সে ত হবেই। আপনার জমির মামলার জন্যে ত আর ব্যারেজের কাজ আটকে থাকবে না। তাও ত আপনার কাছে অন্তত একটা ভাল খবর পাওয়া গেল যে তিস্তা ব্যারেজের কাজ তাড়াতাড়ি হচ্ছে। আমাদের ত একটা রাস্তা রিপেয়ার করতেই আঠার মাস। উকিলবাবু কথাটা শেষ করেন ভদ্রলোক দুজনের দিকে তাকিয়ে। উকিলবাবু, সম্ভবত যিনি প্রথম চেয়ারটিতে বসে ছিলেন, তার কাজই করছিলেন, ফলে, তিনি একটু বিরক্তির সঙ্গেই হেসে গয়ানাথের দিকে তাকান। গয়ানাথও হাসে–ভদ্রলোকদের সঙ্গে কোথাও বসলে ভদ্রলোকরা যা করেন তারও তাই করার অভ্যেস। হেসেও সে বলে, কিন্তু ব্যারেজ শেষ হয়্যা গেইলে মোর জমির কী হবে উকিলবাবু।
উকিলবাবু বলেন, আপনার ত ক্ষতিপূরণের মামলা। জিতলেনও ত একটা। সেরকমই হবে। কিন্তু ব্যারেজ যে-জমি নিয়েছে সেটা কি-আর ফেরত দেবে নাকি?
হামরালা ত কহিছি–মোর ক্ষতিপূরণ না নাগে, মোর পুরানা ভেস্ট জমিঠে সমপরিমাণ জমি ফেরৎ দিক সরকার। মামলার আলোচনা শুরু হতেই গয়ানাথ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারে।
হ্যাঁ। সে রিট ত করা হয়েছে। আপনার কথার মধ্যে ত সত্যি একটা যুক্তি আছে। হাকিম একথা মানতেও পারে। কিন্তু মামলার ব্যাপার। তার জন্যে ত আর ব্যারাজের কাজ আটকে থাকবে না। উকিলবাবু একটু জোরে-জোরে বলেন, যেন গয়ানাথ কানে একটু খাটো।
গয়ানাথ একটু চুপ করে থেকে বলে, কাছারিও ত সরকারেরই অফিস, হাকিম ত সরকারেরই মাহিনা পাছেন। একবার ব্যারেজঘান বান্ধা হই গেলে কি আর হামলার মামলার কথা হাকিম ভাববেন?
উকিলবাবু একটু চুপ করে থাকেন, তারপর তার সামনের কাগজের ওপর চোখ নামিয়ে বলেন–তার গলার স্বর এবার উঁচুতে ওঠে না, গয়ানাথবাবু আপনাদের ত কয়েক পুরুষের জোতদারি, জোতদারি কত পালটি গেছে, দেখেন না? আপনাকেও পুরানা জোতদারি ভুলতে হবে। কোর্ট-হাইকোর্টও বদলে গেছে। একটা ব্যারেজ তৈরি হবে+সেটা সরকারের কাজ। সেটা বন্ধ করে আপনার জমি উদ্ধার করে দেবে এটা আর ভাববেন না। কিন্তু ক্ষতিপূরণ যেন ন্যায্য হয়, বা, আপনি যা বললেন, ক্ষতিপূরণের বদলে কেউ যদি এই ব্যারেজের জন্যে নেয়া জমিটাকে ভেস্ট করে দিয়ে পুরনো ভেস্ট ফেরৎ পায় সেটা নিশ্চয়ই কোর্ট দেখবে, উকিলবাবু সোজা হয়ে বসে কলমটা তুলে নেন, এই পর্যন্ত আইনের কথা আর তা না হলে ত আপনাকে পার্টি বানাতে হয়, উত্তরখণ্ড পার্টি। তারা ত কামতাপুর রাজ্য চায়, পশ্চিমবঙ্গ থেকে আলাদা রাজ্য। সেই রাজ্যের হাইকোর্ট হলে হয়ত আপনার পক্ষে রায় দেরেব্যারেজ ভেঙে গয়ানাথবাবুর জমি গয়ানাথ বাবুকে দিয়ে দাও। ময়নাগুড়িতে ত বিরাট কনফারেন্স হচ্ছে। না?
