালা সরকারের বিরুদ্ধ যুদ্ধ ঘোষণা দিছু।
তাহলি জামাইঅক আমাদের সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পার্টনার করি দ্যান।
সেইখান কী?
পঞ্চানন দু হাত তুলে বলে, এক কাজ করেন। আপনি ঘরে ফিরিয়া যান। দু-এক দিনের মধ্যে আমি আর আমাদের সম্পাদক বীরেন্দ্রনাথ বসুনিয়া আপনার সঙ্গে দেখা করিম।
.
১৫৮. উত্তরখণ্ড সম্মিলন ও শ্রীদেবীর নাচ
ময়নাগুড়িতে নিখিল বঙ্গ উত্তরখণ্ড সমিতির প্রথম সম্মিলনের আয়োজন জমে উঠেছে। কিন্তু সেটা উত্তরখণ্ড সমিতির সম্মিলনের জন্যে, নাকি সম্মিলনের শেষে প্রত্যেক সন্ধ্যায় আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্যে, তা বোঝা যাচ্ছে না, কারণ এখনো বোঝার সময় আসে নি। কিন্তু সম্মিলন আর অনুষ্ঠান যখন শুরু হবে তখন সম্মিলনের কথা যে কারো মনে থাকবে না– তা এখনই আন্দাজ করা যায়। অবিশ্যি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যদি সত্যিই এতটা সফল হয় তা হলে সেটাও ত উত্তরখণ্ড সম্মিলনেরই সাফল্য হিশেবে ধরা হবে। ইতিমধ্যেই ত এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নাম লোকের মুখে-মুখে উত্তরখণ্ড ফাংশন হয়ে গিয়েছে।
সম্মিলনে আসার জন্যে কোনো পয়সা দিতে হবে না–সকলে দলে-দলে যোগদান করুন। কিন্তু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্যে টিকিট আছে–ফার্স্টক্লাশ পনের টাকা, সেকেণ্ডক্লাশ দশ টাকা, থার্ডক্লাশ পাঁচটাকা। চেয়ারগুলো ডোনারদের জন্যে ও কমপ্লিমেন্টারি কার্ড যাদের দেয়া হবে তাদের জন্যে।
সম্মিলন হবে সকালে আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে বিকেলে। দুদিন নবরঙ্গ অপেরার কুলটার কুল ও প্রমোদতরণী। এতে তিনজন ফিল্ম এ্যাকটর আছে–সানু ব্যানার্জি, এলবার্ট সেন আর মোনা গুপ্তা। মোনা গুপ্তা সিনেমাতেও নাচে, যাত্রাতেও নাচবে। আছে হিন্দি বাংলা গানের আসর। তাতে মান্না দে থেকে অনুপ জালোটা। চিত্রা সিং-এরও আসার কথা আছে, এখনো পাকা হয় নি। আছে–কলকাতার একটি গ্রুপ থিয়েটারের সামাজিক নাটক। একদিন সারা রাত ভিডিওতে চারটি ফিল্ম দেখানো হবে। আর শেষ দিনে, ও সেটাই চরম দিন,বম্বের ফিল্ম আর্টিস্ট শ্রীদেবীর প্রোগ্রাম। পরদিন সকালে সম্মিলন বা অনুষ্ঠান মণ্ডপ থেকে বিরাট শোভাযাত্রা যাবে জল্পেশ মন্দিরে। সেখানে জল্পেশ্বর শিবের সামনে শপথগ্রহণ।
