বাঁধে এসে বাঘারু এই নতুন একটি নাম পেয়েছে, গাছারু। সে তার নাম বলেনি কিংবা বললেও বাধসুদ্ধ লোক তা জানতে পারত না। তারা তাকে নিজেদের একটা ডাকনাম দিতই। বাঘারুর গলার নাইলনের দড়ির বান্ডিলটা নিয়ে সেনামটা তৈরি হতে পারত। কিন্তু হয়ে ওঠেনি। অতগুলো গাছ আর সেই গাছের সঙ্গেই বাঘারুর শরীর বাধা, আবার, সেই গাছের মাচানেই বাঘারুর শোয়াবসা–এই সব কারণে গাছারু নামটাই চালু হয়ে গেছে। এ-চরে পূর্ববঙ্গের লোকরা অনেকে আছে–সেদিক থেকে গাছুয়াই হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ভাষাতত্ত্বের বহির্ভূত কারণে নামকরণ ইত্যাদির ব্যাপারে পূর্ববঙ্গের এই লোকরাও তিস্তাপারের আদি নিয়মকানুনই মেনে ফেলে।
বাঁধে বাঘারু, গয়ানাথ ও আসিন্দিরের জন্যে অপেক্ষা করে। এই অপেক্ষা করা ছাড়া তার আর-কোনো কাজ নেই। এই বন্যা, হাওয়া, বৃষ্টি থামতে-থামতে আসিন্দিরের ভটভটিয়াতে চড়ে গয়ানাথ ঠিক এসে যাবে। বেশি খুঁজতে হবে না গয়ানাথকে–ঠিক জেনে যাবে বাঘারু রাংধামালির বাঁধে এসে ঠেকেছে।
কিন্তু সেসব কোনো কিছুতেই বাঘারুর কোনো ভূমিকা নেই। তাকে দূর থেকে নিয়ে এসে গাজোলডোবা থেকে ফ্লাডে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল। সে বিশ্বস্তভাবে ভেসে এসেছে। সে যেখানে ঠেকে যাবে সেখানেই যেন থেকে যায়। সে ফ্লাডের ভেতর ঐ চরে আটকে গিয়েছিল–এখন এই বাধে এসে আটকে আছে। এখন আর তার শরীর এই ফ্লাডের সঙ্গে জড়িয়ে নেই। গয়ানাথের জন্যে অপেক্ষা দিয়ে এই বৃক্ষপর্ব শেষ হতে পারে।
নিতাই যে-রিলিফের ব্যবস্থা করে ফেরে–তার ভাগ বাঘারুও পায়। এরকম বানভাসি রিলিফে ত প্রত্যেকের নামে আলাদা করে চিড়েগুড় লিখতে হয় না–তাই মোট হিশেবের মধ্যে বাঘারু ঢুকে যায়। কিন্তু ফ্লাড, হাওয়া ও বৃষ্টি না কমলে চালগমের ব্যবস্থা হবে, ফ্লাডের জন্য নেমে যাওয়ার পরও নিতাইদের চর না শুকলে কাপড়, জামা, কম্বল ও ক্যাশডোলেরও ব্যবস্থা হবে–তখনো যদি বাঘারুকে চরুয়াদের একজন হয়ে থাকতে হয় তা হলে তার পুরনো নামধাম দরকার হবে, নতুন ডাকনামে চলবে না।
কিন্তু সে-সম্ভাবনা দুই কারণে কম। চরের লোকজন ঐ চরেরই লোক বলে যে বিশেষ সুযোগসুবিধে পাবে তাতে বাঘারুকে ঢোকাতে চাইবে না। এই সব সুযোগসুবিধে দেয়া হয় পরিবারের ভিত্তিতে। বাঘারু চরের কারো পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নয়। তৎসত্ত্বেও ফ্লাড়ের তিস্তায় অনেকে যেমন ভেসে-আসা টিনের চাল পর্যন্ত পেয়ে যেতে পারে, বা, শালের খুঁটি, ভামনির চাল, বাঁশের খুঁটি ত পেতেই পারে–তেমনি বাঘারুর মত ভেসে-আসা জোয়ান কাজের মানষিও পেয়ে যেতে পারে। নরেশ বা অমূল্য তা হলে বাঘারুকে নিজেদের পরিবারভুক্ত দেখাতেও পারত ও বাঘারুর প্রাপ্য জামাকাপড়, কম্বল, চালগম