উকিলবাবুর বারান্দায় বসে গয়ানাথ একটু ভাবেও বটে। উকিলবাবু যা বলেছেন সে যে তা মনে-মনে ভাবে নি, তা নয়। যে-সাংঘাতিক ব্যারেজ তৈরি হচ্ছে তাতে গয়ানাথের জমি ত নস্যি। কিন্তু যত বড় ব্যারেজই হোক, গয়ানাথের জমি ত গয়ানাথের জমি। সরকার একটা দাম ধরে ক্ষতিপূরণ দিলেই ত আর সেই ক্ষতিপূরণের টাকা দিয়ে গয়ানাথ নতুন কোনো জমি কিনতে পারছে না। আর, কিনতে পারলেই ত আর পুরনো জমি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ক্ষতিটা পূরণ হয় না। জমি কি সরকারি অফিসের লোকদের মাইনে নাকি যে প্রত্যেক মাসের পয়লাতারিখে একই মাইনে পাবে? এমনিই ত জোতজমি রাখার আর-কোনো আইন নেই। সব আইনই জোতজমি ছাড়ার। আধিয়ারকেও জমি রেকর্ড করতে দিলে আর জোতদারের হাতে খতিয়ানটুকুর কাগজ ছাড়া থাকেটা কী? তাই হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে। গয়ানাথের জোতদারির-সময়টা ত এতেই গেল। জোতদারের থাকবে খতিয়ান আর জমি খাবে বারখান ভূত।
এই রাগের হিশেবনিকেশের মধ্যে গয়ানাথ ভোলে নি যে জমি তার হাত থেকে যতই চলে যাক না–জোতদারি তার বাবার আমল থেকে অনেক বেড়েছে। সেইখান ত হবা ধরিছে চাষের তানে। এ্যালায় চাষ কতখান বাড়ি গিছে। সার কতখান বাড়ি গিছে। পতিত জমি কত কমি গিছে।
কিন্তু সেটাও যে এই সরকারেরই সমর্থনে, নিজের সঙ্গে নিজের গোপন আলাপেও গয়ানাথ সেটা মানতে চায় না, এ্যালায় হামরালায় পুরা জমি থাকিলে ক্যানং ফলন হবার ধরিত। কিন্তু এখনকার এই চাষ কি অত জমিতে করা সম্ভব হত, এবং এই ত বেশ ভাল ব্যবস্থা হয়েছে–জমি একটু কমেছে বটে কিন্তু চাষ অনেক বেড়েছে। গয়ানাথ এটা জানে, না-জেনে উপায় নেই বলে। কিন্তু নিজের কাছেও তার না মানলে চলে, তাই মানে না।
মানে ত নাইই বরং গয়ানাথ মনে-মনে উকিলবাবুর কথাগুলোকে নিজের মত করে সাজিয়ে নেয়। জোতদারি আর আগের নাখান চলিবে না। হাকিম বদলি গেইছে। আইন বদলি গেইছে। ব্যারেজের জমি আর ফেরৎ পাওয়ার না-হয়। এই সরকারের আইনে ফেরৎ পাওয়ার না-হয়। কামতাপুরী রাজ্য করেন। স্যালায় নতুন রাজ্যের নতুন আইনত ফেরৎ পাইবেন। জমি ফেরৎ পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকলে ত গয়ানাথই উত্তরখণ্ডের নেতা হয়ে বসত। কিন্তু তারা এখানকার কিছু লোক মিলে গোটা একটা রাজ্য বানাতে পারবে–এটা গয়ানাথ বিশ্বাসই করে না। অথচ, তার চলাফেরায় সে বুঝে ফেলেছে উত্তরখণ্ড পাছে হয়ে যায় সেজন্যেও সরকার অনেক কিছু দিতে রাজি আছে। উত্তরখণ্ড পাছে হয়ে যায়, এটা নিয়ে সরকার প্রায় সব সময়ই ভয়ে-ভয়ে থাকে। ভয়ে-ভয়েই যখন আছে তখন ভয় দেখাতে আর আপত্তি কী? আর, ভয় দেখালেই যদি সরকার ভয় পায় তা হলে গয়ানাথই বা একটু ভয় দেখাবে না কেন?
