কাদাখোয়া সেই চরের ওপর থেকে অশ্বিনী রায়ের চোখের ওপর তার দৃষ্টি ফিরিয়ে আনে। অশ্বিনী রায় গলাটা আর-একটু তুলে বলে, যা কেনে; গরুগিলাক খোয়া দে, সে আঙুল তুলে দেখায়ও কাদাখোয়াকে কোন দিকে যেতে হবে। সেই অঙ্গুলিনির্দেশিত পথে কাদাখোয়া চলে যায়।
বাঘারু যেখানে এসে উঠেছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। বাঁধের ওপরের ভিড়টা দুভাগ হয়ে গেছে–একটা ঢাল বেয়ে নীচে অফিসার, নরেশ আর অমূল্যর সঙ্গে, আর-একটা অশ্বিনী রায় কাদাখোয়র সঙ্গে। ফলে, বাঘারু একটু নির্জনেই পড়ে যায় বা দুটো ভিড়েরই পেছনে। ভিড়দুটোর বাইরেও কিছু লোক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। দু-একজন বাঘারুকে আপাদমস্তুক দেখেওছে। দু-একজন বাঘারুর গলার দড়িটাও দেখেছে। কিন্তু বাঘারুকে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করে না। বাঘারু যেমন দাঁড়িয়েছিল, তেমনি দাঁড়িয়ে থাকে। তার সামনে বাঁধের নীচে ও তার পাশে বধের ওপরে নানা কথাবার্তার মধ্যে বাঘারুর গলা থেকে নদীর ভেতরে ভাসমান গাছ পর্যন্ত হলুদ রঙের মোটা নাইলনের দড়ি বন্যার বাতাসে দোল খায়।
.
১৫১. বাঘারুর দ্বিতীয় সংলাপ
বাঁধের নীচে অফিসার নরেশকে বলে, আরে, ঐ লোকটার নাম-ঠিকানা ত নেয়া হল না, আমাকে ত রিপোর্ট করতে হবে।
নরেশ পেছনে ঘাড় ঘোরায়, তারপর নিজেই বাধ বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে বাঘারু ডাকতে। মাঝামাঝি উঠতেই দেখে বাঘারুকে একা-একা দাঁড়িয়ে আছে। আর না-উঠে বাঘারুকে নরেশ ডাকতে থাকে, হেই শুনিছেন, হে-ই শুইনছেন, আরে হে-ই
বাতাসের আওয়াজ, চারপাশে নানারকম কথবার্তা, এই সব কারণে বাঘারু নরেশের ডাক শুনতে পায় না। অথবা, তাকে যে ডাকা হতে পারে সেটা সে ভাবেই নি। অগত্যা, নরেশকেই আবার পা বাড়াতে হয়। পা বাড়িয়েও সে ডাকতে থাকে, হে-ই গাছুয়ামানষি, আরে এই গাছুয়ামানষি।
বাঘারু তখন বাঁধের ঢাল বেয়ে অফিসারের গাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল, যেমন সে নানাদিকেই অলস তাকাচ্ছিল। অফিসারের গাড়ি থেকে চোখ সরিয়ে আবার বাঁ দিকে চোখ সরাতে গেলে নরেশ তার নজরে পড়ে যায়। বাঘারু যদি সোজা তাকিয়ে, সোজাই বা দিকে ঘাড় ঘোরাত তা হলে নরেশকে দেখতে পেত না। কিন্তু অফিসারের গাড়িটার দিকে সে তাকিয়ে ছিল বলে তাকে মাটি থেকে কোনাকুনি চোখটা বায়ে বাঁধের ওপর তুলতে হচ্ছিল। তাই নরেশ তার চোখে পড়ে যায়।
নরেশ তখন হাত দিয়ে তাকে ডাকতে-ডাকতে চেঁচায়, আরে কানে শুনেন না নাকি? আসেন এইখানে, স্যার ডাইকতেছে।
নরেশের কথাটা বাঘারু শোনে কি না বোঝা যায় না, শুনে থাকলেও সেই কথার মানে বোঝার জন্যে তাকে আবার অফিসারের গাড়ির দিকে তাকাতে হয়। সেই গাড়ির কাছ থেকে সবাই তার দিকেই তাকিয়ে আছে। নরেশ আবার চেঁচায়, আরে, এই মানষি কালা নাকি। আরে, আসেন, স্যারে, ডাইকতেছে।
