কিছু লোক বাধ বেয়ে উঠেছে আর কিছু লোক বাঁধের ওপর গিয়ে দাঁড়িয়েছে বলে পাড়ের বোল্ডারের ওপরের ভিড়টা আলগা হয়ে যায়। অফিসার বাঁধের ওপর উঠতে-উঠতে বলে, মশাই, মনে হচ্ছে ফ্লাড এক আপনাদের এখানেই হয়েছে। এক জায়গায় এসে যদি এতক্ষণ আটকে থাকতে হয় তা হলে অন্য জায়গায় যাব কখন?
রঘু ঘোষের পেছন-পেছন উঠতে-উঠতে লিলি বলে, চলোনা, ঐ দিকে যাই–দেখি কী হল?
রঘু ঘোষ পেছন না-ফিরেই বলে, আর ওখানে যেতে হবে না। এতক্ষণ এই বৃষ্টি আর বাতাসে আছো, সারা রাত ত বসে বসে খাস টানবে। এখন বাগানে চলো। অনেক দেখা হয়েছে।
গুদামবাবু বধের ওপর আগেই উঠে গিয়েছিলেন। উনি বলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ। চলুন। এ-সব হাঙ্গামায় আর জড়িয়ে লাভ নেই।
রঘু ঘোষ বলে, হাঙ্গামা আবার কী?
গুদামবাবু–বাঃ, একটু আগে ত আপনাকেই দোষ দিচ্ছিল। এরপর দেখুন, ঐ গাছ না কী তাই নিয়ে আবার কী গোলমাল হয়?
অফিসার এদের কাছেই ছিল, বলে, আরে মশাই, এদের ত রেসকিউয়ের নামে একটার পর একটা গোলমাল বেড়েই চলেছে। নৌকোটা গেল কোথায়?
এরকম সময় সেই গাছগুলো একটু ঘুরে যায়, আর তাতেই ডালপালার ফাঁক দিয়ে বাঁধের এই জায়গাটা থেকে দেখা যায়–গাছের ওপরে কাদাখোয়া দাঁড়িয়ে আছে। একবারমাত্র দেখা যায় কিন্তু যারা দেখে তারা চিনে ফেলতে পারে–কাদাখোয়া, কাদাখোয়া, গাছগিলার মাথা কাদাখোয়া। গাছগিলার মাথাত কাদাখোয়া। ঐ দিকে গাছগুলো পাড়ের কাছাকাছি চলে এসেছে। যারা ওদিকে দৌড়ে গেছে, তারা নিশ্চয়ই আরো স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাচ্ছে। এখানকার লোজন বাঁধের ওপর দিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। এর মধ্যে গাছগুলো আরো ঘোরে। দেখা যায়, সত্যি কাদাখোয় দাঁড়িয়ে আছে। গাছগুলো আরো ঘোরে। দেখা যায়, কাদাখোয়র পাশে আর-একজন, কাদাখোয়ার মতই, দাঁড়িয়ে। কিন্তু নরেশ-অমূল্য নেই। সবাই গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে–কোনো ফাঁক দিয়ে নরেশ-অমূল্যকে যদি দেখা যায়। নরেশ-অমূল্য চরে যদি আটকে গিয়ে থাকে? কোনো বিপদ ঘটেছে নাকি? একা কাদাখোয়া ফিরে আসছে? সঙ্গে একটা লোক আছে, সে নিশ্চয়ই সকালের সেই লোকটাই? নাকি, নরেশ-অমূল্য পরে নৌকো নিয়ে আসবে? এ স্রোতে দুজনে একটা নৌকো চালাবে কী করে?
