কিন্তু তিস্তা ব্যারেজের সেই-যে স্পেশ্যাল সেটলমেন্ট শুরু হল, তারপর থেকে গয়ানাথের যেন আর বিশ্রাম নেই। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে তার অংশের খতিয়ান নিয়ে মামলা, ব্যারেজের জন্যে জমি নিয়ে নেয়া হয়েছে তার বিরুদ্ধে মামলা, ক্ষতিপূরণের হারের বিরুদ্ধে মামলা-যেন মামলার কুরুক্ষেত্র। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বিরুদ্ধে মামলায় ত কিছু স্টে অর্ডার গয়ানাথ বের করেত পেরেছে। কিন্তু ক্ষতিপূরণের মামলা আর জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে মামলা কলকাতার হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। জলপাইগুড়ির উকিলবাবুর লোকই কলকাতার উকিল ধরে দিয়েছে। গয়ানাথকে যেতে হয় নি, কিন্তু প্রথম বার, উকিলবাবুর লোকের সঙ্গে আসিন্দিরকে যেতে হয়েছিল। তার পর সে মামলা চলছে ত চলছেই। একবার একটা ক্ষতিপূরণের মামলা গয়ানাথ জিতেছে–সরকারও সেই আদেশের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করে নি। বরং কোর্টের রায় অনুযায়ী নতুন হিশেবনিকেশ করে পাওনাগণ্ডা সাত-তাড়াতাড়ি মিটিয়ে দিয়েছে। গয়ানাথ যখন দেখল সরকার আপিল করল না, তখন সে আরো বেশি ক্ষতিপূরণের জন্যে আপিল করতে চাইলে তার উকিলবাবু বুঝিয়েছিলেন যে ওরকম আপিল করা যায় না। গয়ানাথ বুঝে ফেলে সরকার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যারেজটা শেষ করতে চায় বলেই কোর্টের হুকুম মাথা পেতে নিচ্ছে। তা হলে ব্যারেজটা হচ্ছেই–এটা গয়ানাথ বুঝে নিয়ে আরো অস্থির হয়ে ওঠে।
আগে আসিন্দির তার মোটর সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াত আর গয়ানাথ তার জোতজমিতে হেঁটে বেড়াত। কিন্তু ঐ স্পেশ্যাল সেটলমেন্টের পর থেকে গত কয়েক বছরে আসিন্দির, তার মোটর সাইকেল, আর গয়ানাথ এক হয়ে গেছে। ময়নাগুড়ির চৌপত্তি দিয়ে গয়ানাথ-আসিন্দিরের যাওয়ার কথা নয়। ভারতী সিনেমার কাছে ডান দিকের রাস্তা ধরে তারা বেরিয়ে যেতে পারত। কিন্তু ময়নাগুড়িতে মরণচাঁদের দোকানে মিষ্টি আর চা খাবে বলে তারা চৌপত্তিতে আসে। মোটর সাইকেলের পেছন থেকে নেমে গয়ানাথ চাদরটা ঝাড়ে। তারপর একবার তাকিয়ে দেখে, চেনাজানা কাউকে পায় কি না। সামনে, রাস্তার ওদিকে একটা মিনিবাসের ভেতরে লোজন, গাড়িটা আরো দু-চারজন প্যাসেঞ্জার নেওয়ার জন্যে দাঁড়িয়ে। যতক্ষণ আসিন্দির তার মোটর সাইকেল দাঁড় করিয়ে মরণচাঁদের দোকানে ঢুকে দুই জায়গায় দুইটা করি বোল্ডার, দুই কাপ চা, বলে বসে, তার মধ্যে গয়ানাথ রাস্তা পেরিয়ে ঐ মিনিবাসটায় একটা পাক দিয়ে আসে–চেনা কাউকে পায় না। কিন্তু ফেরার সময় চৌপত্তিজোড়া ফেস্টুনটা তার নজরে পড়ে। উত্তরখণ্ড সম্মিলন হচ্ছে ময়নাগুড়িতে। গয়ানাথের কাছে ওরা একবার গিয়েছিল। কিন্তু গয়ানাথ এ-সবের মধ্যে যায় নি। রাস্তা পেরবার জন্যে এদিক-ওদিকে তাকাতে গিয়ে গয়ানাথ দেখে উত্তরখণ্ডের অনেক পোস্টার।
