তা করতে হলে তাকে আবার কাছারিতে গিয়ে মুহুরিবাবুকে বলে আসতে হয়। কিন্তু গয়ানাথ আন্দাজ করছে যে আসিন্দির এখন যে-কোনো সময় এসে যেতে পারে। ময়নাগুড়িতে পঞ্চানন মল্লিকের সঙ্গে দেখা করার কথাটা তার মাথায় আসার ফলেই গয়ানাথের মনে হচ্ছে যে আসিন্দির দেরি করছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে বোঝেও, আসিন্দির যে-কোনো সময় এসে যাবে এখন। গয়ানাথ চায়ের দোকানের বেঞ্চিটাতে বসেই থাকে। এদিক-ওদিক তাকায়, বাস-মিনিবাস দেখে, বড় ব্রিজ দিয়ে যে-সব রিক্সা কাছারির দিকে মোেড় নিচ্ছে সেটাও দেখে।
আসিন্দিরের যে কথাটা শুনে গয়ানাথ চমকে তাকিয়ে দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে আসিন্দির ভটভটিয়াতে আওয়াজ করছে তা হল–নিদ যাছেন নাকি বাপা হে? গয়ানাথ চমকে উঠে দেখে আসিন্দির তার ভটভটিয়ার ওপর বসেই হো-হো হাসছে। আসিন্দিরের হাসি দু-একজন দেখে আর গয়ানাথ বেঞ্চ থেকে উঠে চাদর ঠিক করতে-করতে নিজের অপ্রস্তুতি কাটায়।
হাসি থামিয়ে আসিন্দির বলে, এইঠে তোমার চক্ষুর ওপর দিয়া গেছু আর তোমরালা দেখিবার পাও না? ঐঠে কোর্ট তোমরা নাই রো। মুহুরিবাবু কহে উ ত চলি গেইছে। ত, ভাবিছু-কি, বাপোটা মোর ঠিক পি-ডবলু-ডির মোড়টা বসি আছে। এইঠে আসি তোমাক দেখি প্যাক প্যাক দিছু, শোন নাই। ডাকিছু। শোন নাই—
আসিন্দিরের এই কথা জুড়ে গয়ানাথ তার পেছনে ওঠে, বসে, চাদর ঠিক করে। আসিন্দির গাড়ি চালানো শুরু করলে তার কথা থামিয়ে দিয়ে বলে, ময়নাগুড়িত্ পঞ্চানন মল্লিকের ঘরত যাম।
গাড়ি থামিয়ে আসিন্দির ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করে, পঞ্চানন মল্লিক? বাপো, উত্তরখণ্ড ধরিবেন নাকি হে? তারপর রাস্তায় ওঠার মুখে মোটর সাইকেলটা থামিয়ে দেয়।
আচমকা থামানো মোটর সাইকেলটা কাঁপছে, তার ওপর গয়ানাথও কাঁপছে, আসিন্দির দু দিকে মাটিতে পা নামিয়ে দিয়েছে, তার ঘাড় ঘোরানো। এরকম অবস্থায় গয়ানাথ তার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে, ধরিম ত, উত্তরখণ্ড ধরিম। মুই না ধরো, ত তোক দিয়া ধরাম। না ত তোর এই কোর্ট আর হাকিম করি আর-জোতজমি সামলিবার পারিবেন না হে।
আসিন্দির তার ডান হাতটা তুলে হ্যাঁণ্ডেলের ওপর ফেলে চেঁচিয়ে ওঠে, তাই কহ, বাপা আমারস এ্যালায় লিডার হওয়া ধরিবে, বাপা আমার লিডার হবে এ্যালায়, উত্তরখণ্ডের লিডার। সে গাড়ি ছাড়ে।
একটু পরে পেছন থেকে গয়ানাথ চিৎকার করে, শুন, এ্যালায় মুই না যাও, তুই যা কেনে–
আসিন্দির কথাটা স্পষ্ট শুনতে পায় না। গতি না কমিয়ে ঘাড়টা ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করে, কোটত যাম? ময়নাগুড়িত যাছি ত।
আসিন্দিরের পিঠে স্পর্শ দিয়ে গয়ানাথ বোঝায়–ঠিকই যাচ্ছে। সামনে তিস্তা ব্রিজের মাথা আকাশে।
আসিন্দির ঘাড় ঘুরিয়ে চিৎকার করে, কী? কহিছেন কী?
আবার আসিন্দিরের পিঠে হাত দিয়ে গয়ানাথ চিৎকার করে, কহিম, কহিম। এ্যালায় চল কেনে ময়নাগুড়ি। গলাটা আরো উঠিয়ে বলে, আগত চৌপত্তিতে নামিবু।
.
