নরেশ বাঘারুকে জিজ্ঞাসা করে, গয়ানাথ জোতদারের ঠিকানাটা কন তালি।
মুই জানো না। লিখি দেন গয়ানাথ জোতদার।
আরে তা ত, লিখ্যাই ফেইলছে। সে জোতদার থাকে কই? ঘরডা কুথায় সেডা কইবেন ত?
সবঠে থাকে। এইঠে আসিবে।
বাঘারুর কথা শুনে নরেশ আবার হেসে ওঠে, মুখে হাত চাপা দিয়ে। এবার অফিসার জিজ্ঞাসা করে না, কী হল। হাসি শেষ করে নরেশই বলে, স্যার, বলে, অর জোতদার গয়ানাথ সব জায়গাতেই থাকে, এইহানেও থাকে।
অফিসার একটু ভাবে, গয়ানাথের নাম ত সবাইই জানে। ও কোথায় নদীতে পড়ল সেটা জিগগেস করো, তাহলেই হবে।
নরেশ বাঘারুকে বলে, আপনে কোথ থিক্যা নদীত পইড়লেন, সেইডা কন।
বাঘারু একটু ভাবে। নরেশ তার নীরবতাকে মনে করে উত্তর দেওয়ায় আপত্তি। সে তাই আবার প্রশ্নটা করে, সেইডাও গয়ানাথ জানে নাকি? ভাইসলেন আপনে, আর জাইনবে গয়ানাথ?
ততক্ষণে বাঘারু নরেশের প্রশ্নটির জবাব পেয়ে যায়, মুই নদীত, পড়ো নাই।
এতক্ষণে বোধহয় বোঝা হয়ে গেছে যে বাঘারু আধপাগলার মতই জবাব দিয়ে যাবে, আর তাতে সবাইকে হেসে উঠতে হবে। নরেশের হাসিটাকে মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে বাঘারু তার জবাবের বাকিটুকু বলে, মুই ফ্লাড ভাসিছু।
হাসি থামিয়ে নরেশ বলে, স্যার, বলতেছে নদীতে পইড়্যা যায় নাই, ফ্লাডে ভাইসছে।
অফিসার যেন একটা ইশারা পায়। তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, হ্যাঁ, তাই ত, কোথায় ভেসেছে ফ্লাডে সেটা বলুক। আর নামটা?
অফিসারের কথা অনুযায়ী নরেশ বলে, ফ্লাডে ভাইসলেন কোখন? বলে নরেশের মনে হয়, এ ভাষাটা বাঘারু নাও বুঝতে পারে। সে রাজবংশী ভাষা মিশিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করে, কোটত ভাসিলেন ফ্লাড
বাঘারুর সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়, গাজোলডোবা। বাঘারুর উত্তর দেয়ার মধ্যে এমন একটা ভাব আসে যেন সে সব প্রশ্নেরই জবাব দিতে পারে, প্রশ্নটা যদি ঠিক ভাবে করা হয়।
একটা জায়গার নাম পেয়ে নরেশ উৎফুল্ল হয়ে এক লাফে অফিসারের কাছে এসে বলে, স্যার, কইছে, কইছে।
কী বলেছে?
জায়গার নাম কইছে।
বলেছে ত বলছ না কেন? কৈাথা থেকে ভেসে এসেছে?
গাজোলডোবা।
অফিসার উচ্চারণ করে করে কাগজের টুকরোটাতে লেখে, জি, এ, জে, এ, এ, না, ও, এল, তারপর নরেশকে বলে, নামটা বের করো। ডি, ও, বি, এ। নরেশ আবার বাঘারুর কাছে ফিরে আসে–শুনেন। আপনার নামটা কয়্যা দ্যান, তাহালিই স্যার চইল্যা যাবার পারে। ঐডা ত লিখ্যা নিছে–গয়ানাথ জোতদার, গাজোলডোবা। এইবার আপনার নামডা কন।
গয়ানাথ জোতদার গাজোলডোবা না থাকে–বাঘারু বলে।
খাইছে। এই না কইলেন, আপনে গাজোলডোবা ভাইসছেন।
মুই ভাসিছু। গয়ানাথ না থাকে।
গয়ানাথ যেইখানে খুশি থাকুক গিয়া–আপনে ত গাজোলডোবার থিক্যা ফ্লাডে ভাইসছেন? তা হলিই হবে।
কী এক গাজোলডোবা-গাজোলডোবা করছ, ওটা ত হয়েই গেছে, অফিসার গলা তুলে নরেশকে বলে, এখন যদি বাঘারু আবার কিছু বলে গাজোলডোবা নামটা প্রত্যাহার করে নেয় তা হলে যেটুকু পাওয়া গেছে, সেটুকুও হারাতে হবে। অফিসারের দরকার ছিল একটা জায়গার নাম–সেটা সে পেয়ে গেছে। নামটা বের করতে পারো কিনা সেটা দেখোনইলে ছেড়ে দাও। যেন গাজোলডোবা থেকে একটা মানুষ ভেসে যাচ্ছিল, গাছগাছালির সঙ্গে ভেসে যাচ্ছিল, তাকে উদ্ধার করে আনা হয়েছে–অফিসারের রিপোর্টের পক্ষে এইটুকুই যথেষ্ট। এতক্ষণ ধরে এতটা দূরত্ব যে-ফ্লাডের ভেতর ভাসতে-ভাসতে এসেছে, সে ত এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে বা শক্ত হয়ে থাকতে পারে যে নিজের নামটা আর বলতে পারে না।
আপনার নামডা কন, নামডা, স্যার লিখবেনে। বাঘারু চুপ করে থাকে।
একটু সময় নিয়ে নরেশ বলে, কী, কইবেন না নামডা?
