নরেশ আবার মাথা চুলকে বলে, হ্যাঁ স্যার, আপনার কষ্ট হইল কত!!
বাঁধে উঠবার জন্যে ঘুরতে-ঘুরতে অফিসার বলে, আরে, আমার ত এইই কাজ, এতে আবার কষ্ট কী? এই কথাটা শেষ করার জন্যে অফিসারকে হাত দিয়ে নরেশের কাঁধ ছুঁতে হয়। কিন্তু নরেশ এতটাই লম্বা যে-তার কাধ ধরতে হলে অফিসারের হাতটা টানটান করতে হয়। তাই, অফিসার তার পিঠের ওপর হাতটা রেখে নামিয়ে নেয়। সেই সুযোগে নরেশ ঘাড়টা নামিয়ে অফিসারকে বলে, স্যার, আমাগো পেমেন্টটা?
হ্যাঁ, চল, এখনই পিচশ দিয়ে দিচ্ছি। আর কাল আমার অফিসে এসো
স্যার, আপনার অফিস ত চিনি না, নরেশ সোজা হয়ে, অপরাধীর ভঙ্গি করে।
দীপ্তি টকিজ চেনো ত?
হ্যাঁ, স্যার।
আর-একটু সোজা গেলেই ফায়ার ব্রিগেড
চিনি সার, পেছন থেকে অমূল্য বলে।
তার পাশেই, এবার অফিসার হাঁটতে শুরু করে। কিন্তু নরেশ আবার বলে ওঠে, স্যার, আপনারে জিপ পর্যন্ত আগাইয়া দেই, ঐখানেই পেমেন্ট দিবেন।
জিপ ত ঠিক বাঁধের ঐ পাড়ে এনে রেখেছি। ঠিক আছে চলো অফিসার বাধে উঠতে শুরু করেন, পেছনে-পেছনে অমূল্য আর নরেশ। তার পেছনে ভিড়ের লোকজন। বাঁধের ওপর থেকে যারা নেমেছিল তারাও এদের সঙ্গে মিশে যায়। কাদাখোয়া আর বাঘারু বোঝে না–তাদের কী করতে হবে। কিন্তু তাদের যখন গাছ থেকে নামতে বলা হয়েছে তখন তাদেরও নিশ্চয় বাঁধের ওপরই উঠতে হবে–এ-রকম একটা সহজ ধারণা থেকে তারাও এই ভিড়ের সঙ্গে বাঁধের ওপর উঠতে শুরু করে। বাচ্চারা ততক্ষণে কাদাখোয়া আর বাঘারুর ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে, তারা ওদের দুজনকে ধাক্কা দিয়ে-দিয়েই এগিয়ে যায়। বাঘারু আর কাদাখোয়া পেছনে পড়ে যায়। তারা ভিড়ের পেছনেই বাঁধের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে।
একটু ওঠার পরই বাঘারুর গলা থেকে সেই হলদে দড়ি, গাছ পর্যন্ত, দুলতে থাকে। যারা এতক্ষণ দড়ি ধরে টেনে এনেছিল, তারা ত দড়িটাকে বোল্ডারের ওপর ফেলে রেখে বাঁধের ওপর নীচে ভিড়ের। নানা অংশে মিশে যায়। এখন বাঘারু যত উঁচুতে উঠছে, দড়িটাও তার সঙ্গে মাটি ছেড়ে ততটা উঠছে। আর, শেষে বাঁধের মাথা থেকে নদী পর্যন্ত ঝুলে থেকে দোলে।
বাঁধের ওপর উঠে কাদাখোয়া আর বাঘারু আবার দাঁড়িয়ে পড়ে। অফিসারকে নিয়ে ভিড়টা ঢাল বেয়ে বাঁধের বিপরীত দিকে নেমে যাচ্ছে। তারাও সেই ঢাল বেয়ে নামবে কিনা বুঝতে পারে না। কারণ, বেশির ভাগ লোকই আর নামছে না, তারা বাকি ভিড়টার নামা দেখছে। কাদাখোয়া আর বাঘারুকে সেই ভিড়টাতে আটকা পড়ে যেতে হয়। তারা একবার অফিসারের চালের দিকে, আর একবার নদীর ঢালের দিকে এলোমেলো তাকায়। এমন সময় অশ্বিনী রায় ভিড়ের মধ্যে এসে ডাকে, হে-এ কাদাখোয়া। কাদাখোয়া অশ্বিনী রায়ের ডাক শুনে সেদিকে এগিয়ে যায়।
অশ্বিনী রায় তাকে জিজ্ঞাসা করে, কী দেখি আসিছু রে? ঘরবাড়িখান ঠিকো আছে, না নাই?