মরণচাঁদের দোকানে ঢুকে, আসিন্দিরের পাশে বসতে বসতে গয়ানাথ বলে, হেপাখে এই উত্তরখণ্ড মানষিগিলান খুব মিটিং দিবার ধরিছেন। তারপর বিরাট সাইজের লালচে রসগোল্লা চামচ দিয়ে কাটে–রসগোল্লার ওপর থেকে মাছিগুলো উড়ে যায়।
আসিন্দিরের রসগোল্লা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সে চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, তোমাক কহিলাম জয়েন দেন। বোম্বাইঠে সিনেমার বেটিছোঁয়া আনিবার ধরিছে।
প্রথম বার চামচে যতটা মুখে দিতে পেরেছিল সেটা চিবিয়ে গয়ানাথ গেলে। রস তার দাঁতে লাগলে সিড়সিড় করে। তাই কৌশল করে রসগোল্লার টুকরোটা টাকরার পেছন দিকে নিয়ে জিভ দিয়ে চিপে খেতে হয়। একটু সময় লাগে।
দ্বিতীয় টুকরোটা মুখে ফেলার জন্যে চামচে তুলতে-তুলতে গয়ানাথ আসিন্দিরকে বলে, মোক কি বেটিছছায়ার নখত নাচিবার নাগিবে এলায়?
আসিন্দির চা শেষ করে জিভ দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছিল শব্দ করে। সেটা থামিয়ে জবাব দেয়, আপনাক নাচিবার কায় কহে? ইমরায় ত রাজবংশীর তানে পার্টি খুলিছে। এলায় ত কংগ্রেস নাই, সগায় উত্তরখণ্ড হবা চাহে। তোমরালাইবা হবেন না কেনে? কত ত মামলা ঠুকিছেন সরকারের তানে কী হইল?
কথাটা বলতে বলতে পকেট থেকে সিগারেট-দেশলাই বের করে আসিন্দির দোকানের বাইরে চলে যায়। বাইরে গিয়ে সে সিগারেট ধরায় আর ভেতরে গয়ানাথ অনেকক্ষণ ধরে দ্বিতীয় রসগোল্লাটা শেষ করে। পুরো এক গ্লাশ জল খায়। ততক্ষণে তার চায়ে পুরু সর পড়েছে। কিন্তু সেই চাটাও গয়ানাথ তারিয়ে-তারিয়ে খায়। এই সমস্ত ত একা-একাই করতে হয়–উত্তরখণ্ডে যোগ দেয়ার ব্যাপারে আসিন্দিরের প্রস্তাবটায় অতক্ষণ নীরব থেকে।
পয়সা দিয়ে গয়ানাথ বাইরে আসতে-আসতেই আসিন্দির মোটর সাইকেলের ওপর বসে স্টার্ট দেয়। গয়ানাথ তার চাদরটা বুকের ওপর আড়াআড়ি দিতে-দিতে আবার সেই নীল ফেস্টুন ও পোস্টারগুলো দেখে। দুপা এগিয়ে যায় মোটর সাইকেলের পেছন দিকে। আবার বলে, খুব জোর শুরু করিবার ধরিছেন হে তোমার উত্তরখণ্ড। কিন্তু মোটর সাইকেলের আওয়াজে কথাটা শোনা যায় না। আসিন্দির পেছন দিকে হাত বাড়িয়ে পান, আর চুন-লাগানো বোটা, দেয়। গয়ানাথ সেটা নেয় না। আগে পাদানিটার ওপর ভর দিয়ে আসনে বসে, নড়েচড়ে ঠিক হয়, তারপর পানটা ধরে। গয়ানাথ পানটা নিতেই আসিন্দির মুখ বাড়িয়ে পিক ফেলে মোটর সাইকেলটা চালাতে শুরু করে। আসিন্দিরের পেছনে মোটর সাইকেলে বসতে এতই অভ্যস্ত হয়ে গেছে গয়ানাথ যে সে পানটা ঝেড়ে মুখে ঢোকাতে পারে। দাঁতটাত পড়ে যাওয়ায় গয়ানাথের মুখটা এতই চুপসানো যে পানটায় তার মুখটা একেবারে ভরে যায়।
