লগি মারেন, লগি মারেন, আঁকতে-হাঁকতে কাদাখোয়া তার লগিটা নিয়ে বাঘারুর গত রাত্রির অন্ধকারে হাতড়ে-হাতড়ে পাওয়া অভিজ্ঞতা আত্মসাৎ করে বেড়ালের মত পায়ে বাঘারুর মাচানে গিয়ে ওঠে আর সেইখান থেকে শুধু তার বায়ে লগি মারতে থাকে, এবার আর আগের মত বর্শা দিয়ে জল বিধবার মত করে নয়, লগিটা মেরে ঠেলছিলও একটু। বারকয়েক লগি মেরেই কাদাখোয়া চেঁচায়, এই গাছুয়ামানষিখান, উঠি আসেন, এইঠে, উঠি আসেন। বাঘারু নৌকো থেকে ডালে-ডালে তার মাচানে চলে যায়। এইঠে লগি মারেন, লগি মারেন, বলে কাদাখোয়া তার লগিটা বাঘারুর হাতে ধরিয়ে দেয়। বাঘারু লগি মারতে থাকে, কাদাখোয়া দাঁড়িয়ে সামনে তাকায়। যেন–গয়ানাথের এক বাঘারু এখন দুটো মানুষ হয়ে গেছে, তিস্তার ওপরে ঐ গাছের মাচানে তাদের এতই মিল।
আসলে, যে-হিশেব কষে কাদাখোয়া হঠাৎ নৌকোটাকে গাছগুলোর মধ্যে সেঁদিয়ে দিয়েছিল সেটা অদ্ভুত মিলে গেল। এতগুলো গাছ এমন জড়ো করে বাধা যে জলস্রোত গাছের ভেতরে পুরো জোরে লাগে না। সেই গাছগুলোর ঢাকনায় নৌকোতে নরেশ আর অমূল্য লগি মারার এমন সুযোগ পায় যাতে স্রোতের ভেতরেও এই বহর স্রোতটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ক্রমাগত বায়ে লগি মারায় ওরা খুব বেশিদূর ভেসে না গিয়েই কোনাকুনি বাঁধের দিকে যেতে থাকে। ইস্, আর-একখান লগি থাকিলে সিধা পার হওয়া ধরিতাম হে, কাদাখোয়া তিস্তার ঘোলা স্রোতের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে।
.
১৪৮. সন্দেহ ও সংশয়
বাঁধের ওপর থেকে দেখা যায়, অশ্বিনী রায়ের চাল থেকে অমূল্য, নরেশ আর কাদাখোয়া সুপুরি গাছে চড়ার একটু পরে সেই গুয়াবাড়ির দক্ষিণ দিয়ে নৌকোর বদলে একটা বিরাট গাছের বহর নদী দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। নৌকোটা গাছগুলোর এত ভেতরে যে বাধ থেকে দেখা যায় না। এমন-কি, কাদাখোয়া আর বাঘারু যে মাচানের ওপর দাঁড়িয়ে, সেটাও গাছের ডালপালায় আড়াল হয়ে থাকে। বন্যার সময় তিস্তা দিয়ে এরকম গাছ ত ভেসে যেতে পারেই, কিন্তু ওরা চাল থেকে সুপুরি গাছে উঠল আর তারপরই ঐ ফাঁক থেকে নৌকোর বদলে বেরল গাছের এই প্রকাণ্ড বহর–তাতেই সবার নজরে পড়ে যায়। তাও নজরে পড়ত না যদি গাছগুলো অশ্বিনী রায়ের গুয়াবাড়ির ফাঁকটা দিয়ে সোজা চলে যেত। কিন্তু সোজা বেরিয়েও গাছগুলো ঐ স্রোতটা থেকে আড়াআড়ি কোনাকুনি বয়ে আসে। কয়েকদিন ধরে এই খাতটাকে জলে ভরে উঠতে দেখে-দেখে স্রোতের ধারাটা এদের প্রায় সবারই চেনা হয়ে গেছে। তারা বোঝে, ঐ গাছ শুধু গাছ হতে পারে না, যদি হত তা হলে নদীস্রোতে সেটা অন্য রকম ভাসত। গাছগুলো বেরবার পরও বাঁধের লোকজন অপেক্ষা করে-নৌকোটা কখন বেরয়। কিন্তু প্রতীক্ষিত, সময়ের মধ্যে নৌকোটাও বেরয় না, গাছগুলোও সোজা না গিয়ে একটু কোনাকুনি হয়ে যায় তখন তারা এই দুইয়ের ভেতর যেন একটা সম্পর্ক থাকতে পারে বলে সন্দেহ করে। প্রথম কথাটা অশ্বিনী রায়ই বলে ওঠে, খাইসেন, খাইসেন, হামার কাঁঠাল আর লিচু গাছখান কায় কাটি দিসে হে, কায় কাটি দিসে।
কথাটা শোনার পরও সবাই একটু চুপ করে থাকে। এটা কি ঠিক হওয়া সম্ভব?
