এরকম ভাবেই বাঘারু এখানে, এই রংধামালির বাধে গয়ানাথের, ও ফ্লাড কমে যাওয়ার, অপেক্ষায় দিন কাটায়।
বন্যা ত আর অনন্তকাল ধরে চলে না–একদিন না-একদিন শেষ হয়। কিন্তু কবে শেষ হয় তার ওপর নির্ভর করবে খবরের কাগজ, টেলিভিশন এ-সব এই বন্যার কথা কতটা বলবে,কতটা দেখাবে। বিদ্যুতের মত এসে বজ্রপাতের মত মৃত্যু ঘটাতে পারে যদি কোনো ফ্লাড, তবে দীর্ঘস্থায়ী না হলেও সেটা খবর হতে পারে। তিস্তার সেবারের বন্যাটাও খবর হয়ে উঠল–বেশ ক-দিন থেকে গিয়ে। ফলে কলকাতা থেকে কাগজের ফটোগ্রাফাররা আর টিভির ক্যামেরাম্যান এসে পড়তে পারে। কিন্তু তাদের সব সময়ই তাড়াতাড়ি ফেরার তাড়া থাকে। সেই জন্যে জেলার তথ্য ও জনসংযোগ দপ্তর থেকে। শহরের পাশের এই দুটো জায়গা দেখিয়ে দেয়া হত। জলপাইগুড়ি শহর থেকে আট মাইল ভাটিতে মণ্ডলঘাটের দুনম্বর চর আর মাইল চার-পাঁচ উজানে এই রংধামালির বাঁধ। দুই জায়গাতেই কিছু বানভাসি পরিবার উঠে এসেছে, গরুবাছুরও আছে, গবর্মেন্টের ত্রিপলও আছে। রংধামালি হাটের বিশেষ সুবিধে এই যে দেখেই সোজা তিস্তা ব্রিজ দিয়ে ডুয়ার্সে চলে যাওয়া যায়।
এ-রকম সব সময়, বিশেষত টিভির লোকজন যখন এসেছিল, তখন ক্যামেরাম্যান ও কাগজের ফটোগ্রাফাররা বাঘারুকে আবিষ্কার করে ফেলে। জেলা তথ্য ও জনসংযোগ দপ্তর অবিশ্যি একটা তালিকা দিয়েছে। তাতে কোথায় কত লোককে উদ্ধার করা হয়েছে তার হিশেব ছিল। কিন্তু সে হিশেবের মধ্যে বাঘারুর কোনো আলাদা পরিচয় ছিল না। ততদিনে, সেদিন সন্ধ্যার বাঘারুউদ্ধার কাহিনী সরকারি সংখ্যাতত্ত্বের ভেতর একটা সংখ্যামাত্র হয়ে গেছে, বা তাও হয়েছে কিনা সন্দেহ। ফটোর লোকজনেরা বাঘারুকে আবিষ্কার করেছে নিজেদের গুণেই।
এমনি ত তিস্তার জল পেছনে রেখে বুড়োবুড়ি, মোষ, গরুমাছরু, বাচ্চাকোলে মা, জলের বিস্তার–এ-সব ছবি তোলা হচ্ছিলই। বাঘারু যে জায়গায় তার গাছ বেঁধেছিল সেখানে ফটোর লোজনদের পৌঁছুনোরই কথা নয়। কিন্তু টিভির ক্যামেরাম্যান একটা দূরদৃশ্যে বাধ থেকে তিস্তাটাকে গোল করে বা থেকে ডাইনে ফিরে আসতে-আসতে ভিউফাইন্ডারে বাঘারুকে পেয়ে যায়–বাঘারু দাঁড়িয়ে আছে, দড়ির বান্ডিল গলায়, গাছের মাচানে, গাছপালার মধ্যেই, মনে হচ্ছিল যেন জল থেকে কুঁড়ে বেরচ্ছে। প্যানিং শেষ হলে ক্যামেরা নিয়ে ক্যামেরাম্যান বাঘারুর সামনে চলে যায়, বাঁধ থেকে ঢাল বেয়ে নেমে বোল্ডারের শেষ পাড়টুকুতে জলের কিনারে হাঁটু গেড়ে বসে সে জলের ভেতর থেকে শাল গাছ-চাপা গাছ-খয়ের গাছ-সিসু গাছ সহ এক প্রায়-ফরেস্ট নিয়ে উত্থিত বাঘারুকে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের সামনে দাঁড় করাতে চায়। অতটা না পেলেও, অনেকটা পায়। সে যতটা চাইছিল ততটা পেতে গেলে তাকে জলের ওপর শুয়ে ক্যামেরা আকাশের দিকে তুলে ছবি তুলতে হত। সে অবিশ্যি বাঘারুকে একট মুভ করতে বলে, কিন্তু বাঘারু নড়ে না। ফলে ছবিটাকে স্থিরচিত্র মনে হতে পারে বলে তার ভয় হয়।
