একথার জবাব দেবার সময় গয়ানাথ পায় না। তার আগেই দারিঘরের দাওয়ার নীচে পঞ্চানন মল্লিক এসে যান। দারিঘরটা উঁচু মাটির। দুটো দরজা, নীচে কাঠের একটা গুঁড়ি। সেটা অনেকদিন ধরে সিঁড়ি হিশেবে ব্যবহৃত হতে-হতে এই মাটির ঘরের সঙ্গে মিশে গেছে। দুই দরজা মুখোমুখি বলে ঐ দরজা দুটো জুড়ে রোদ। ঘরের বাকিটুকু আবছায়া। তবে ভামনির বেড়ার ফাঁক দিয়ে বাইরের উজ্জ্বলতা দেখা যায়।
ঘরের ভেতর উঠবার জন্যে দরজা ধরতে হয় পঞ্চানন বাবুকে। তার পরনে গেঞ্জি ও ধুতি। গেঞ্জির ফাঁক দিয়ে পৈতে দেখা যাচ্ছে। ঘরের ভেতর উঠে তিনি নমস্কার করেন গয়ানাথকে। গয়ানাথকে পার হয়ে তাকে টেবিলে বিপরীত দিকের চেয়ারে বসতে হয়। সেখানে বসেও তিনি আসিন্দিরকে দেখতে পান না–দেখতে পান গয়ানাথের ওপর থেকে চোখ সরাতে গিয়ে।
গয়ানাথই কথা শুরু করে, গেছিল জলপাইগুড়ির কোর্টত। যাবার তানে দেখি উত্তরখণ্ড সম্মিলন হবা ধরিছে। ত ভাবিছু–আপনার নখত কনেক দেখা করি যাই। এত হামরালারই সম্মিলন, রাজবংশী মানষিলার।
পঞ্চাননবাবু গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে ধীরেসুস্থে বলেন, বলেন, প্রধানত রাজবংশীদের। কেন? না, রাজবংশীরাই উত্তরবঙ্গের প্রধান। কিন্তু উত্তরখণ্ড দল সব মানুষের। যারা কামতাপুর নামে স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবি সমর্থন করে তাদেরই দল উত্তরখণ্ড।
নিশ্চয়, নিশ্চয়, সে ত হবাই নাগিবে। আপনারা কি তিস্তা ব্যারেজের তানে কিছু ভাবনাচিন্তা দিবার চাহেন? গয়ানাথ জিজ্ঞাসা করে।
হ্যাঁ, এ্যা। উত্তরবঙ্গের সব বিষয়েই ত আমাদের বলতে হবে। আপনার ত অনেক জমি চলি গিছে।
সেই কথাখানই কহিবার চাহি। আমার সঙ্গে সরকারের ত মামলা চলিবার ধরিছে কলিকাতার হাইকোর্টত আর জলপাইগুড়ির কোর্টত। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট কোর্ট স্টে-অর্ডার দেন নাই। কিন্তু ক্ষতিপূরণের একখান মামলা জিতি গেইছি। এ্যালায় মোর এই কাথাখান কহিবার আছে যে যেইলা জোতদারের জমি আগত ভেস্ট হয়া গেইসে, সেইলার সেই ভেস্ট জমিঠে, এখন ব্যারেজের তানে যে নতুন জমি অধিগ্রহণ করা হই তার সমপরিমাণ জমি, জোতদারকে ফিরি দিবার নাগিবে।
পঞ্চানন একটু ভেবে বলে, এইটা ত খুব ভাল প্রস্তাব। কিত জোতদার কহা না যায়।
কেনে? জমি ত জোতদারের ভেস্ট হইছে। গয়ানাথ বলে।
তা হইছে। কিন্তু আমাদের পার্টিকে ত সরকারের লোক, কমিনিস্টিরা, জোতদারের পার্টি বলে। সেই কারণে আমাদের প্রস্তাবে কি বক্তৃতায় জোতদার না বলিয়া কৃষক বলিবার কথা। আমরা কৃষকের স্বার্থের কথা বলিব।