এবার বাঘারু বোঝে। সে ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করে। সে দু-এক পা নামার পর নরেশ পেছন ফেরে। নরেশ দু-এক পা নেমে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নেয় বাঘারু নামছে কিনা।
বাঘারু গিয়ে অফিসারের সামনে দাঁড়ায় না। বাঁধের ঢালটার পরে যেখানে জিপের সামনে ভিড় শেষ হয়েছে সে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। ততক্ষণে নরেশ অফিসারের সামনে পৌঁছে গেছে। সে পেছন ফিরে দেখে, তার পেছনের লোকজনের ওপরে বাঘারুর মাথা।
আরে এইখানে আসেন না। স্যার, আইসছে, নরেশ হাত দিয়ে তার পেছনে দাঁড়ানো লোকজনকে দুদিকে সরিয়ে দেয়, বাঘারুর আসার জন্যে পথ করে দিতে। কিন্তু পথ হওয়া সত্ত্বেও বাঘারু এগয় না–যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে।
অফিসার জিপের ভেতর বসেছিল। সেখান থেকে গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে, এখানে আসুন, আপনার নামটা কী? জিজ্ঞাসার জন্যে অফিসার হাত দিয়ে নরেশকে সরিয়ে দেয়। এখন জিপের ভেতর অফিসার আর মাটিতে বাঘারু সোজাসুজি, কিন্তু দুজনের মাঝখানে হাত পাঁচ-ছয় তফাত।
বাঘারু কোনো জবাব দেয় না। ইতিমধ্যে অফিসার বুকপকেট থেকে ডটপেন ও একটুকরো কাগজ বের করে ডান উরুর ওপর রেখেছে। শুনে, লিখবে বলে অফিসার মাথা নিচু করেছে, কিন্তু শোনার সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর তাকে আবার চোখ তুলতে হয়! চোখ তুলে বাঘারুকে দেখে নিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করে, আপনার নাম কী? তারপর নরেশকে বলে, দড়িটা কিসের?
বাঘারুর গলা থেকে সেই হলুদ দড়িটা বাঁধের ঢাল বেয়ে উঠে আড়ালে চলে গেছে। এখানে বাঁধের ঢালের জন্যে বাতাসে আর সে-দড়ি দুলছে না।
নরেশ বলে, ও স্যার, ওর গাছবান্ধা দড়ি।
গলার সঙ্গে বাঁধা?
নরেশ হেসে ওঠে, গাছগুলো বাইন্ধ্যা গলায় ঝুল্যায়া রাইখছে।
অফিসার নরেশকে বলে, নামঠিকানাটা জিজ্ঞাসা করুন ত।
নরেশ বাঘারুর কাছে গিয়ে বলে, আরে, আপনারে না স্যার ডাইকতেছে, এহানে খাড়ায়্যা আছেন ক্যান? আপনার নামঠিকানা কন, স্যারে জিগায়। স্যারের লিখবার লাগব। আপনার নামঠিকানা কী?
মোর নামঠিকানা নাই রো। মোর দেউনিয়া। গয়ানাথ জোতদার বাঘারু এতক্ষণে বলতে পারে।
শুনে নরেশ হেসে উঠে মুখে হাত চাপা দেয়। অফিসার জিজ্ঞাসা করে, কী, হল কী?
স্যার, কয় যে এই মানিষডার কুনো নাম নাই। গয়ানাথ জোতদারের নাম লিখবার কয়।
অন্যান্য লোকজনের চাপা হাসিটা শেষ হওয়ার পর অফিসার বলে ওঠে, আচ্ছা, গয়ানাথ জোতদারের ঠিকানাটা জিজ্ঞাসা করুন না। তা হলেই ত ওর ঠিকানা জানা যাবে, কেয়ার অব গয়ানাথ জোতদার। অফিসার কাগজের ওপর মাথা নোয়ায়।