বাঘারু বলে, মোর নাম নাই রো।
নরেশ এবার না হেসে রেগে যায়, ফ্লাডে ভাইস্যা আসার আগে একখানা নাম দিবার পারেন নাই নিজের? ত এইখানে কম্বল, কাপড়, তিরপল, চিড়াগুড়–এইগুল্যা কুন নামে দিব আপনারে? না, এইগুলান লাগব না?
নরেশ আশা করেছিল, বাঘারু এত জিনিশের সম্ভাবনায় লোভী হয়ে উঠে নামটা বলে দিতে পারে। কিন্তু বাঘারু বলে, গয়ানাথর নাম দেন কেনে।
আরে–গয়ানাথ আবার? রিলিফ দিব আপনাক, আর নাম লিখব গয়ানাথের?
মোর না নাগে।
অফিসার ততক্ষণে গয়ানাথ জোতদারের জমিতে কর্মরত একজন কৃষিশ্রমিক কথাকটি লিখে ফেলে, ড্রাইভারকে বলে, চলো, আর নরেশকে বলে, ছেড়ে দাও। কার তোমরা যখন অফিসে যাবে তখন শুনে যেও।
.
১৫২. দেড় হাতি ত্যানার বন্ধন, নাইলনের দড়ির বন্ধন ও টিভি ক্যামেরা ইত্যাদি নিয়ে বৃক্ষপর্বের শেষ অধ্যায়
বৃক্ষপর্ব এখানেই শেষ হতে পারে। বৃক্ষপর্বে ত বাঘারু কী করে গয়ানাথের গাছগুলোর সঙ্গে ভেসে এসে নিতাইদের চরে উঠল ও সেখান থেকে রংধামালির বাধে উঠল তার কাহিনী। রংধামালিরাধে সেদিন বিকেলে নরেশকে অফিসার যা টাকা দেয়ার দিয়েছে। পরদিন অফিসে যেতে বলেছে। আর-একটা রশিদে আরো কিছু টাকা দিয়ে দেবে। বাঘারু যে তার নামটা বলে উঠতে পারেনি সেটা সেদিক থেকে ভালই হয়েছে–অফিসার নিজের মত কিছু একটা লিখে নিতে পেরেছে। একটা লোক, বাঘা, অথচ সে দুবার রেসকু হয়েছে–তা হলে ত তার একটা নাম নতুন হতেই হয়। বেশি লোক রেসকিউ করতে পারলে সেটা ত অফিসারের সার্ভিস ফাইলে লেখা থাকবে।
বাঘারু তার গাছগুলোকে নিয়ে একটু সরে গিয়েছে। সেখানেই বেঁধেছে। সে এই বাঁধের চরুয়াদের একজন নয়, কিন্তু আবার তাদেরই একজন। সে তার মাচানেই থাকে। মাঝেমধ্যে বাঁধের ওপরও ওঠে। কাদাখোয়ার সঙ্গে বাঘারুর আর দেখা হয় না। দেখা হয় না, মানে কথা হয় না। ওদের দুজনের পরস্পরকে বলার মতো কোনো কথা নেই। কাদাখোয়ার ত কাজকম্ম আছে–যদিও এখন কাজকৰ্ম্ম কমই। বাকি সময় সে গামছা দিয়ে মাথা মুড়ে বোল্ডারের ওপর ঘুমবে। বাঁধের লোকজন কোনো সময় বাঘারুকে কাদাখোয়া বলে ও কাদাখোয়াকে গাছারু বলে ডেকে ফেলে।