গয়ানাথ চুপ করে যায়। চুপ করে থেকে তাকে শব্দার্থের এই গণ্ডগোলটা বুঝতে হয়। এতদিন সে শুনে এসেছে ও জেনে এসেছে, কৃষক মানে পাটির মানষি, লাল পাটির মানষি। কৃষক একপাখে। আর জোতদার একপাখে। কিন্তু পঞ্চানন মল্লিক বলিছেন জোতদারক কৃষক হবা নাগিবে।
কিন্তু কৃষক ত উমরালা কছে কমিনিস্টের ঘর, কৃষক সমিতি জিন্দাবাদ, কৃষকের দখল দিতে হবে দিতে হবে, কৃষক উচ্ছেদ না চলিবে না চলিবে না।
পঞ্চানন এই প্রশ্নটির জবাব দিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। বোধ হয়, ভালও বাসেন–কৃষক কথাটি ত সংস্কৃত। যে কৃষি কাজ করে সে কৃষক। জোতদাররা ত চব্বিশ ঘণ্টা কৃষি কাজ করে। জমি আপনি কেন চাহেন? কৃষি করিবার তানে। সেই কারণে আমরা নিজেদের কৃষক বলিব। কমিনিস্টের ঘর কৃষক কথাখান সম্পত্তি করিয়া নিছে। আর জোতদার কথাখান গালি বানাইছে। উত্তরখণ্ড দল কৃষক কথাখানের আসল অর্থ সবাইকে জানাইবে। আমরা ত কৃষক, সগায় কৃষক–সে আধিয়ার হউক, দেউনিয়া হউক আর খাঁটিবার মানষি হউক।
এটা বুঝে নেয়ার জন্যে একটু সময় গয়ানাথ চুপ করে থাকে। তার কাছে কৃষক কথাটিকে খুব সম্মানজনক ও জোতদার কথাটিকে গালাগাল মনে হয় না। সে যেন জোতদারই থাকতে চায়। উত্তরখণ্ড যে তাকে কৃষক হতে বলবে এর জন্যে সে যেন তৈরি ছিল না।
আসিন্দির তক্তপোশ থেকে উঠে এসে বলে, বাপা হে, যেইলা জোতদার ঐলাই কৃষক। উত্তরখণ্ডের কৃষক আর লাল পার্টির কৃষক এক নহে, আলাদা। আসিন্দিরের নেতিবাচক বাক্যে পঞ্চানন মাথা দোলান আর আসিন্দিরের ইতিবাচক বাক্যে ঘাড় হেলান। যেন, কথাগুলি আসিন্দিরের, ভঙ্গি পঞ্চাননের।
মানষিরা বুঝিবেন ক্যানং করি? লালপাটি কহিবেন, কৃষককে উচ্ছেদ দেয়া চলিবেন না, আপনারাও কহিবেন, কৃষক উচ্ছেদের অধিকার দিতে হবে মানষির নখত ত সব কথা গণ্ডগোল হবা ধরিবে। মুইও কৃষক, মোর এই জোয়াইও কৃষক, মোর মানষি সেই বাঘারুখানও কৃষক?
শুনেন গয়ানাথবাবু, আমরা ত একটা দল গড়িবার চাই–উত্তরখণ্ড দল। তার উদ্দেশ্য কী? পশ্চিমবঙ্গ হইতে আলাদা রাজ্য গঠন। কোন রাজ্য? কামতাপুর রাজ্য। সেই রাজ্যের দাবিতে ত সকল মানুষকে আসিতে বলিতে হবে। রাজ্যে ত অনেক মানুষ থাকিবে। কৃষক বলিলে সবাইকে বুঝায়। জোতদার বলিলে ত সবাইকে বুঝাইবে না। কিন্তু লোকে যখন শুনিবে যে উত্তরখণ্ড দল বলেভেস্ট জমি হইতে ব্যারেজের জমি ফেরৎ দাও–তখন সগায় বুঝিবে যার ভেস্ট জমি ছিল, আমরা শুধু সেই মানষিদের কথা বলিবার চাহি।
গয়ানাথ এবার মাথা হেলিয়ে বলে, হ্যাঁ, এই কাথাটা ঠিক কহিছেন। মানষি আনিবার নাগিবে। জোতদার বলিলে ত মানষি আসিবে না। আর, ভেস্ট জমি বলিলে লোকে বুঝি নিবে জোতদারির কথা হছে।