কাদাখোয়া প্রশ্নটার মানে না বুঝে বলে, ঐঠে ত জল।
জল ত, ঐ মানষিখান গুয়াগাছের মাথাত কী কইরবার ধইচছিল?
অশ্বিনী রায়ের প্রশ্ন শুনে ভিড়ের অনেকের মনে পড়ে ঐ লোকটি সুপুরি গাছে চড়ে আর নামে নি কেন সেট দেখার জন্যেই এখান থেকে নৌকো ভাসানো হয়েছিল। হঠাৎ কাদাখোয়া আর অশ্বিনী রায়কে ঘিরে ভিড়টা জমে ওঠে। তাদের ভেতর থেকে একজন জিজ্ঞাসাও করে, কী দেখিলুরে কাদাখোয়া, ক কেনে।
কিছু দেখি নাই রো—
কী দেখলু নাই? ঐঠে যে এই মানষিডা আছিল, দেখলু নাই?
হয়। মানষিডা আছিল।
কোটত আছিল?
ঐঠে আছি, জলের ভিতর আছিল।
জলের ভিতরত ভাসি আছিল? না খাড়া আছিল?
বসি আছিল। বসি আছিল।
ঐটাক ছাড়ি দাও কেনে। নরেশুয়াখান আসুক কেনে, তার বাদে সবখান শুনা যাবে।
লোকজনের এই সব কথা থামতেই অশ্বিনী রায় একটু যেন ব্লেগেই জিজ্ঞাসা করে, এই মানষিডার গুয়াগাছে উঠিবার কামখান কী আছি?
অশ্বিনী রায়ের এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে কাদাখোয়া একবার শূন্যে তাকায়–যেন সেই শূন্যে অশ্বিনী রায়ের চাল, আর একবার মাটির দিকে তাকায়, যেন ঐ মাটিতে ফ্লাডের জল আর তাতে গাছগুলোর সঙ্গে বাঘারু ভাসছে। কিন্তু এই কথাটা বলার ভাষা না পেয়ে সে তার ডান হাতটা আকাশে তুলে ধরে বলে, ঐঠে ত চাল, আর এইঠে ত জল!
উঠিসেন ত উঠিসেন। স্যালায় আবার গুয়াগাছখানত উঠিবার কামটা কী?
অশ্বিনী রায় তার রাগ বজায় রাখার চেষ্টা করে। নরেশ তার কথার জবাব দেবে না, বা তার সব প্রশ্ন সে সাহসে ভর দিয়ে নরেশ বা অমূল্যকে করতে পারবে না। তাই তারা আসার আগেই সে তার ব্যক্তিগত কথাগুলো তার ব্যক্তিগত মানষিডার কাছ থেকে জেনে নিতে চায়। কিন্তু কাদাখোয়া জানাতে পারে না। সে আবার আকাশের দিকে তাকায়, যেন এখানে অশ্বিনী রায়ের চাল। সে আবার মাটির দিকে তাকায়, যেন ওখানে ফ্লাডে বাঘারু ভাসছে। আর, তারপর ডান হাতটা আকাশে তুলে সে শুধু আবারও বলতে পারে-ঐ ঠে ত চাল আর এইঠে ত জল।
গুয়াগিলা আছে কি নাই? অশ্বিনী রায় কাদাখোয়র কাছে তার সুপুরি গাছগুলোর ফলের হিশাব চায়। কাদাখোয়া অশ্বিনী রায়ের প্রশ্ন শুনে সকলের মাথার ওপর দিয়ে বাতাস আর বৃষ্টি ভেদ করে সেই চরের দিকে তাকিয়ে দেখে নিতে চায় সপুরি গাছের সুপুরিগুলো আছে কি নেই।
অশ্বিনী রায় যতটা পারে গলা তুলে বলে, দেখিবার মনত খায় নাই?
