ভোখ পাইছে, কিন্তু ঐঠে ত অফিসার আছে।
আরে, শুনেন, আমরা এই চরের মানষি। এই চরে আমাদের খেতি-ঘর সব অমূল্য বলে।
চরুয়া?
হয়, হয়, চরুয়া। এই যে-চালডার উপর খাড়ায়া আছেন–এইডার যে-মালিক স্যায় ঐ বাধে আছে। আমার বাড়িখান ঐ দিকে। এর বাড়িখান ঐ দিকে। ফ্লাডের জইন্যে আমরা সব গিয়্যা ঐখানে বাঁধে উঠছি। আমরা কব, আপনি আমাগ মানষি, চরে আটকা পড়ছিলেন, আমরা তুইল্যা আনল্যাম, ত অফিসার করব কী?
গাছগিলা? গয়ানাথ দেউনিয়ায় নখত অফিসারের ঝগড়া কাজিয়া।
নরেশ হেসে ওঠ, কিছুট অকৃত্রিম, কিছুটা বানানো, তিস্তার বানাভাসা গাছের আবার আফিসার আছে নি? আরে চলেন ত! নরেশ গিয়ে বাঘারুর সেই হাতটাই ধরে যেটা অমূল্য ধরেছিল।
বাঘারুকে এমন হাত ধরে টানাটানি করে কেউ কোথাও কখনো সাধে নি। তার সন্দেহটাও সেখানেই। কিন্তু তার খিদেটা বড় বেশি সত্য হয়ে উঠছে। রাতটা কাটানোর পক্ষে এই জলের চাইতে ঐ বাঁধ নিশ্চয় ভাল। তা ছাড়া সে ত গাছগুলো নিয়ে যে-কোনো সময়ই ভেসে যেতে পারে। বাঘারু পা বাড়ায়।
নরেশ বাঘারুর হাতটা ছেড়ে দিয়ে আগে সুপুরি গাছে যায়। অমূল্য বাঘারুর হাতটা ধরেই ঘোরে, যেন, পেছনে মাঠ আছে, ছেড়ে দিলে বাঘারু দৌড়ে পালাবে। সুপুরি গাছের সামনে এসে অমূল্য বলে, নামেন আগে। বাঘারু হাতের ইশারায় অমূল্যকে নামতে বলে। অমূল্য সুপুরি গাছে ঝাঁপ দেয়। নীচে নেমে চেঁচায়, নামেন এহন। বাঘারু সুপুরি গাছে ভর দেয়। বাতাসে সুপুরি গাছটা এত বেশ দোলে যে বাঘারুর শরীরের ওজনে সেটা আর নতুন করে দোলে না।
নীচে নেমে এখন সমস্য হল–গাছ আর নৌকো নিয়ে চারজন কী করে যাবে। নৌকো করে চারজন চলে যেতে পারত–গাছগুলো এখানে রেখে। কিন্তু নরেশ বা অমূল্যর সেটা বলার সাহসই হয় না। বাঘারুর গলায় সেই নাইলনের দড়ির বান্ডিল–যে-দড়িতে এই গাছগুলোর সঙ্গে বাঘারু আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা। কিন্তু হাতে আর-সময় নেই। তাদের এখনই ভাসতে হবে। এখান থেকে তারা ত আর সরাসরি উল্টো দিকে যেতে পারবে না–স্রোতের মুখে তাদের কোনোকুনি ভাসতে হবে–তারপর ওপারে যেখানে গিয়ে ঠেকে। সেখান থেকে আবার পাড় দিয়ে নৌকো টেনে বাঁধের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
হে কাদাখোয়া–এই গাছগিলা কি নৌকাত বান্ধা যাবে? নরেশ জিজ্ঞাসা করে।
না হয়। নৌকাত গাছের ধাক্কা নাগিলে ডুবি যাবে, কাদাখোয়া বলে।
তোমরালা নৌকাত যাও কেনে, মুই গাছত যাছি, বলে বাঘারু আলগোছে তার মাচানে উঠে যায়। সেই মুহূর্তে এটাকে একমাত্র উপায় মনে হয়। নরেশ আর দেরি না করে বলে, তা গাছ ছাড় আগে, কুথায় তোমার নোঙর বাইন্ধছ? নরেশ হেসে ফেলে। বাঘারু একটা গাছের ডাল থেকে দড়ির পাক খুলতে হাত দেয়। নরেশ ঘেঁজে আর-কোথায় বাধন আছে–দেখে, অশ্বিনী রায়ের চালের টঙে।হে কাদাখোয়া, খোল কেনে, ঐখান খোল।
