পিড়িতে বসে সে রাগের শেষটুকু দিয়ে চিৎকার করে, শালো, ছাগির বেটা, যা কেনে, তুই হাল ধর, মুই না যাও জরিপের পাখে, তোকই হাল দিবার নাগিবে।
.
০১৮.
আসিন্দিরের হাল দেয়া
এতে আসিন্দির যেন বেঁচে যায়। সে যাছি হে বাপ, যাছি, মুই ত যাবারই চাছি। বলে মাঠ বরাবর দৌড়য়, বাঘারু যেখানে দাঁড়িয়ে হালবদল নিয়ে। তার সেই দৌড়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে গয়ানাথ ধুতির খুঁট খুলে মুখের কাদা মোছে। তারপর চায়ে চুমুক দেয়। গয়ানাথের বৌ ও মেয়ে এসে তার পেছনে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখে, আসিন্দির বাঘারুর হাত থেকে দড়িদড়া নিয়ে নিলে, বাঘারু জোয়ালটা দুই বলদের কাঁধে জোতে। ছাই বলদটা সরতে চাইছিল না। বাঘারু তার গলায় ঘাড়ে হাত দিয়ে নির্ভয় দিলে সেই শাদা বলদটার পাশে এসে দাঁড়ায়। যেন এখনো কোথাও মোটর সাইকেলের আওয়াজ উঠতে পারে–এমন ভাবে ডাইনের বলদটা ব্যায়ে অনেকখানি মাথা ঘুরিয়ে গয়ানাথের বাড়ির দিকেই তাকিয়ে থাকে। জোয়াল জোতা হয়ে গেলে আসিন্দির বাঘারুর হাত থেকে দড়িদড়া টেনে নিয়ে হালের গোছাটা চেপে ধরে। তারপর বলে, অ্যালায় স্টার্ট দিছু রে বাঘারু।
হে জোয়াই, আলাং-পালাং না করেন, গরু ডর খাছে,বলে বাঘারু আর অপেক্ষা না করে জিভ দিয়ে টাকায় একটা খুব নরম শব্দ তোলে।
বলদ দুটো নড়ে না। কিন্তু শব্দটা শুনতে ডাইনের বলদটা যেন মুখটা আর-একটু ঘোরায়। বাঘারু তখন নরম করে পর পর দুবার টট্টর টট্টর শব্দ তুলে সামনে গিয়ে দুই বলদেরই শিঙের মাঝখানে হাত রেখে একটু চুলকে দেয়। বলদ দুটো ঘাড় তোলে। গলকম্বলে একটু সুড়সুড়ি দিয়ে, বাঘারু বলে, দেন কেনে জোয়াই, স্টার্ট দেন।
আসিন্দির নির্ভুল নির্দেশ দেয়। আর বলদদুটো চলতে শুরু করে। হালের গোছা তার হাতে শক্ত করে ধরা আর ফাল পুঁতে যাচ্ছে মাটিতে। বেশ বড় বড় মাটির চাঙড় উঠে দু-পাশে পড়ে যাচ্ছে। সামান্য একটু পরেই বলদদুটি বোঝে অরা বেশ শক্ত সমর্থ দুই হাতে। জোয়ালের ওপর সমান টান পড়ছে। বলদ দুটোর ঘাড় ধীরে-ধীরে সোজা হয় আর আসিন্দির তার টাকরার আওয়াজে বলদ দুটোর গতি বাড়ায়। কোনোদিনই যাকে হাল ধরতে হয় না পেশিবহুল শক্তসমর্থ শরীরে এই আচমকা হালচালানোয় তার যেন একটা শারীরিক আরামই জোটে, স্বেদমোচনের আরাম। অভ্যেস নেই বলে আসিন্দিরের হাতের চাপটা সমান থাকে না, একটু কম-বেশি হয়ে যায়। তখন হালও লাফায়, জোয়ালও লাফায়, বলদও একটু হোঁচট খায়। কিন্তু সে ত মাত্র দু-একবার। তার ধুতি আর গেঞ্জিতে আসিন্দিরকেও জমির ভেতর প্রোথিত মনে হয় না, তাকেও মনে হয় শখের হাল চালাচ্ছে। কিন্তু দেখতে-দেখতে যে-গভীর নালী তৈরি হয়ে যায় তার হলচালনার ফলে, যেকালোকালো নরম মাটি ঝুরঝুর উপড়ে যাচ্ছিল ফালের দু পাশে–তাতে তার গায়ের জোর ও তার মোগ্যতার প্রমাণে হল।চালনার বিষয়টিই বদলে যাচ্ছিল।
