কিন্তু এবার বিপদ হতে পারে। এখন সব হালুয়া-আধিয়াররা জমি বোঝে, মাপামাপিও বোঝে। তদুপরি এই জমির লাগাও আনন্দপুরের ভেস্ট জমিতে রাধাবল্লভের দলের জবরদখল। তারা উকিল-মোক্তার ডাকে, শিট ম্যাপ দেখতে পারে, কোন দাগ কোথা দিয়ে গেছে তাও বলে দিতে পারে। তারা যদি এখন জরিপের সুযোগে হঠাৎ ইনকিলাব বলে ঝাণ্ডা গাড়ে? সুতরাং গয়ানাথ কোনো ঝামেলাই নেই। তাকে যদি নিজে হাল চালিয়ে দেখাতে হয় জমি তার, তা হলে তাই দেখাবে।
গয়ানাথ জমিটার দক্ষিণ থেকে সোজা তার বাড়ির দিকে আসছিল–মাটিতে হাল লাগিয়ে কাঠি দিয়ে। যাচানোর মত একটা-সরু লাইন বানাতে রানাতে। আসিন্দির তার মোটরসাইকেলের স্টার্টারে কিক মারতেই বদল দুটো কান খাড়া করে যেন দাঁড়িয়ে পড়ে। গয়ানাথ চিৎকার করে ধমকে ওঠে, হে-ই শালা জোয়াই, ভটভটি বন্ধ কর। চেঁচালে গয়ানাথের গলা দিয়ে বনমোরগের মত আওয়াজ বেরয়। আসিন্দির পা নামিয়ে হে-হে করে হাসে, উঠি আইস কেনে, উঠি আইস, না-হয় ত তোমরাক ফেলি দিব হে বাপা। গয়ানাথ তার বাড়িটাকে পেছনে রেখে বয়ে ঘোরে। পেছন থেকে তার মেয়ে চিৎকার করে, বাবা, চা দিছি।
গয়ানাথ যখন জমিটার এই সীমায় চলে এসেছে, তখন আসিন্দির হঠাৎ মোটরসাইকেলটাতে স্টার্ট দিয়ে অ্যাকসেলিরেটারটাকে একবার পুরো ঘুরিয়ে দেয়। সেই গা আ-আ-আশব্দে মুহূর্তের মধ্যে কান ও লেজ খাড়া করে দুই বদল দুই দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েই দু-দিকে দৌড় দিল। গয়ানাথ হালের মাথা ছেড়ে দেয়ার সময়টুকুও পেল না, জমির ওপর উপুড় হয়ে পড়ল।
কাঁধে জোয়াল আর পেছনে হাল নিয়ে বলদ দুটো দুদিকে দৌড়তে গেলেই ঠেকে যায়। বা দিকের ছাইরঙা বলদটার পা বেকায়দায় ছিল। ডান দিকের শাদা বলদটা একটা হেঁচকা টানে পাশের ডাঙা জমির দিকে দৌড়লে হালটা এক ঝটকায় গিয়ে তার গায়ে পড়ে। আর ছাইরঙা বলদটা ঘুরে দৌড়তে গেলে প্রথমে দড়িতে পেঁচিয়ে যায়, আর তারপরে শাদা বলদটার বিপরীত টানে, জোয়াল দড়ি-টড়ি সব নিয়ে ধপাস করে মাটিতে পড়ে। জোয়ালের সঙ্গে ধাঁধা তার গলাটা মুচড়ে যায়। ছাই বলদটা পড়ে যাওয়ার হ্যাঁচকা টানে শাদা বলদের পেছনের পা দুটো সামনের উঁচু আল থেকে হড়কে যায়। বলদটা তখন সামনের পা দুটো দিয়ে মাটি খুবলে-খুবলে দাঁড়াতে চায়।
গয়ানাথকে পড়ে যেতে দেখে বাঘারু গয়ানাথের দিকে এক পা ফেলেই ঘুরে, হে-ই হে-ই বলে বলদ দুটোকে ধরতে দৌড়য়। বলদ দুটো পড়ে না গেলে ধরতে পারত কি না সন্দেহ! বাঘারু গিয়ে আগে জোয়ালটার দড়ি টেনে বের করে এনে ছাই-বলদটাকে ঢিলে করে। আর বলদটা দাঁড়িয়ে উঠে কান ঝটপট করে এদিক-ওদিক তাকিয়ে যেন খুঁজতে থাকে সেই আওয়াজটা কোথায়।
