কতটুকু আর দূরত্ব? দেখতে-দেখতে এরা সবাই বাঁধের এই অস্থায়ী ক্যাম্পের জায়গাটায় পৌঁছে যায়। পৌঁছনোর আগেই সবাই দেখতে পায়–সেই নতুন লোকটির গলায় নাইলনের দড়ির বড় বান্ডিল–আর সেই দড়িটাই পাড়ের লোকজনের হাতে। তারা ঐ দড়ি ধরেই গাছ আর নৌকো টানতে টানতে নিয়ে আসছে।
বহরটা এসে দাঁড়ায় সেখানে, যেখানে সবাই প্রথমে ভিড় করেছিল। নদীর ভেতরে নৌকোয়, পাড়ের একটু নীচে, নরেশ আর অমূল্য, আর পাড় থেকে অনেক ওপরে, নদীরও অনেক ওপরে কাদাখোয়া আর সেই নতুন লোকটি।
পাইছে, পইছে, গুয়াবাড়ির মানষিটাকে পাইছে।
সেই ফরেস্টঠে সারা রাতি ভাসি আসিছে।
সারা রাতি গাছের উপর ভাসি-ভাসি আসিছে।
ভাইস্যা আসত্যাছিল, গাছগিলা পায়্যা ধইরছে।
এত বড় দড়ি পাইল কোথ থিক্যা? জলে ভাইসব্যার আগে কি গলায় দড়ি দিছিল নাকি?
এ-সব নানা প্রশ্নোত্তরের মধ্যে নরেশ আর অমূল্য পাড়ে উঠে আসে। কাদাখোয়া আর বাঘারু নামে না–তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, তারা এখন নামবে কি না। নরেশ পাড়ে নেমেই জিজ্ঞাসা করে, কই, স্যার কই?
নরেশের কথার প্রতিধ্বনিতে আরো দু-চারজন জিজ্ঞাসা করে, কই, অফিসার কই?
আর, এর মধ্যেই কেউ নরেশকে বলে দেয়, অফিসার বাঁধের ওপরেই আছে। নরেশ বাঁধের ওপর উঠতে থাকে। তার পেছনে-পেছনে আরো অনেকে উঠলেও, সামনে কেউ থাকে না। সেই ঢাল বেয়ে নরেশের উঠে আসার জন্যেই যেন ঢালটা ফাঁকা। সেই ফাঁকার শেষ বাঁধের ওপরে অফিসার এসে দাঁড়ায়। বাঁধের ওপরে পৌঁছনোর আগে হঠাৎ পেছন ফিরে নরেশ হাত নেড়ে চিৎকার করে ওঠে, এই, দড়িখান বাইন্ধ্যা রাখ কোথাও, ছাইড়া দিস না, ভাইস্যা যাবে নে তালি। চিৎকারটা শেষ করে বাধে পা দিয়েই নরেশ দেখে সামনে অফিসার। এক পা পেছনে গিয়ে, বা হাতটা তার কোকড়ানো চুলের পেছনে দিয়ে, নরেশ তার শাদা দাঁতগুলো বের করে হাসে, তারপর, আইনছি স্যার, ঐ যে, বা হাতটা নামায় বাঘারুকে দেখাতে, চলেন স্যার, বা হাতটা নামিয়ে অফিসারকে পথ দেখায়। সেই পথ দেখানোর জন্যেই, নরেশের পেছনে যারা ছিল তারা, দুদিকে সরে যায়। মাঝখানে একটা পথের মত হয়ে যায়।
নরেশ ঐভাবে হাত দেখানোর জন্যেই হোক, অথবা নরেশের পেছনের লোকগুলো দুদিকে সরে গিয়ে পথ করে দেয়ার জন্যেই হোক, অফিসার নরেশের পিঠে সস্নেহ হাত রাখে। তারপর নরেশের দেখানো পথে বোল্ডারের ঢালে নামার জন্যে পা বাড়িয়ে একবার দুদিকে তাকায়, হাসিমুখে, যেন এই সময় ওখানে টিভি ক্যামেরা, অন্তত প্রেসের ফটোগ্রাফারদের থাকার কথা ছিল। না-থাকলেও, তারা আছে এমন এক বিশ্বাসে অফিসার ধীরে-ধীরে ঢালটা বেয়ে বোল্ডারের পাড়ে নামে। সামনে নদী। বোল্ডারের পাড় পেরিয়ে নদীর ধারে গাছগুলো আর নৌকোর সামনে গিয়ে অফিসারকে দাঁড়াতে হয়। যেন এই ঢাল আর বাঁধ ধরে এতক্ষণ সে বারবার ওঠানামা করছিল না, যেন এইমাত্রই সে গাড়ি থেকে নেমে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী নদীর পাড়ে এসে দাঁড়াল।