এ-সব পেতেও পারত। কিন্তু বাঘারু বড় বেশিবার গয়ানাথ জোতদারের নাম বলে বলে এটা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে-তার একখান দেউনিয়া আছে, সেই দেউনিয়ার গাছগুলোই সে সঙ্গে নিয়ে এসেছে (এই শেষের কথাটি অবিশ্যি কোনো সময়ই খুব স্পষ্ট হয়নি)। তাছাড়া, অতগুলো গাছ ত একটা সম্পত্তির মত। বাঘারুকে দেখেই বোঝা যায়, এ-সম্পত্তি তার ত হতেই পারে না, বরং এই গাছগুলোর যেমন মালিক আছে, তারও তেমনি মালিক আছে। চরের লোকজন সম্পত্তির নিয়মকানুন জানে। তাই, নরেশ বা অমূল্যর মত সম্পত্তির মালিক, বাঘারু ও গাছের সম্পত্তির মালিকের সম্পত্তিতে ভাগ বসায় না। বাঘারু চরুয়াদের একজন হয়ে যেতে পারে না, এটা তার একটা কারণ। তাই চরুয়া বানভাসি হিশেবে তার নাম রেকর্ড হয় না।
দ্বিতীয় ও আর-একটি কারণ হল-বাঘারুকে ও গাছগুলোকে গয়ানাথ এতদিন এখানে কখনোই ফেলে রাখবে না। সে এই বৃষ্টি-হাওয়া ও বন্যার মধ্যে এসেই বাঘারুকে ও গাছগুলোকে ধরে ফেলবে। বাঘারু গয়ানাথের যেমন তেমনি গয়ানাথেরই থাকবে। বরং গাছগুলো গয়ানাথ এখানেও বেচে দিতে পারে। কিন্তু বাঘারুকে আবার তার জায়গায় পাঠিয়ে দেবে।
এখন দেখে বোঝার উপায় থাকে না মাত্র দু-চারদিন আগেও তিস্তা এরকম ছিল না, সামনে নিতাইদের চরে ভরভরন্ত গ্রাম ছিল, এই বাধটা ফাঁকা ছিল। এখন দেখে মনে হয়, তিস্তায় যেন সারা বছরই এ-রকম ফ্লাড় থাকে আর এই লোকজন এই বাঁধেরই বাসিন্দে। এরা সব এক গ্রামেরই লোক, ফলে বাধে এসে ওঠার পর সেই গ্রামের নিয়মেই বসবাস চালিয়ে যেতে কোনো অসুবিধে হয়নি। শুধু প্রতিদিনের কাজটা নেই–সেই কাকডাকা ভোর থেকে কাকের বাসায় ফেরা সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ। তার বদলে অবিশ্যি কেউ-কেউ রিলিফ-টিলিফ নিয়ে কিছু ব্যস্ত হয়ে পড়ে, কেউ-কেউ আবার শহরের জীবনযাপনের আস্বাদ ভোগ করতে থাকে। সিনেমা দেখা ত আছেই, তা ছাড়াও শহরের মধ্যেই ঘোরাফেরা। কেউ-কেউ আবার দিনবাজারের কাছে মেয়েদের পাড়ায় যাতায়াত করছে। ফলে, কখনো কখনো যেন মনে হয়–এরা যেন এই বাঁধের স্থায়ী বাসিন্দে, তেমনি কখনোকখনো আবার মনে হয়–এরা গ্রামসুদ্ধ লোক যেন ছুটি কাটাতে এখানে এসে উঠেছে। এর মধ্যে অনেক দিন ধরে জমিয়ে রাখা সর্ষে, বা তক্তা, বা বাঁশের জিনিশপত্র দিনবাজারে নিয়ে বিক্রি করার সুযোগ কারো কারো এসে যায়।
বাঘারু অতগুলো গাছ নিয়ে বাঁধেরই এক কোণে, এদের মধ্যেই অথচ এদেরই একজন না-হয়ে যে দিন কাটাচ্ছে তাও নজরে পড়ে যায় কারো। এমনি বাঘারু যদি থাকত, তা হলে তাকে কেউ দেখত না, কিন্তু সে যে অতগুলো গাছ আগলে বসে আছে তাতেই যাদের দেখার তারা তাকে ও তার গাছগুলোকে দেখে ফেলে। তাদের কেউ-কেউ এসে বাঘারুর সঙ্গে কথাবার্তাও বলে।