নরেশ-অমূল্য নৌকোর ওপর আছে। এই সময় যদি কেউ ঐ গাছ কেটে নিয়ে যায়, তা হলে তারা কি বাধা দিত না? এরকম অবিশ্যি এমন কাছাকাছি চরে হতেও পারে। বন্যার সুযোগে কেউ-কেউ নৌকো করে এসে গাছটাছ কেটে নিয়ে যায়। কিন্তু এই চরে তা করতে হলে এই বাধ থেকেই যেতে হবে। নাকি, যে-লোকটাকে সকালে দেখা গিয়েছিল সেই লোকটাই এই সব গাছ কেটে ভাসিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে অপেক্ষা করছিল+অমূল্য আর নরেশ গিয়ে তাকে ধরেছে? কিন্তু তাই যদি হয়, তা হলে গাছগুলোকে কি এমন ভাসিয়ে দেবে? তা যদি হয়, তাহলে ত নৌকোটা পেছনে-পেছনে বেরবে!
কেউ একজন বলে ওঠে, অশ্বিনী কাহার কাঠল আর লিচু গাছ কি ফ্লাডের জল খাইয়্যা শালগাছের নাগান বাইড়া গিছে? দ্যাহেন না, গাছ না, য্যান একখান ফরেস্ট!
এত দূর থেকেও চোখের আন্দাজে বোঝা যায় এ গাছগুলো অশ্বিনী রায়ের বাড়ির গাছ নয়। সেকথাটা একজন বলে দেয়ার পর সকলেরই মনে হতে থাকে। জগদীশ বারুই গাছের আভাস পায়, কিন্তু পরিস্থিতিটা বুঝতে পারে না। সে নদীর দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে চিৎকার করে বলে, আরে, গেল তিনজন মানুষ একখান নৌকায় আর তরা কত্যাছিস গাছের কথা? গাছের কথাডা আইল কোথ থিক্যা, অ্যাঁ? গাছের কথাডা আইল, কোথ থিক্যা?
জগদীশ বারুই চীৎকার করে বললেও, তার কথার কোনো জবাব কেউ দেয় না। বরং চাপা গলায় কেউ বলে ওঠে, হ্যাঁ, পাড়ের দিকেই ত আসে, হ্যাঁ, পাড়ের দিকেই আসত্যাছে।
সেই চাপা স্বরে বিস্ময়টা আরো পরিষ্কার হয়। তারপরই এই ভিড়টা থেকে অনেকে বাধ ধরে ওপরে উঠে যায়, প্রায় দৌড়ে বাঁধের ওপর উঠে তারা বাধ ধরে দৌড়তে থাকে দক্ষিণে। নৌকোটা চর থেকে যখন ফিরবে, তখন আরো ভাটিতে গিয়েই লাগবে, তারপর পাড় ধরে ধরে এখানে ফিরে আসবে–এটা সবারই জানা। কিন্তু নৌকোর বদলে এত বড়-বড় গাছ একসঙ্গে স্রোতে ভেসে বেরিয়ে এল, আর স্রোত কাটিয়ে একটু আড়াআড়িই পার হল–এটা তাদের হিশেবের বাইরে। তাই বাঁধের ভিড়টা ভেঙে যায়। অনেকেই বাঁধের ওপর দিয়ে ছুটতে শুরু করে, যেখানে গাছগুলো এসে ভিড়বে সেখানে গিয়ে দাঁড়ানোর জন্যে। বাঁধের ভিড়টা ভেঙে যায়, দৌড়োদৌড়ি শুরু হয়, এই সব মিলিয়ে যেন একটা রহস্যের আভাস আসে। সকালে লোকটা চালের ওপর থেকে উধাও, বিকেলে তিন-তিনটে মানুষ নৌকোসুদু উধাও, তার বদলে এতগুলো গাছের স্রোত বেয়ে আসা– সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বেশ জটিল হয়ে পড়ে।