গয়ানাথ মাথা হেলথ বাবুকে দিয়ে দাওলে হয়ত আপনার।
আপনি আছেন নাকি উত্তরখণ্ডে?উকিলবাবু লেখা শুরু করতে করতে জিজ্ঞাসা করেন। গয়ানাথ বোঝে না, কী জবাব দেবে। উকিলবাবুর কথা থেকে সে এটা বুঝে গেছে উত্তরখণ্ড উকিলবাবুর পছন্দ –কিন্তু গয়ানাথের জমির কথা যদি উকিলবাবুর বদলে উত্তরখণ্ড বেশি জোর দিয়ে বলে, তা হলে গয়ানাথ উত্তরখণ্ড হবেইনা কেন? গয়ানাথ একটা জবাব ভাবতে-ভাবতে দেখে উকিলবাবু লেখা শুরু করে দিয়েছেন। সে আস্তে করে চেয়ার ছেড়ে ওঠে, খুব নিচু স্বরে নমস্কার বলে চেয়ারের পাশ দিয়ে পেছনে চলে যায়। পেছনে তক্তপোশের ওপর মহুরিবাবু বসে আছেন। গয়ানাথ হাতের ভরে তার দিকে এগিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞাসা করে, কী কী নকল করিবার নাগিবে, কহেন।
বসেন, বলে মুহুরিবাবু তার ডায়রির পাতা উল্টে অনেক ভাজ করা কাগজ খুলে-খুলে দেখে। শেষে না পেয়ে বলে, আপনি আসছেন ত কোর্টে, আমি বের করে রাখছি। গয়ানাথ এবার জিজ্ঞাসা করে, যে-দলিলগিলা নকল করিবার নাগিবে সেগিলা কি আপনার কাছে, না মোর কাছে?
মুহুরি বলে, দেখতে হবে। আপনি কোর্টে আসেন ত। আমি বের করে রাখব। গয়ানাথ আস্তে করে উকিলবাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে!
.
১৫৫. গয়ানাথের পাবলিক সন্ধান
গয়ানাথ বারান্দায় বসে। এ-রকম বসাটাই তার অভ্যেস, তারপর উকিলবাবুর সঙ্গে, বা পেছনে-পেছনে কাছারি যাওয়া। গয়ানাথ ত কখনো ঘড়ি দেখে কাজ করে না–সারাটা দিনের হিশেবে কাজ করে। সকালে উঠে যেখানে যাওয়ার কথা সেই জোতের উদ্দেশে রওনা দিল। রাস্তায় আরো দু-চার জায়গা ঘুরেও যেতে পারে। দুপুরে খাওয়ার জন্যে তাকে ফিরতেই হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। আর ফিরবে না, এমন কোনো কথাও নেই। ফিরল ত ফিরল। ফিরল না, ত ফিরল না। এখন সন্ধ্যার পরে বড় একটা কোথাও যায় না সেই নাকশালিয়া হাঙ্গামার সময় থেকে রাতে বেরনো বন্ধ। একটা অভ্যেস নষ্ট হলে আর ফিরে আসে না।
জলপাইগুড়িতে এলে এটাই তার একটা অসুবিধে। ঘণ্টাখানেক পরে আসবেন, বা, সাড়ে বারটা নাগাদ দেখা করেন, এই সব কথা অনুযায়ী নিজের যাতায়াত ঠিক করাটা তার পক্ষে একটু অভ্যেসের বাইরে। তা ছাড়া, শহরে তার এত বেশি কাজ হাতে থাকে না যে এক কাজ সেরে ফেলার মাঝখানে আরো একটা কাজ সেরে ফেলবে। অথচ জোতজমিতে চলাফেরার সময় ঘড়ি ছাড়াই গয়ানাথ সময়ের মাপ রাখে বৈকি। শহরে সে-মাপটাও হারিয়ে যায়। সে বুঝতে পারে না যে এখন যদি ধীরে-ধীরে হেঁটে কাছারিতে গিয়ে বসে থাকে, তা হলে, সেটা কত আগে পৌঁছুনো হবে।
