গয়ানাথ যে এরকম উদাহরণ পরম্পরায় নিজের যুক্তিকে শক্ত করে, তা নয়। কিন্তু সে যখন বোঝে তাকে উত্তরখণ্ডে যেতেই হচ্ছে তখন তাকে তার জীবনদর্শন থেকেই ত যুক্তি সংগ্রহ করতে হয়। এমন যদি হত সে উত্তরখণ্ড করাটাকে বরাবরই জরুরি ভাবছে–তা হলে ত সে প্রথম থেকেই সেখানে থাকত। বরং গয়ানাথ বোঝে যে চাষ-আবাদের কাজে সরকারের সঙ্গে সাগাইকুটুমের মত সম্পর্করাখা ভাল। এখন যা চাষ-আবাদ দাঁড়িয়েছে তাতে সরকারের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক না থাকলে চাষ-আবাদ করাই সম্ভব নয়। বরং উত্তরখণ্ড-টণ্ড এই সব পাট্টিপুট্টি ধরলে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে। আর গয়ানাথের মত একজন জোতদারের সমর্থন পেলে উত্তরখণ্ডিলা চাহিবে মোক উশুল করিবার, আর, লাল পার্টি চাহিবে মোর মানষিগিলাক উশুল করিবার। তাতে ত গণ্ডগোল আরো বাড়বে। কিন্তু গয়ানাথের যে একটা পাবলিক দরকার, সেই পাবলিক সে পাবে কোথায়, এক উত্তরখণ্ড ছাড়া?
গয়ানাথ উকিলবাবুর বারান্দা থেকে নেমে কাছারির দিকে হাঁটা শুরু করে। রাস্তায় রিক্সা সাইকেল ভটভটিয়া নেমে গেছে–লোকজন অফিসে যাচ্ছে। ধীরে-ধীরে রওনা দিলে সে সময়মত কাছারিতে পৌঁছতে পারবে। মুহুরিবাবুর কাছ থেকে লিস্টটা নিলেই ত কাজ শেষ। তার মধ্যে আসিন্দির এলে হয়।
.
১৫৬. গয়ানাথের উত্তরখণ্ডে যোগদানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা
গয়ানাথ যখন উকিলবাবুর বাড়ি থেকে বেরয় তখন তার মনে অন্য একটা হিশেবও ছিল। মুহুরিবাবু কোর্টে গিয়ে যদি অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তা হলে গয়ানাথকে সেই বিকেল পর্যন্ত বসিয়ে রাখবে।
সন্তোষ মুহুরি হয়ত রাখতও তাই। গয়ানাথকে দেখেই সে সামনের লোকজন দেখিয়ে বলে, গয়ানাথবাবু, এদের সবার কেস উঠেছে, আপনি একটু বসুন, এদের বিদায় করেই আপনার কাজে হাত দেব।
গয়ানাথ হাতজোড় করে, আজি মোক ছাড়ি দিবার নাগিবে। যাবার তানে ময়নাগুড়ি থামিম। আপুনি মোর কাগজখান দেন। আর যদি না-দেন পাঠি দিবেন।
গয়ানাথ জোতদারকে সাধারণত বসিয়ে রাখা যায় বটে কিন্তু সেরেস্তার এমন পয়সাঅলা মক্কেল যখন কাজটা করে দিতে বলে তখন সন্তোষ মুহুরি কেন, তার উকিলবাবুরও ক্ষমতা নেই কাজটা না করার। গয়ানাথ তার নিজের এই ক্ষমতা সবটুকু জানে না। কিন্তু সে অন্তত এটুকু বোঝে যে ময়নাগুড়িতে নামতে হলে এখানে বিকেল পর্যন্ত থাকলে চলবে না।
মুহুরিবাবু বলে, আপনি বসেন, বসেন, ঐ চেয়ারটাতে বসেন, একজন সেই হাতলভাঙা চেয়ারে বসে ছিল, সন্তোষ তাকে উঠিয়ে দিতে-দিতে নিজের বুকপকেট থেকে একগাদা কাগজ বের করে নানা, রকম ভাজ করা কাগজ, একটা ছোট নোটবইসহ। প্রায় প্রত্যেকটা কাগজই দেখে সন্তোষ, কিন্তু অত্যন্ত দ্রুত। তার দেখার সঙ্গে তাল রেখেই জিভ দিয়ে দই খাওয়ার মত আওয়াজ ওঠে।নেই বলে সন্তোষ সেই কাগজগুলি আবার বুকপকেটে ভরে, এই, গয়ানাথবাবুকে চা দাও, এই এক কাপ চা আনো ত, সন্তোষ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে বলে। তারপর নিজের সেই বড় ডায়রিটার পাতাগুলো উল্টে যায়। প্রায় প্রতিটি পাতাই উল্টোয় ও দই খাওয়ার শব্দ করে। উল্টোতে-উল্টোতে হঠাৎ থেমে যায় সন্তোষ, মুখের আওয়াজটাও বন্ধ হয়। যে-পর্যন্ত উল্টেছিল সেখানে একটা আঙুল রেখে সন্তোষ ডায়রির মলাটের খাপটার ভেতর দেখে। তার পর হাসি মুখে গয়ানাথের দিকে তাকিয়ে বলে, পেয়েছি, পেয়েছি।
গয়ানাথ বলে, কী, কী নাগিবে দেখেন।
ডায়রির ভেতর থেকে একটা ইনল্যান্ড বের করে খুলে পড়ে সন্তোষ বলে, আপনার ঐ ২৩১ নম্বর দাগের পর্চাটা।
সে ত আপনার প্রথমঠে আপনার কাছেই
অ্যাঁ? তা হলে বোধহয় আর-এক কপি লাগবে। নাকি এটা ২৩৩ নম্বর দাগ?
