.
০১৯.
বনপথে আকাশ-বাতাস
সুহাসকে সামনে জ্যোৎস্নাবাবুর প্রাইভেট আর পাবলিক বোঝার ভার দেখতে হয় আর পেছনে বিনোদবাবুর ক্রমঘন নিশ্বাস শুনতে হয়। প্রিয়নাথ আর অনাথ তাদের কাঁধের আরো ভারি বোঝা নিয়ে অনেকটা আগে চলে গেছে তাদের টেবিল আর শিকলের ব্যাগটা দুলতে-দুলতে এগিয়ে যাচ্ছে, যেন ঐ ভারের বোঝাতেই তাদের পায়ের গতিও বেড়েছে।
মাসটা ভাদ্রের শেষ। বর্ষার একেবারে মধ্যপর্ব। এই সকালে অবশ্য বৃষ্টি নেই, মেঘও নেই। ফলে রোদের তাপ বাড়ছে। এই সকালেও। সেটা এত জোরে-জোরে হাঁটার জন্য, নাকি, এত সকালের এই চাপা রোদের তীব্রতার জন্যও, তা বোঝার উপায় নেই।
এখন এই বৃষ্টিহীন, মেঘহীন সাতসকালে যেন কারো মনে হয়ে যেতে পরে বৃষ্টি এবারের মত শেষ। মাঠের ঘাস, খেতখামার, ফরেষ্ট আর চা বাগানের সব গাছগাছড়ার, ঝোঁপঝাড়ের, গাছপালার রং একেবারে মোটা কাঁঠাল পাতার মত কালচে সবুজ। ঝোঁপঝাড় আর খাটো-খাটো সব বুনো গাছগাছড়া বর্ষার জলে ফুলেফেঁপে এতটাই, যে আর খাড়া থাকতে পারে না, নিজের ভারে নিজেই নুয়ে পড়ে মাটির ওপর পাকার–যেন এগুলো সবই মাটির ভেতরের জল থেকে ফেনিয়ে ওঠা। কিন্তু এখন, এই সকালের রোদে সেই সব ঝোঁপঝাড়ের ওপর থেকেও যেন বাড়তি জল উপচে যাচ্ছে। সামনে একটা ফরেস্ট শুরু হয়েছে। একটু উঁচুতে। এই তলা থেকে ফরেস্টের, ওপরে জলকণার এই বাষ্পীভবনের ধোয়া দেখা যাচ্ছে ফরেস্টের ভেতর থেকে, মাথা থেকে ধিকিধিকি আগুনের ধোয়ার মত, যেন পাতলা মেঘ ভেসে যাচ্ছে কোনাকুনি ওদলাবাড়ির দিকে তার মানে বাতাস এখনো পূর্ব থেকেই বইছে। কী ফরেস্ট যেন…। একই নামে একটা চাবাগানও আছে। সার্কল ম্যাপটা অত সুহাস সঙ্গে রাখতে পারত। কী যেন ফরেস্টটা, এটা?
মালহাটি, জ্যোৎস্নাবাবু না তাকিয়ে উত্তর দেন।
মালহাটি, মালহাটি। মালহাটি ফরেস্ট আর মালহাটি টি এস্টেট।
ওরা একটা টিলার মত উঁচু ডাঙা, বরমতল, থেকে নীচে নামছিল। সামনে আবার চড়াই-এ উঠে বোধহয় কিছুটা সমতল জমি–তারপর ফরেস্ট। সেই নিচু জমিটাতে একজন একটা বলদের ঘাড়ে লাঙল লাগিয়ে হাল দিচ্ছে। লোকটাকে অনেকক্ষণ ধরে দেখতে হয়, সেই ডাঙার মাথা থেকে। উল্টোদিকের চড়াইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত। সামনের চড়াই মাঝামাঝি পর্যন্ত উঠলেই ফরেস্টে নজর আটকে যায়। তখন প্রিয়নাথ আর অনাথ প্রায় ফরেস্ট ছোয়-ঘেঁয়। এখন এই একটু তলা থেকে দেখা যাচ্ছে ফরেস্টের গাছগুলোর মাথাতে রোদ ঝলমল করছে। গাছের পাতায় বা বাতাসে কোথাও ধূলিকণা নেই, এমনু-কি আকাশেও মেঘ নেই, ফলে রোদ যেন শান দিয়ে উঠছে। আর ফরেস্টের মাথাটা তাতে ঝিকিয়ে উঠছে। অনাথ আর প্রিয়নাথ ফরেস্টের ভেতর কিন্তু ঢুকল না, ফরেস্টটাকে বাঁ হাতে রেখে ডাইনে ঘোরে। ফরেস্টের যত কাছে যাওয়া যায়–গাছের মাথাগুলো তত অদৃশ্য হয়ে যায়। দৃষ্টি যেন ধীরে-ধীরে ফরেস্টের মাথা থেকে কাণ্ড বেয়ে নেমে আসতে থাকে। তারপরই ফরেস্টের লম্বা ছায়াটায় ঢুকে যেতে হয়।