১৫৭. শব্দের অর্থ নিয়ে পঞ্চানন-গয়ানাথের বিচার ও সিদ্ধান্ত
ময়নাগুড়িতে পঞ্চানন মল্লিকের বাড়িতে যাওয়ার আগে চৌপত্তিতে মরণাদ ঘোষের দোকানে দুকাপ চা খেতে-খেতে গয়ানাথ ও আসিন্দিরের মধ্যে একটা আলোচনা হয়। গয়ানাথ বলে, প্রথমেই তার যোগ দেয়াটা ভাল হবে না। সে যোগ দিলে সরকার তার মামলা-মোকদ্দমা ডিসমিস করে দিতে পারে। তা ছাড়া, সেইবা একেবারে প্রথম থেকে পুরোপুরি যাবে কেন। সামনে ভোট আসছে। গয়ানাথের হাতে ভোট ও নেহাৎ কম, নেই। আসিন্দির গেলে–সব পার্টিই ভয় পাবে যে জামাই শ্বশুরকে টেনে নিতে পারে। কিন্তু গয়ানাথকে কেউ জিগগেস করলে সে বলতে পারবে–মোর জোয়াইখান ত জোতদারি না করে, কনট্রাক্টারি করে। মোর কথা ও না শুনে।
গয়ানাথের একথার আসিন্দির বলে, মোক হাউলি খাটাবার চাছেন? আসিন্দিরের ধারণা–এ-সবে এখন আর কেউ ভোলে না। সবাইই বুঝবে, গয়ানাথ নিজে না গিয়ে আসিন্দিরকে হাউলি খাটাচ্ছে। তাতে জাতও যাবে, পেটও ভরবে না। যেতে হলে গয়ানাথ-আসিন্দির দুজনেরই যাওয়া উচিত। তাতে সবাই একটু নাড়া খেতে পারে। লিডারি করিবার চাহেন ত লিডারি করিবার নাগিবে। লিডারি কি হাউলি দিয়া হয়? না হয়।
গয়ানাথ কিছুটা দুর্বলভাবেই বলে যে এদের লিডারটিডার সব ঠিক হয়েই আছে, সে গেলেই কি তাকে লিডার বানাবে নাকি।
আসিন্দির তাতেও তাকে বলে বসে, কহেন কী? গয়ানাথ জোতদার জয়েন দিলে সেইটা ত একখান জোর খবর হবা ধরিবে উত্তরখণ্ডের পাকে। তোমরালা কি চ্যাংড়ার ঘর যে ভলান্টিয়ার করিবেন? তোমরালা জয়েন দিলেই লিডার। ফলে, চা শেষ করে মোটর সাইকেলে চড়ে যখন পঞ্চানন মল্লিকের বাড়িতে যায়, তখন তারা কিছুটা দ্বিধার আছে। উত্তরখণ্ডে যোগ দেবে–এই পর্যন্তই ঠিক। আসিন্দির যেমন বলছে গয়ানাথ যোগ দিলে হৈ-হৈ বাধবেই, গয়ানাথ তেমনি চাইছে–অত হৈ-হৈ-এর দরকার কী?
পঞ্চানন মল্লিক দুপুর বেলা ঘুমুচ্ছিলেন। তার দারিঘরে গয়ানাথ ও আসিন্দিরকে বসানো হয়। একটি ছোট ছেলে একটা কাসার ঘটিতে জল আর স্টেইনলেস স্টিলের গেলাস দিয়ে যায়। পঞ্চানন মল্লিকের দারিঘরে একটা বড় তক্তপোশ আছে, আবার একটা টেবিল আর কিছু চেয়ারও আছে। দারিঘরে ঢুকে তাকিয়ে গয়ানাথ যেন স্থির করতে পারে না কোথায় বসবে। পেছন থেকে আসিন্দির বলে, চেয়ারঠে বসেন, মুই পাছত বসিছু। আসিন্দির গিয়ে তক্তপোশটায় বসে। গয়ানাথ চেয়ারে বসলে আসিন্দির পেছনে পড়ে যায়, গয়ানাথ চেয়ারটা একটু-একটু ঘুরিয়ে বসে। কিন্তু হেলান দেয় না। গয়ানাথ যেন এখনো উঠে যেতে পারে–তার মুখচোখে সেই রকম অনিশ্চয়তা। আসিন্দির-জিজ্ঞাসা করে, তোমরালা চেনেন ত পঞ্চানন মল্লিক?