অফিসার আর নরেশ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, তাদের পেছনে ভিড়। সামনে, প্রায় মাথার ওপরে কাদাখোয়া আর বাঘারু। তারা বোঝে না তাদের কী করতে হবে। নরেশ চেঁচিয়ে ওঠে, আরে, নাইমা আসেন, দ্যাহেন না স্যারে আইছে।
শুনে, বাঘারু মাচানের ওপর থেকে তার কুড়ালিয়াটা নিয়ে পেছনে নেংটির ওপরে গেজে। কাদাখোয়া লগিটা নিয়ে নীচের ডালে পা দেয়, তারপর বাঘারু একটু নিচু হয়ে কাদাখোয়াকে ডাল থেকে পাড়ে উঠতে সাহায্য করে ও নিজে মাচান থেকে নীচের ডাল, ডাল থেকে পাড়ে উঠতে সাহায্য নেয়। বাঘারুকে টেনে নেয়ার জন্যে পাড়ে নেমে কাদাখোয়াকে অফিসারের দিকে পেছন ফিরতে হয়, তারপর বাঘারু নামলে দুজনে এক সঙ্গে অফিসারের সামনে দাঁড়ায়। বাঘারুর গলায় হলুদ দড়ি দোলে। অফিসার ঠিক বুঝে উঠতে পারে না তাকে কী করতে হবে। নরেশ ওদের দেখিয়ে বলে, স্যার, ভাইস্যা আইসছে সেই ফরেস্ট থিক্যা–গাছগাছালি নিয়্যা।
এরপর যেন অফিসারের একটা কাজ করাই বাকি থাকে। সে বাঘারুর হাতটা ধরে।
অফিসার হ্যান্ডশেকের ভঙ্গিতেই হাতটা এগিয়েছিল। কিন্তু বাঘারু হাতটা না বাড়ানোয় সে বাঘারুর শরীরের পাশে ঝুলে থাকা হাতের কব্জিটা ধরে ঝাঁকায়। তারপর ছেড়ে দেয়। এবার কাদাখোয়র দিকে আর হাত বাড়ায় না–একবারেই কব্জিটা ধরে ঝাঁকায় ও ছেড়ে দেয়। অফিসার হয়ত ভেবেছে এই দুজনই ভেসে এসেছে–দুজন এমনই একরকম দেখতে। অথবা, দুজন এমনই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যে তাদের সঙ্গে একই ব্যবহার করা ছাড়া অফিসারের আর-কোনো গতি নেই। কিন্তু কাদাখোয়াকে ত বাঁধের বানভাসিরা সবাই চেনে। অফিসার তার হাত নেড়ে দেয়ায় সবাই মজা পেয়ে হাততালি দিয়ে ওঠে। অফিসার সেই হাততালির দিকে তাকিয়ে হেসে মাথা নাড়ায়।
.
১৫০. সংবর্ধনার পরে বাঘারু ও কাদাখোয়া
বাঘারু আর কাদাখোয়া বোঝে না তাদের এখন কী করতে হবে–নরেশ বা অফিসারও বোঝে না। সবাই হাততালি দিয়ে ওঠায় নরেশ সেদিকে তাকিয়ে হাসে। এর মধ্যে অমূল্য এসে নরেশের পাশে পঁড়ায়। অফিসার আবার হাসিহাসি মুখে কাদাখোয়া আর বাঘারুর দিকে, তাদের পেছনে নদীর দিকে, বায়ে নরেশ-অমূল্যর দিকে, ও এমন-কি, ঘাড় ঘুরিয়ে বাঁধের দিকে তাকিয়ে নেয়। বাঁধের ওপর যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা নীচে হাততালি শুনে ঢাল বেয়ে নীচে নামতে শুরু করে। অফিসার নরেশের দিকে তাকিয়ে এতক্ষণে বলে, তা হলে ত তোমাদের রেসকিউ হল। এবার তা হলে আমার ছুটি, কী বলো?