সেই ছায়া দিয়ে এগিয়ে, ফরেস্টটাকে বা হাতিতে রেখে ডাইনে ঘুরে, ফরেস্টটার গা ঘেঁষে যেতে হয়। তখন ত আর রোদ নেই। কিন্তু বর্ষার জলে ফরেস্টের রোদহীন এই অংশে মোটা ঘাস প্রায় হাঁটু পর্যন্ত। পায়ে জল লাগে আর এরকম একটু চলতে-চলতেই ধীরে-ধীরে ঘামটা শুকিয়ে যায়। আরাম লাগে। নিশ্বাসটা স্বাভাবিক হয়ে আসে। কিন্তু তারপরই একটু আগের রোদ ঝলমল যেন-শরতের আকাশকে মনেও পড়ে না। মনে হয় যেন চার পাশেই বৃষ্টি পড়ছে–তারা ফরেস্টের গাছের পাশ দিয়ে-দিয়ে যাচ্ছে বলে গায়ে জলকণা লাগছে না। ডাইনে তাকালে, কালচে সবুজ ঘন ঘাসের প্রান্তর, আর বায়ে তাকালে, নিচ্ছিদ্র প্রায়ান্ধকার জঙ্গল–গাছের কাণ্ডগুলোও জঙ্গলের সবুজে ঢাকা, শ্যাওলায় বা লতায়।
ততক্ষণে শীত লাগতে শুরু করেছে, আর সেই শীতের মধ্যেও চামড়াটা কেমন তৈলাক্ত হয়ে ওঠে। ফরেস্টের ভেতর থেকে গরম বাষ্পের ভাপ বইছে। একদিকে শীত, আর-একদিকে সেই ভাপের গরমের ঘাম। বুকটা পিঠটা ভারী হয়ে ওঠে। নিশ্বাসও ভারী হতে থাকে।
মাটির ওপর ফুলে ফেঁপে ওঠা এই জলীয় জঙ্গল যেন মাটিরই গেজিয়ে ওঠা। জলে-জলে লতাপাতার মাটির তলার শেকড় এত বেশি ফাপা, সেগুলো যেন আর মাটি আঁকড়াতে পারে না। শাল-সেগুন-খয়ের-লাম্পাতি নিজেদের শরীরের ভারেই সেঁদিয়ে যাচ্ছে মাটির ভেতরে। এত বর্ষার এত জলে এই গাছগুলোর পাতাও মোটা ও ঘন হয়ে ছড়িয়ে গেছে–ডালপালার সেই ভারে শালগাছের দৈর্ঘ্যকেও আর দীর্ঘ মনে হয় না।
কয়েক মাসের বর্ষার অবিরল জলে সব কেমন ছোট হয়ে গুটিয়ে গেছে। দুই ধারের মোটা মুথা ঘাসের নীচে পায়ে চলার পথ চাপা পড়ে গেছে। ডাইনের পড়ো নিচু জমির ভেতর থেকে ঘাস আর জঙ্গল বেড়ে বেড়ে যেন ডাঙা হয়ে উঠেছে। ছোট টিলার ওপর ছোটখাট বুনো গাছের মাথা আকাশে ঋকিয়ে উঠেছে। সেই সব গাছের মাথায় এখন আকাশের পটভূমি। ফলে, আকাশও যেন নেমে এসেছে কেশ নীচে। অথচ এই একটু আগে আকাশকে কেমন নীল ও গোল দেখাচ্ছিল। একদিকে ঘাস-লতাপাতা-ঝোঁপঝাড়-গাছপালা আর বিরাট-বিরাট গাছের ঝাকড়া ঝাকড়া মাথা নিয়ে মাটির সংকীর্ণ হয়ে ফুলেফেঁপে ওঠা, আর, তার সঙ্গে ওপর থেকে আকাশের এমন নিচু হয়ে এই সবের পরিপ্রেক্ষিত, হওয়া–পৃথিবীটাকে যেন গুটিয়ে দেয়, যেন সব কিছুই পাকিয়ে ওঠা, আড়াল হয়ে যাওয়া। টিলার। ওপরে, দৃষ্টি আড়াল করা কোনো ঝাকড়া গাছের মাথায় আকাশের নীল। গাছটা এখন মাটির তলায় জল শুষে চছে, বাড়ছে। কিন্তু এর ভেতরেই কি বর্ষার পরের এই প্রক্রিয়াটা শুরু হয়ে গেছে? এর পর শরতের রোদে মাটি শুকিয়ে গেলে, মাটির তলার জল আরো-আরো নেমে গেলে, জলকণা সরিয়ে বাতাস খড়খড়ে হয়ে উঠলে, এই সব ঝোঁপঝাড় ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে শুরু করবে। পায়ের তলার মাটি এখন আচমকা দেবে যায়। দিনে দিনে এই জল মাটির আরো নীচে চলে যাবে–তখন ধীরে ধীরে মাটি শক্ত হবে, শক্ত হতে-হতে কোথাও-কোথাও পাথরের মত হয়ে উঠবে। কোথাও-কোথাও। কারণ, ফরেস্টের ভেতরের মাটি পচা পাতায় সারা বছরই ত নরম। এখনো ফরেস্টের, যাকে বলে ঝোঁপঝাড়, প্রায় যেন স্থির, কিন্তু উচ্ছ্বসিত জলাশয়ের মত ঢেউয়ের পর ঢেউ তুলে, দূরে-দূরে মিশে গেছে বড় বড় গাছের ফাঁক দিয়ে দিয়ে। ওগুলোতে মানুষ ডুবে যাবে। ডুবে গেলে আর মুখ তুলতে পারবে না–আরো নীচে লতাপাতা এত জটিল আর মাথার আচ্ছাদন এত কঠিন।