দূরের দিকে তাকালে কুয়াশা এখনো গভীর। চোখের সামনের কুয়াশা কাটছে। সামনের বাশগাছের মাথায় মাকড়সার জালের মত কুয়াশার জাল। চার-পাঁচজন লোক ফরেস্টের পাশ দিয়ে বন পেরছে। দু-একজনের মাথায় এক-একটা পঁজা। দিগন্ত পর্যন্ত ত চেনাই এখানে–এমন-কি আকাশের রেখাঁটিও! বাঘারুকে একটু নজর করে এই দৃশ্যটা ঠাওরাতে হয়। হে জোয়াই, দেখ কেনে–আসিন্দিরকে বাঘারু ডাকে। আসিন্দির হাল ছেড়ে এলে দেখায় দেখ কেনে। একটু নজর করে দেখে আসিন্দির ছুটে গিয়ে মাঠ থেকেই গয়ানাথকে বলে, হে বাপা, তোমার সার্ভে পার্টি ত যাছে হে সার্ভের জায়গা। বাঘারু গিয়ে হালের দড়ি ধরে। অ্যাঁ? বলে গয়ানাথ লাফিয়ে ওঠে, বাঘারু-উ। বাঘারু মাঠের ভেতর থেকেই তাকায়। ঐ চিয়ারখান নিয়া ছুটি যা সার্ভের জায়গাত, ছুটি যা। বলে গয়ানাথ দৌড়ে কুয়োপাড়ে যায়। আসিন্দির তাড়াতাড়ি গিয়ে বাঘারুর হাত থেকে দড়িদড়া ধরে বলে, কাউক পাঠাই দে জলদি, আর চলি যা চেয়ারখান নিয়া।
বাঘারু দৌড়তে-দৌড়তে সদরবাড়ির ভেতর দিয়ে পেছনে গোয়ালবাড়িতে গিয়ে চিৎকার করে, হে-ই ভোচকু, যা কেনে বলদদুইটাক নিগি আন। তারপর আবার দৌড়ে ফিরে এসে দেখে গয়ানাথের মেয়ে চেয়ারটায় বসে। উঠো কেনে, উঠো। গয়ানাথের মেয়ে লাফিয়ে ওঠে। চেয়ারটা উল্টিয়ে মাথায় নিয়ে বাঘারু সোজা পশ্চিম দিক দিয়ে নেমে যায়। এই দিক দিয়ে একটা ছোট রাস্তা আছে। এখন তার পরনে নেংটি, সারা গায়ে আর-এক চিলতে কাপড় নেই, মাথার ওপর উল্টনো চেয়ার, পা ওপর দিকে তোলা। বাঘারু খুব তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করে, এ-আল, ও-আল দিয়ে। তাকে সার্ভে পাটির আগে পৌঁছতেই হবে। চেয়ারটা কোনো গাছের তলায় ঠিকঠাক করে রাখলে হাকিম বসবে। আর হাকিম যদি আগে যায় তবে বসবে কোথায়। হাকিম আছে, চেয়ার নেই–এই অসম্ভব অবস্থা দূর করার ভার নিয়ে বাঘারু তার বড় বেশি চেনাজানা এই মাঠ-ঘাট বনবাদাড় দিয়ে, ছোট থেকে আরো হোট পথে, ছুটছে।
গয়ানাথ জামাকাপড় পরে এসে উঠোন থেকে চেষ্টায়, হে জোয়াই, ভটভটিখান বাহির কর, লেট হয়্যা যাছে, মোক ছাড়ি দিয়া আয়। আসিন্দির ভোচকুকে দৌড়ে আসতে দেখে বলদদুটোকে ছেড়ে দৌড়ে এসে লুঙি-গেঞ্জিতেই মোটর-সাইকেলটাকে ঠেলে-ঠেলে উঠোন দিয়ে বাইরে নিয়ে যায়, বড় আলের মুখে। গয়ানাথ ঘরের ভেতর থেকে মার্কিন কাপড় দিয়ে বাঁধা একটা পুটুলি চটের ব্যাগে ভরতে-ভরতে বেরিয়ে আসে। সেটা হাত বাড়িয়ে সামনে নিয়ে, আসিন্দির ট্যাঙ্কের ওপর রাখে। গয়ানাথ পেছনে বসে। গয়ানাথের বৌ আর মেয়ে তাড়াতাড়ি বাইরে আসে কিন্তু তার আগেই মোটরসাইকেলে স্টার্ট দেয়ার আওয়াজ ওঠে। ওরা বড় আল দিয়ে হুস করে বেরিয়ে যায়।
