মোটর সাইকেলে চলতে-চলতে ত আর দুজনের কোনো কথা হতে পারে না কিন্তু গয়ানাথের মনে নানা প্রশ্ন উঠছিল উত্তরখণ্ড নিয়ে। সে-সব কথা আসিন্দিরকে বলা যায়, কিছু খবর জানা যায়। কিন্তু এখনই কথাটা না বলে, পরে, ধীরেসুস্থে আলাপ-আলোচনার অভ্যেস ত গয়ানাথের নেই। তাই কথাগুলো তখন বলতে না পারায় সেটা তার নিজের সঙ্গেই সংলাপ হয়ে দাঁড়ায়। বরাবর কংগ্রেসের লোক গয়ানাথ, কংগ্রেসকেই ভোট দিয়ে আসে। কিন্তু গয়ানাথ জোতদারের মত বিখ্যাত লোক ত শুধু একজন ভোটার হতে পারে না–জোতজমিতে বসত দেয়া কয়েকশ লোক তার কথাতেই ত ভোট দেয়। নইলে তার সম্মান থাকে কোথায় যদি সে একা গিয়ে শুধু নিজের ভোটটাই দিয়ে আসে? ভোটের আগে তেমন কোনো আদেশনির্দেশ গয়ানাথকে কখনো দিতেই হয় নি–সবাই জানে কী করতে হবে। কিন্তু সবাই ত জানত ফরেস্টটা গয়ানাথের। সেই জানায় ত তার কোনো লাভ হল না। তা হলে, গয়ানাথ আর মানষির দল কংগ্রেসেরই পাকে থাকিবেন এই কথাটার ত কোনো লাভ নাই। তা হইলে এই সব মানষিক নিয়া গয়ানাথ নিজের জোরখান ত দেখাবার পারে।
উকিলবাবুর বাড়ির সামনের মাঠটুকুতে মোটর সাইকেল থেকে নামার আগে গয়ানাথ নিজেকে এই পর্যন্ত বোঝাতে পারে।
.
১৫৪. উকিলবাবু বনাম উত্তরখণ্ড
উকিলবাবুর বাড়ির সামনের মাঠটাতে আসিন্দিরের মোটর সাইকেলের পেছন থেকে নেমে গয়ানাথ হাতদুটো মাথার ওপর তুলে আড়মুড়ি ভাঙে। আসিন্দির মোটর সাইকেলটা ঘুরিয়ে নিতে নিতে বলে, আসিছু। কিন্তু রওনা হয়েও আচমকা থেমে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করে–এইঠে আসিম, না চলি যাম? আড়মুড়ি ভাঙার টানেই হাতদুটো পেছনে নিয়ে গয়ানাথ ঘাড়টা নিচু করে। শরীরের শক্ত টানটান ভাবটা শিথিল হওয়া পর্যন্ত রাস্তায় আসিন্দির ভটভট করতে করতে দাঁড়িয়ে থাকে। গয়ানাথ মুখ খুলে জবাব দেয় না ডান হাত তুলে আঙুল দিয়ে দেখায়। আসিন্দির তার অর্থ বোঝে–কোর্টে যেতে হবে। গয়ানাথ এবার উকিলবাবুর সেরেস্তার দরজায় সোজাসুজি গিয়ে দাঁড়ায়। উকিলবাবু বা তার মুহুরি তাকে একবার দেখে নিলেই গয়ানাথের কাজ শেষ। যখন দরকার, উকিলবাবুই তাকে ডাকবেন বা কোনো খবর দেয়ার থাকলে মুহুরিকে বলে পাঠাবেন। মুহুরিবাবু হয়ত গয়ানাথকে বলবে–কোর্টে দেখা করতে। ততক্ষণে গয়ানাথ এই মাঠটাতে দাঁড়িয়ে বা ঘুরেফিরে একটু-আধটু রোদ পোয়াতে পারে। বাইরের বারান্দার বেঞ্চির ওপরও বসে থাকতে পারে। এমন-কি, উকিলবাবুর সেরেস্তার কাজ শেষ হয়ে যাবার পর, সব লোকজন চলে যাবার পর, মুহুরি বাবুও সাইকেলে তার বাড়িতে চলে গেলে, গয়ানাথ হয়ত এখানে বসেই থাকবে। উকিলবাবু মানখাওয়াদাওয়া সেরে রিক্সায় কোর্টে রওনা হওয়ার সময় হয়ত বলবেন, কী গয়ানাথ বাবু! চলেন, কাছারিতে চলেন। উকিলবাবুর সঙ্গে রিক্সায় কোর্টে যাওয়ার অন্য লোক থাকলে হয়ত বলবেন, কী গয়ানাথ বাবু, আসেন, কোর্টে আসেন। গয়ানাথ তখন হাঁটতে-হাঁটতে কোর্টে রওনা দেবে।