২৩৩ নিয়া ত কুনো মামলা নাই।
সে না থাকলেও লাগতে পারে।
সন্তোষ যে-লোকটিকে পাঠিয়েছিল সে এককাপ চা এনে গয়ানাথকে দেয়। গয়ানাথ চায়ে একটা চুমুক দিলে সন্তোষ বলে, গয়ানাথবাবু, আপনি বরং এই চিঠিটা নিয়ে যান, কাউকে দেখিয়ে নেবেন কী কী লাগবে, সেগুলো নিয়ে আসেন, আমি তখন দেখে নেব। এদের সবার কেসের ডাক পড়বে, এখনি।
আচ্ছা, আচ্ছা আমাকে দিয়া দ্যান, সন্তোষের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে সেটা ভাজ করে পকেটে ঢোকাতে গয়ানাথকে চায়ের কাপটা টেবিলে রাখতে হয়; কিন্তু যদি কুনো কুনো দলিল আপনারঠে থাকে?
সে ত আমি যখন পাঠাব, তখন দেখেই দেব, সন্তোষ না-তাকিয়ে বলে।
চাটা আর-এক চুমুকে শেষ হয়ে যায়। গয়ানাথ উঠে বলে, আচ্ছা মুহুরিবাবু, নমস্কার।
সন্তোষ মুখ তুলে হ্যাঁ, নমস্কার, বলে আবার টেবিলের ওপর ঘাড় নামিয়ে ফেলে।
গয়ানাথ রাস্তায় নেমে ভাবে, আসিন্দিরের জন্যে কোথায় পঁড়াবে? সেটা ভাবতে-ভাবতেই আসিন্দিরের আসার পথের বাকটা দিয়ে বড় রাস্তার দিকে হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে গয়ানাথ ঠিক করে ফেলে সোজা পি-ডবলু-ডির মোড়ে গিয়ে অপেক্ষা করবে।
পি-ডবলু-ডির মোড়ে স্কুলবোর্ডের অফিসের সামনে অনেকগুলো চায়ের দোকান। তার বাইরের দিকের একটা বেঞ্চের এক কোণে সে বসে। রোদের আচ গায়ে লাগে–কিন্তু সে ত আর চা খাবে না তাই আর ভেতরে বসছে না। শহরের ভেতর থেকে সব বাস-মিনিবাসই এখান থেকে তিস্তাব্রিজের দিকে বাক নিচ্ছে, এখানে দাঁড়াচ্ছেও কিছুক্ষণ। যে-কোনো গাড়িতে উঠলেই আধঘণ্টার মধ্যে ময়নাগুড়ি। গয়ানাথ এক-একবার ভাবে সে বরং মুহুরিবাবুকে বলে বাসে করে ময়নাগুড়িতে চলে যাক! মুহুরিবাবু আসিন্দিরকে ময়নাগুড়ি চৌপত্তিতে মরণ ঘোষের দোকানে পাঠিয়ে দেবে। গয়ানাথ ইতিমধ্যে উত্তরখণ্ডের সভাপতি পঞ্চানন মল্লিকের সঙ্গে দেখা সেরে ফেলবে।