গাছগুলো পাড়ের আরো কাছাকাছি চলে এসেছেকাদাখোয়া আর ঐ লোকটাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এইবার গাছগুলো এই বাঁধের তাড়ালে চলে যাবে। ওখানে বাঁধের একটা বাক আছে, ডাইনে। গাছগুলো সেই বাকটার আড়ালে চলে যাবে। এখান থেকে কী করে জানা যাবে–গাছগুলো ওখানেই থাকবে, নাকি টানতে-টানতে এখানে নিয়ে আসা হবে।
বাঁধের ওপর যারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল তারা আরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়। কেউ-কেউ বাধ ধরে দক্ষিণের সেই বাকটার দিকে হাঁটা শুরু করে। বানভাসি যে-মেয়েরা এতক্ষণ বাঁধের ঢালের নানা জায়গায় দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল, তারা এখন বাঁধের ওপর উঠে এসে গরুগুলোর পাশে, দাঁড়িয়ে বা একটু এগিয়ে কপালে হাত দিয়ে বাঁধ বরাবর তাকায়। এখন রোদ নেই। হাওয়া ও বৃষ্টি অব্যাহত। কিন্তু দূরে তাকাবার জন্যে মেয়েদের ভঙ্গি ঐ একটাই। গরুগুলোও এতক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়েছিল। তারাও শরীর না ঘুরিয়ে শুধু ঘাড়টা ডান দিকে ফেরায়। ব্যবধান রেখে মাঝে-মাঝে এক-একটা গরু হা-স্বা ডেকে ওঠে, গম্ভীর, প্রলম্বিত হাম্বা। তারই মধ্যে, বাতাসে ঐ বাকের আড়াল থেকে মানুষের সমবেত চিৎকার শোনা যায়। এখানকার সবাই কান পেতে বুঝতে চায়, চিৎকারের ভেতর বিপদের কোনো সঙ্কেত আছে কিনা।
.
১৪৯. বাঘারু ও কাদাখোয়ার সংবর্ধনা
চিৎকারটা উঠে নেমে যায় বটে, কিন্তু থামে না। বাতাসটা ওদিক থেকে এদিকে আসছিল বলে ওখানকার চেঁচামেচি এখানে শোনা যাচ্ছিল। বোঝা যায়, খারাপ কিছু ঘটে নি। মাঝে-মাঝেই চিৎকারটা আবার বাড়ছিল।
তারপরই দু-একটি বাচ্চা ওদিক থেকে বাঁধ দিয়ে দৌড়তে-দৌড়তে এদিকে আসে। আর, তাদের সেই দৌড়ের সঙ্গে ছন্দ রেখেই ওদিককার চিৎকারটাও এগতে থাকে–বাধ ধরে নয়, বাঁধের একটু নীচ দিয়ে, নদীর পাশ দিয়ে, বোল্ডারগুলোর ওপর দিয়ে। বাঁধের এখানে যারা দাঁড়িয়েছিল, তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না কোন দিকে তাকিয়ে থাকবে–এখান থেকে নদীর দিকে কোনাকুনি, নাকি বাঁধের ওপর দিয়ে সোজাসুজি। যে বাচ্চাগুলো দৌড়ে আসছিল তারা পেছনে ফিরে কিছু দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে, তারপর আবার দৌড়তে শুরু করে।
তখনই দেখা যায়–সেই গাছগুলো বাকটা পেরিয়ে এদিকে আসছে, মানে পাড় দিয়ে গাছগুলোকে টেনে আনা হচ্ছে। গাছগুলো আর-একটু এগতেই দেখা যায়–গাছগুলোর সামনে নৌকোটা আর তাতে নরেশ আর অমূল্য দাঁড়িয়ে। পাড়টা উঁচু বলে নৌকোটা এতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। নরেশ আর অমূল্য যে দাঁত বের করে হাসছে, সেটাও এখান থেকে দেখা যাচ্ছে।
নরেশ আর অমূল্যর মাথার ওপরে, গাছের ডালের মধ্যে কাদাখোয়া আর সেই লোকটি দাঁড়িয়ে। দুজনেরই কোমরে হাত। একটা সোনালি দড়ি সেই গাছের ডালের মাথায় কাদাখোয়া আর লোকটির ভেতর থেকে পাড় পর্যন্ত ঝুলছে আর সেই দড়ি ধরে নৌকো আর গাছগুলোকে সবাই টানতে-টানতে নিয়ে আসছে। নৌকোর ওপর অমূল্য আর তার মাথার ওপরে ডালের মধ্যে কাদাখোয়া লগি দিয়ে দিয়ে পাড়ে মারছে–যাতে গাছগুলো পাড়ে ঠেকে না যায়। তাতেও পুরোটা সামলানো যাচ্ছে না, কারণ, গাছের পেছনের ডালপালা পাড়ে লেগে যাচ্ছে। এতজন দড়িটা ধরে টানছে যে–গাছগুলো আবার পাড় থেকে সরে যাচ্ছে। যারা টানছিল তারা কেউ-কেউ বোল্ডারের ওপর, কেউ-কেউ বোল্ডার আর নদীর মাঝখানের সংকীর্ণ পথটা দিয়ে আগে-আগে আসছে। তারা দড়ি টানছে না, যেন, গাছগুলো আর নৌকোটাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসছে।
