অ্যাই, কহিছিস কী?
কুছু না, কুছু না, গন্ধে কাথা, বাঘারু মাঠের দিকে তাকিয়ে আধখানা সিগারেট টানে তর্জনী আর বুড়ো আঙুলে ধরে। কিন্তু তার আঙুলগুলি এতই থ্যাবড়া যে প্রায় অর্ধেক সিগারেট ঢাকা পড়ে যায়। ঠোঁট ছুঁচলো করে বাঘারু-ঠোঁট তার মোটা নয়। মাঠের মাঝখানে শাদা আর ছাই-ডাই বলদজোড়া নানা দিকে তাকিয়ে দেখছে, এক-একদিকে বেশ অনেকক্ষণ ধরে।
গয়ানাথ হাল দেবে বলেই দু-দুটো বলদ জোড়া হয়েছে। বলদেই টানুক। বুড়া শুধু ধরে থাকবে। এই সার্ভের সাহেব নাকি নাকশালিয়ার ঘর। যে-জোতদার নিজ চাষ দেখাবে, উমরাক নাকি কহিবে, চালাও, হাল চালাও, তারপর নাকি দুই হাত দেখিবার চাহিবে-নরম কি শক্ত, বেঁকে কি না-বেঁকে, গাও হাত দিলে বাবলা গাছের নাখান খড়খড় করে কি না করে, আর যায় হাল দিবার না পারিবে উমরাক ক্যানসেল করি দিবে, আধিয়ারের নামে জমি রেকর্ড করি দিবে।
গয়ানাথ তাই এখন হালুয়াগিরি শিখছে। আপলাদ ফরেস্টের পাশে, ফরেস্টের জমির সঙ্গে তার টানা জমি। নিজ চাষেই। সেখানে বাঘারু মাঝে-মাঝে চাষ করে, আরো কায়কায় করে। সেই জমিটা নিজচাষ রেকর্ড করার সময় সাহেব যদি গয়ানাথকে হাল চালিয়ে দৈখাতে বলে সে সত্যি হালয়া কি না! হাত গয়ানাথের এমন কিছু নরমও না, ফর্শাও না। কিন্তু হাল ত টানবে বলদ। বলদ ত চেনে বাঘারুকে। বলদ ত আর জানে না কে গিরি আর কে হালুয়া, আর কে সাহেব। শেষে, সাহেব যদি তাকে জমিতে নামায়, আর তখন যদি বলদ তার কথা না শোনে? তাই গয়ানাথ বাঘারুকে বলেছে, বলদটাকে একটু মোক চিনি দে কেনে বাঘারু, মোর আওয়াজ-টাওয়াজখান একটু চিনি দে।
আসিন্দির বলে, হে বাঘারু, তোর বুড়ার কি মাথাটা খারাপ হয়া গেইল রে? এ্যালায় হাল ড্রাইভ করিবার চাহে? বাঘারু এ কথার উত্তরে ঘুরে তাকায় না। মাঠের দিকে, বলদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, যেমন ঐ বলদ দুটিও আছে, সামনে, একটু নীচে, জমিতে হাল কাঁধে। তারপর বলে, কায় জানে? কালি হাটত শুনিবার পাছ সাহেব নাকি হাত টিপিবে, গাও টিপিবে, মাথা টিপিবে—
কথা শেষ হওয়ার আগে আসিন্দির জোরে হেসে ওঠে, এই প্রায়ান্ধকার উষার পক্ষে একটু বেশি জোরে, তোর আর বলদের ত একই বুদ্ধি। তোর সেটেলমেন্টের সাহেবের তানে কি বিয়া বসিবার ধইচছে হে কন্যার গাও টিপিবে, গাল টিপিবে? তারপর, আসিন্দিরের আরো কিছু মনে পড়ে, সে হো
হো হেসে গয়ানাথকে ইঙ্গিত করে বলে এই বুড়াখানের গাও টিপিলে ত জিভাখান বাহির হয়্যা যাবে, আর গাল টিপিলে ত সিনজাকাঠির [পাটকাঠি] নাখান হাড়গিলা মড় মড় করি ভাঙি যাবার ধরিবে।
গয়ানাথ দরজা খুলে বেরিয়ে খড়ম খটখটিয়ে কুয়োপাড়ের দিকে যায়, তার গায়ে ধুতির খুঁট। মুখে-চোখে জল দিয়ে আবার দ্রুত খটখটিয়ে ফিরে আসে। ঘরের ভেতর থেকে,-গেঞ্জি গায়ে দিয়ে, ধুতিটা হাঁটুর ওপর তুলে খড়মটা পায়েই, যেন তৈরি হয়ে, বেরিয়ে আসে। আসিন্দির তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখে। বুড়ো যখন দরজার পাশে খড়মটা খুলে উঠোনে নামে, আসিন্দির বলে-তোমরালার কাম কি ঐ মাঠে যাওয়ার? ছাড়ি দেন। উকিলবাবুকে পাঠি দেন। ঐঠে আমিন আছে, যা করিবার উমরায় করিবেন, তোমরালা এ্যালায় হাল ঠেলিবার ধরিছেন?