গয়ানাথ তার বাবার সঙ্গে এই উকিলবাবুর বাড়িতে এসেছে। তখন এই উকিলবাবুর বাবা বুড়া উকিলবাবুর সেরেস্তা। তিস্তা ব্রিজ হয় নি। ডুয়ার্স থেকে সকালে এসে বিকেলে ফিরে যাওয়া খুব কঠিন। তখন উকিলবাবুদের এই নতুন দালানঘর ওঠে নি। এখানে চেগারের বেড়ায় টিনের দরজা ছিল বাড়ির ভেতরের সঙ্গে বাড়ির বাইরের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এই মাঠটার পশ্চিম কোণে একটা কুয়ো ও পায়খানা ছিল। গয়ানাথ তার বাবার সঙ্গে আসত শীতের সময় গরুর গাড়ি নিয়ে মার নৌকোয় তিস্তা পার হয়েও এসেছে। এই মাঠে ইটের উনুনে রান্না হত। আর সন্ধ্যার পর সেরেস্তার বারান্দার চৌকিতে তারা শুয়ে থাকত। কোর্টকাছারির কাজ শেষ করে দু-একদিন পর আবার রওনা দিত। তখন, জলপাইগুড়ি শহরে একবার ঘুরে গেলেই মনে হত যেন দেশান্তরে বেরিয়ে এল। আর এখন, এই ত সকালে বাড়ি ছেড়ে এসেছে, দুপুরে গিয়ে আবার বাড়িতে ভাত খাবে। জলপাইগুড়ি শহরটাকে আর দেশান্তর মনে হয় না। আগে বছরে দু-একদিন কোর্টকাছারির কাজ ছিল কি ছিল না, এখন রোজ এলে রোজই কাজ থাকে।
গয়ানাথ উকিলবাবুর সেরেস্তায় ওঠে–দরজার কাছে গিয়ে মুহুরিবাবুকে বলবে যে উকিলবাবুকে যেন জানায় গয়ানাথ এসেছে। কিন্তু মুহুরিবাবু দেখার আগেই উকিলবাবু গয়ানাথকে দেখে ফেলেন, আরে গয়ানাথবাবু, আসেন, আসেন।
উকিলবাবু তার হাতের কলমটা কাগজের ওপর ফেলে হাতদুটো মাথার ওপর তুলে এমন আড়মুড়ি ভাঙেন যে মনে হয় তিনি গয়ানাথবাবুর জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন। গয়ানাথ দু জন ভদ্রলোককে ছাড়িয়ে গিয়ে খালি চেয়ারটাতে বসেন। উকিলবাবু বলেন, কলকাতার উকিল চিঠি দিয়েছেন, এখান থেকে কয়েকটা কাগজ কপি করে পাঠাতে হবে। উকিলবাবু এবার মুহুরির দিকে তাকান, সন্তোষ, তোমার কাছে লিস্টটা আছে ত?
মুহুরিবাবু জানান, হ্যাঁ, আছে।
উকিলবাবু এবার আবার গয়ানাথের দিকে তাকিয়ে বলেন, তা হলে আপনি কোর্টে গিয়ে সন্তোষের সঙ্গে দেখা করে যা করার করে দেবেন।
গয়ানাথ উকিলবাবুর দিকে তাকিয়ে বলে, আপুনির শরীরখান ভাল ত?
উকিলবাবু, হ্যাঁ, ভালই আছি, বলে হাতদুটো কাগজের ওপর নামান বটে কিন্তু কলমটা ধরেন না। কলমটা ধরে ফেললে গয়ানাথ আর কথা বলতে পারবে না অথচ যত দরকারই থাকুক, গয়ানাথের পক্ষে ত আর উকিলবাবুকে সরাসরি কিছু জিজ্ঞাসা করা সম্ভব নয়। গয়ানাথ এবার পাশের দুই ভদ্রলোকের দিকে তাকায়। ঠিক তার বাঁ পাশের ভদ্রলোককে সে দেখতে পায় না, কিন্তু প্রথম চেয়ারটির ভদ্রলোক উকিলবাবুর টেবিলের ওপর দুই হাতের কনুই রেখে হাত দুটো ঠোঁটের কাছে এনে রেখেছেন। চিনতে পারে না গয়ানাথ। এখানে আসতে-আসতে উকিলবাবুর অনেক ভদ্রলোক-মক্কেল গয়ানাথের মুখ চেনা হয়ে গেছে। গয়ানাথ একটু সঙ্কোচ বোধ করে, এদের সামনে উকিলবাবুকে আর কী জিজ্ঞাসা করবে। উকিলবাবুও চেয়ারে সোজা হচ্ছেন। এখন তিনি আবার কলমটা তুলে নেবেন। গয়ানাথবাবুর সঙ্গে তার এর বেশি কথা আর কবে হয়েছে। গয়ানাথ চেয়ার ছেড়ে ওঠে না। উকিলবাবু কলমটা তুলে নেয়ার আগেই বলে ফেলতে পারে, উকিলবাবু, কলিকাতার কুনো খবর কি পাওয়া গেল? কথাটা গয়ানাথ টেবিলের ওপর একটু এগিয়ে, একটু হেসে, খুব নিচু গলায় বলে যাতে পাশের ভদ্রলোক শুনতে না পান। কিন্তু উকিলবাবুও সম্পূর্ণটা শুনতে পান নি। তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে বলেন, হ্যাঁ? কী বললেন? কিসের খবর? গয়ানাথ এবার চেয়ারে আরো একটু এগিয়ে আসে, টেবিলের ওপর তার হাতদুটি আঙুলে-আঙুলে জড়িয়ে শুইয়ে রেখে। একটু হেসে বাধিত হওয়ার ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করে, বলিছি, কলিকাতার হাইকোর্টের মামলাখান শ্যাষ হইবার কুনো আন্দাজ কি পাওয়া গেইসে? ওদিকে ত ব্যারেজের থাম্বাগিলান নদীখানক অর্ধেক করি দিবার ধরিছে।