ছাই বলদটা খালাশ হতেই শাদা বলদটা জোয়ালটাকে টানতে-টানতে ওপরের আলটাতে সামনের দু পা তুলে দাঁড়ায়। পেছনে জোয়ালের আর লাঙলের ভার নিয়ে সে চট করে উঠতে পারে না। বাঘারু দৌড়ে গিয়ে তার দড়ি ধরে ফেলে। তারপর দুই লম্বা দড়ি জোয়াল থেকে ছাড়ানো শুরু করে।
ততক্ষণে গয়ানাথ মাটি থেকে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তার কপালে-নাকে-মুখে, গেঞ্জিতে হাঁটুতে কাপড়ে, কাদা। গয়ানাথ দাঁড়িয়ে উঠে নিজেকেও দেখে না, বলদগুলোকেও দেখে না। সে যে-টুকু হাল দিয়েছিল, তারই এক-খাবলা মাটি তুলে ঢিলের মত করে তার বাড়ির দিকে ছোড়ে। সেটা তার সামনেই ঝুরঝুর করে ঝরে যায়। তখন গয়ানাথ, শালো জোয়াই, তোর পাছত বাংকুয়া (ধাক)। সিন্ধাম-বলে তার বাড়ির দিকে দৌড়তে শুরু করে। আসিন্দির একসেলিরেটারটা একবার ঘুরিয়েই বন্ধ করে দিয়েছিল। আর তার হাসির শব্দে গয়ানাথের বৌ আর মেয়ে দৌড়ে এসে দাঁড়ায়। তখনো, গয়ানাথ মাটিতেই পড়ে। তিনজন মিলে যে-হাসি হাসে সেটা গয়ানাথ উঠে দাঁড়ানোর পরও থামে না। গয়ানাথ ঢিল মারার পর বেড়ে যায়। আর, গয়ানাথ তাদের দিকে ছুটতে শুরু করলে তিনজনই ঢিল-খাওয়া মুরগির মত নানা দিকে ছুটে যায়। এতটা দৌড়ে আর বাড়িতে ওঠার ঢাল বেয়ে উঠে গয়ানাথ হাঁপিয়ে গিয়েছিল। সে উঠেই মোটর-সাইকেলটাতে একটা লাথি মারে। মোটর-সাইকেলটা সামান্য নড়েও না। তার পায়ের কাছে একটা কাঠের টুকরো পড়ে ছিল, সেটা তুলে মোটরসাইকেলটার ওপর মারে। হেই, কী করিবার ধরিছেন? গয়ানাথের বৌ এসে দাঁড়ায়, চা ঠাণ্ডি হবা ধরিছে,. খায়্যা নেন। শুনে গয়ানাথের মেয়েও ঘর থেকে বাইরে আসে, বাবা, তোমাক কায় কহিসে হাল চালাবার!
তোর বাপ কইসে। কোটত স্যায় শেয়ালখাগের বেটা, শালো, ছাগির ছোয়া।
শুনে গয়ানাথের বৌ মুখে আঁচলচাপা দেয়। আর ঠিক পেছনে বাড়ির নীচে, মাঠের পাশ থেকে আসিন্দির জোড়হাতে চিৎকার করে, হে বাপা, মোক ক্ষেমা দাও কেনে, মোক ক্ষেমা দাও কেনে, বাপা, কিন্তু বলেই হেসে ফেলে। আসিন্দিরের গলা শুনে গয়ানাথ পেছন ফিরে বনমোরগের চিৎকার করে ওঠে, শালোলা, মুই হাল দিছু, আর তুই বেটার-ঘর ভটভটাছিস, শালো।
ক্ষেমা দাও কেনে বাপ, মোর কাথাটা কেনে শুনিলু না! মুই ত ওর্নিং দিছু তোমাক, নিরাপদ দূরত্ব থেকে আসিন্দির হাত জোড় করে।
শালো তোর ওর্নিং-এর পাছত মাররা। চায়ের কাপটা নিয়ে মেয়ে এসে গয়ানাথের সামনে দাঁড়ায়–ঠোঁটে আঁচলচাপা দিয়ে ও আসিন্দিরের উল্টোদিকে চেয়ে। চায়ের কাপটা গয়ানাথ হাতে নিতেই মেয়ে বারান্দায় পিড়ি পেতে বলে, বসিসি খাও বাপা। গয়ানাথ ততক্ষণে এক চুমুক দিয়ে ফেলেছে।