টিভির ক্যামেরাম্যানের পেছনে-পেছনে কাগজের ফটোগ্রাফাররাও এসে দৌড়তে-দৌড়তে ছবি তুলতে থাকে। টেলি ও ওয়াইডে বাঘারুর নেংটিপরা শরীর, মুখরেখা ও বধসহ বন্যার পরিধি ধরা পড়ে যায়। তারাও বাঘারুকে ঘুরেফিরে দাঁড়াতে বলে কিন্তু বাঘারু স্থিরই দাঁড়িয়ে ছিল। ফটোগ্রাফারদের মধ্যে ভাল ভিসুয়ালের জন্যে প্রতিযোগিতার উত্তেজনার মধ্যেই এমন রসিকতাও চলছিল,লোয়ার পার্টে টেলি ফেলো না, দেখিস, আবার নেংটির ভেতরের লোমটোমসুষ্ঠু তুলে ফেলিস না, ইত্যাদি। এতটা নগ্ন অথচ এতটা গোটা একটা শরীরকে লেন্সে সামলানো শক্ত। টিভির ক্যামেরাম্যান অবিশ্যি একেবারে তলা থেকে আকাশ পর্যন্ত একটা দারুণ প্যানিং করেছে–বন্যার জল, ক্লোজ-আপে আবর্ত, গাছের ডালপালায় জলের স্রোতের আঘাত, আরো ডালপালা, বাঘারুর দুটো পা-ক্লোজ-আপে, ধীরে-ধীরে হাঁটু, উরু, কোমর, নেংটি। মিডিয়াম শটে পেট, বুক, তারপর মাথা। সেখান থেকে বাঘারু ধীরে-ধীরে, দিগন্ত থেকে দিগন্তে, আকাশে নদীতে, স্থাপিত হয়।
.
গয়ানাথের আসা পর্যন্ত এ-সবের মধ্যেই বাঘারুর বৃক্ষপর্ব কাটে।
৫.১ মিছিলপর্ব – উত্তরখণ্ডের স্বতন্ত্র রাজ্য দাবি
১৫৩. গয়ানাথের স্বগত চিন্তা
গয়ানাথ জোতদার সাত-সকালে আসিন্দিরের মোটর সাইকেলের পেছনে বসে জলপাইগুড়ি শহরে তার উকিলবাবুর বাড়ি যাচ্ছিল। এখনো ঠিক আছে, ফেরার সময় বাসে ফিরবে, আসিন্দির তার কাজে চলে যাবে। সেই যে তিস্তা ব্যারেজের সেটলমেন্টের সময় শুরু হয়েছিল–এখন সে ব্যারেজ গত কয়েক বছরে নদীর মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে গেছে–আসিন্দির তার শ্বশুর গয়ানাথের ড্রাইভারই হয়ে গেছে অনেকটা। গয়ানাথ জোতদারের মত বিখ্যাত লোকের নাম এখন লাটাগুড়ি রামসাই-ওদলা বাড়ি-ক্রান্তিহাট-মৌলানি, এমন-কি ময়নাগুড়িতেও, ভটভটি জোতদার বলেই চালু হচ্ছে। প্রথম-প্রথম লোকে আড়ালে বলত, এখন অনেকে তাকে এ ভটভটি দেউনিয়া বলে ডেকেও ফেলে। গয়ানাথ এই নিয়ে রাগারাগি ছেড়ে দিয়েছে।
মোটর সাইকেল ত আসিন্দিরের অনেক কালই আছে। কিন্তু আগে গয়ানাথ কখনো তার পেছনে উঠত না, ওঠার দরকারও পড়ত না। জলপাইগুড়ি শহরে তার বাবার আমলের বাধা উকিলবাবু আছেন। তার বাবা থেকে তার সময়ের মধ্যে বুড়া উকিলবাবুর ছোঁয়া উকিল হল, বুড়া উকিলবাবু মারাও গেলেন, এখন সেই ছোঁয়া উকিলবাবু হয়েছেন। তেমন দরকারে উকিলবাবুই লোক পাঠিয়ে ক্রান্তিহাটে খবর দিতেন, পরদিন সকালের বাসে জলপাইগুড়ি গিয়ে উকিলবাবুর সঙ্গে কথা বলে বিকেলের মধ্যে গয়ানাথ ফিরে আসতে পারত।