তবুও উত্তরখণ্ড দলে যোগ দিতে গয়ানাথের যেটুকু সঙ্কোচ তা রাজনীতি না করার সঙ্কোচ। তার বাবার আমল থেকে সে দেখে আসছে এই সব পার্টিপুর্টি মানেই জোতদারির ক্ষতি।সে কংগ্রেসরই ঘর হোক আর কমিনিস্টের ঘরই হোক। যায় জোতদারি করে স্যালায় জোতদারি করে, স্যালায় পার্টি ধরিবার টাইম না পায়। স্যালায় পার্টি করিবার ধরিলে, স্যালায় জোতদারি উঠি যায়। স্যালায় জাতদারি ছাড়ি দেউনিয়াগিরি করিবার ধরে। দেউনিয়াগিরির পয়সা বেশি, নগদ পয়সা, কিন্তু জোতদারি নাই।
অভিজ্ঞতা ও জীবনদর্শন মিশিয়ে গয়ানাথ এই ধারণাটা বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সে যে বানিয়ে ফেলেছে, তা সে জানে না। তথ্য দিয়ে এ কথা সে প্রমাণ করতেও পারবে না, পার্টি করলে জোতদারি টেকানো যায় না। এটাও প্রমাণ করতে পারবে না, পাটি করা মানেই দেউনিয়াগিরি করা। বরং, হয়ত উল্টোটাই সত্য। তার ধারণার পক্ষেও খুঁজে পেতে কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করা যায়। কিন্তু গয়ানাথের এই ধারণা তৈরি হওয়ার পেছনে এরকম সাক্ষ্য প্রমাণ বা অভিজ্ঞতা কাজ করে নি। গয়ানাথ এমনই আপাদমস্তক জোতদার যে সে জমি ও চাষের নিয়মের বাইরের যে-কোনো নিয়মই অপ্রয়োজনীয় ভাবে। সেই ভাবনাকে তার জীবনদর্শন বলা যায়। তার জোতদারি তাকে কখনো কংগ্রেস করতে দেয় নি–ভোটাভুটির সময় লোকজন নিয়ে গিয়ে একটা ভোট দিয়ে আসা সেটা ত বিয়েশাদির নেমতন্ন খাওয়ার মত ব্যাপার। সেই জীবনদর্শনেই তার বেধেছে উত্তরখণ্ডে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে। কিন্তু গয়ানাথ যেন গন্ধ পাচ্ছে তাকে যোগ দিতেই হবে, সে যোগ দেবেও।
এ্যালায় টাইম পড়ি গেইসে পাবলিকের। যে কাম তোমরালা পাবলিক জোগাড় করি করিবেন না, সেকাম হবার না-হয়। আধিয়ারগিলা পাবলিক হয়্যা গিছে, সেইলার কাম হছে। জোতদারগিলারও পাবলিক হবা নাগিবে–স্যালায় কাম হবে।
কিন্তু নিজের সঙ্গে এই সংলাপে গয়ানাথ এসে ঠেকে এই প্রশ্নে, কিন্তু মোর কামটা কী?
এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর সে নিজের ভেতর থেকে টেনে বের করতে পারে না; তার কারণ, গয়ানাথ নিজে নিজের সেই উত্তরের সবটুকু জেনে নিতে চায় না। উত্তরখণ্ড করিলে কি ব্যারেজত মোর যেই জমিগিলা গিসে, স্যালায় ফিরি আসিবে? গয়ানাথ এর জবাব নিশ্চিত জানে, না। তাই সে প্রশ্নটাকে এভাবে তুলতে চায় না। তবু জমি, তোমার বাপ-ঠাকুর্দার জমি, যদি কেউ নিতে আসে তাকে বাধা দিতে হয়, আটকাতে হয়। লাঠিসোটা নিয়ে দখল করতে এলে লাঠিসোটা নিয়ে বাধা দিতে হয়। আল কেটে জমির ভেতর ঢুকতে চাইলে আল বেঁধে আটকাতে হয়। ফসল তুলে জমির ওপর চাষ কায়েম করতে এলে, উপড়ে ফেলে বাধা দিতে হয়। সরকার নোটিশ জারি করে নিতে এলে কোর্টের নোটিশ দিয়ে বাধা দিতে হয়। গয়ানাথ তা দিচ্ছেও। পাট্টিপুট্টি যদি পাবলিক করি জমি নিবার আসে, স্যালায় পাবলিক করি বাধা দিতে হয়। উত্তরখণ্ড গয়ানাথের পাবলিক।