গয়ানাথ হেসে জবাব দেয়, কেনে রে বাউ, হালুয়ার জোয়াই হবার তানে লাজ লাগিছে? তারপর মাঠের দিকে তাড়াতাড়ি নামতে নামতে বলে, হে বাঘারু, চল কেনে।
আসিন্দিরও পেছন পেছন আসে মাঠের আলে নামে না। ওপর থেকে বলে,তোমাক এইখান বুদ্ধি কায় দিল, হাকিম কি ড্রাইভিং লাইসেন্স দিবেন নাকি?
আরে, কাল হাটত শুনিছু এ শালোর ঘর হাকিম নাকশালিয়া। হাত টিপিবে, গাও টিপিবে।
আরে, তোমার কি মাথা খারাপ করিবার ধরিছেন। সেটেলমেন্টের হাকিম আসি তোমার হাত দেখিয়া জমি রেকর্ড করিবেন? তোমরালার এই সব কাম কী? ছাড়ি দাও, মুই যায় ক্যাম্পত, দেখিম।
আরে বাপা, তুই ত তোর জীবনখানে একখানসেটেলমেনটোও দেখিস নাইরে বাপা। যেইঠে যা নিয়ম, করিবার নাগে। খতিয়ানও থাকিলে, আবার ধর কেনে এই পেরাকটিসও থাকিলো।
কিসের পেরাকটিস?
এই হালুয়াগিরির। যদি মোক আজি চাষ দিবার কহে?
তোমাক কোট হাল দিবার কহিবে?
ঐ ফরেস্টের জমিঠে
ত তুমি চলি আইস কেনে, মুই পেরাকটিস দিছু। হাকিম কহিলে কহিবেন, মুই বুড়া হছি, এ্যালায় মোর জোয়াইখান হাল দিছে, আসিন্দির পাড়ায়।
আরে, খাড়ো না কেনে বাউ, বলে গয়ানাথ তাড়াতাড়ি গিয়ে বলদের পেছনে হাল ধরে।
আসিন্দির চিৎকার করে ওঠে, হে বাপ, মোক ছাড়ি দাও, মুই চাষ দিছু। গয়ানাথ একবার হেট আওয়াজ করে। বদলদুটো লেজ নাড়ায়, মুখটাও একটু ঘোরায়, কিন্তু নড়ে না। হেট বলে আর-একবার আওয়াজ তোলে গয়ানাথ কিন্তু বলদ নড়ে না। বাঘারু পাশ থেকে জিভ দিয়ে ঈকরায় দুটো আওয়াজ তুলতেই বলদ দুটো পা ফেলে এগিয়ে যায়।
আসিন্দির চিৎকার করে ওঠে, হেই বাপ, তোমাকতয় মুই ফেলি দিম, ছাড়ি দাও। মুই যাছু, মোক দেও।
গয়ানাথ এবার ধমকে ওঠে, হে-ই, চুপ যা কেনে ছাগির বেটা, তোর কথা শুনি মোর জমিখান আজি খরচা করিবার ধরিম নাকি হে?
.
০১৭.
হাল, বলদ ও মোটরসাইকেল
আপলাদ ফরেস্টের সঙ্গে লাগোয়া জমিটার জন্যই এত ঝামেলা। ফরেস্টের সঙ্গে জমিটা এতই লাগানো যে, দেখলেই মনে হয় জমিটা ফরেস্টেরই, কেউ হয়ত চাষ আবাদ করছে। ঐ ফরেস্টের একটা অংশ ছিল এদেরই–গয়ানাথের বাবা পদ্মনাথ, পদ্মনাথের বাবা ভদ্রনাথের আমলে। ভদ্রনাথের আসল নাম ভাদই রায় তার আমল থেকেই এরা ভদ্র ও নাথ হয়েছে। পরে,বছর পঞ্চাশ আগে সেটেলমেন্টের সময় একটা দাগ নম্বরেই ফরেস্টের খাস জমিও ঢুকে যায়। এমন অবশ্য হওয়ার কথা নয়। হয়ও না। কিন্তু হয়ে যাওয়ার পর তার নিজ জমিটা যাতে ফরেস্টের জমির ভেতর ঢুকেই থাকে ও এক খতিয়ানেই থাকে সেটা ভদ্রনাথ রায়, পদ্মনাথ রায় ও গয়ানাথ রাগ তিনপুরুষ ধরে দেখে আসছে। তখনকার দিনে ত আর জমিজমার খবর হালুয়া-আধিয়াররা রাখত না। ফলে সবাই জানত ভাদই রায়ের জমিটাই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু সেখানে ভাদই রায়ের জমির টানা অংশটা ভাদই রায়েরই আছে। আর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকও কোনো সময় একটা চাষের জমিতে শালগাছ পুঁততে যায় নি। বা যাতে না পেতে সেটা ভদ্রনাথ, পদ্মনাথ, গয়ানাথ তিনপুরুষ ধরে দেখে আসছে। ফলে, ফরেস্টের অনেক-অনেকখানি জমিও গয়ানাথ নিজের জমি বলেই চাষ করে।