কাদাখোয়া তাকিয়ে একবার দেখে। তারপর গাছের ডালে-ডালে সে ওপরে উঠে যায়। কাদাখোয়া আর বাঘারু দুজনের ওজনে গাছগুলো দুলে ওঠে, দুলতে থাকে, কিন্তু ডোবে না। মনে হয় যেন ওরা দুজনই ভাসমান গাছগুলোর ডালে ওঠার সময় নিজেরা মাধ্যাকর্ষণের টান অতিক্রম করে গেছে। নীচের নৌকোয় দাঁড়িয়ে নরেশ আর অমূল্য বাঘারু আর কাদাখোয়ার শরীরের চেহারার মিলটাও আবিষ্কার করে। আপাদমস্তক নগ্ন শরীর থেকে তাদের হাতগুলো ডালের মত আকাশে উঠে যাচ্ছে আর নেমে আসছে।
দুদিকের বাধন খোলা সত্ত্বেও গাছগুলো নড়ে না। বাঘারু নীচে নেমে এসে কাদাখোয়াকে বলে, ঐঠে একখান আছে, ঐ নৌকাখানের কাছত। কাদাখোয়া সেই তলার বাধনটা খোঁজে, পায় না। বাঘারু ততক্ষণে উল্টোদিকের নীচের বাধনটা খুলে দিতে শুরু করেছে। আর সেই বাধনটা ঢিলে হওয়া ও খোলার সঙ্গতিতে গাছের বহর স্রোতের টানে নড়ে ওঠে।
কাদাখোয়া বলে ওঠে, নাই রো। বাঘারু, খাড়ান কেনে, বলে তার বাধনটা খুলে দেয়। গাছের বহর স্রোতের টানে অশ্বিনী রায়ের ঘরের সঙ্গে লেগে যায় আর সেই ধাক্কায় নৌকোটা যেন গাছগুলোর ভেতর ঢুকে যায়। বাঘারু আবার ডালে-ডালে এদিকে চলে আসে। নরেশ আর অমূল্য নৌকাতেই দাঁড়িয়ে ছিল লগি হাতে। কাদাখোয়াকে বাঘারু বলে, নৌকাত যান, এটা খুলিলেই ত সোতের মুখে ভাসি যাবে। কাদাখোয়া নৌকায় যায়। নৌকাটা গাছগুলোর এত ভেতরে সেঁদিয়ে গেছে যে এই গাছগুলো ভেসে গেলে নৌকাটা কী করে যাবে, ঠিক বোঝা যায় না।
হঠাৎ কাদাখোয়া বলে ওঠে, খাড়ি যান, খাড়ি যান।
বাঘারু দাঁড়িয়ে পড়ে। কাদাখোয়া নৌকোর বাঁধনটা খুলে দেয় আর স্রোতের ধাক্কায় নৌকোটা গাছগুলোর ভেতর সেঁদিয়ে গিয়ে আটকে যায়, এমন, যেন ওটাও একটা গাছ। নরেশ একটু ভয় পেয়ে বলে ওঠে, হে কাদাখোয়া দেখিস কেনে, গাছ চাপা পইড়লে নৌকা ত ডুইব্যা যাবে নে।
কাদাখোয়া কোনো জবাব দেয় না। সে নৌকোটাকে আরো একটু ঠিক করে নিয়ে অমূল্য আর নরেশকে বলে, লগি ধরেন, লগি ধরেন। নরেশ আর অমূল্য লগি ধরলে কাদাখোয়া বাঘারুকে বলে, খুলেন কেনে, খুলেন।
এদিকের বাধনটা যেখানে দেয়া ছিল, জল বেড়ে যাওয়ায় সেটা জলের তলায় চলে গেছে। . বাঘারুকে একটা ডাল বা হাত ধরে, ঝুঁকে ডান হাতে জলের তলার ঐ বাধনটা খুলতে হয়। প্রথম গিঠটা খুলতেই স্রোতের তোড় গাছের বহরকে একটু টেনে নেয়। বাঘারু বা হাতের ডালটা শক্ত করে ধরে একটা হ্যাঁচকা টান মারতেই গাছগুলো স্রোতের মুখে ভেসে যেতে গিয়ে আটকে যায়, ঘরের কোনায় একটা গাছের বড় ডাল আটকে গেছে। বাঘারু সেটা খোলে না। বরং সেই সুযোগে সে নৌকোর ওপর চলে আসতে পারে। আর, সেই ঝাঁকিতেও বটে, স্রোতের টানেও বটে, অশ্বিনী রায়ের গুয়াবাড়ির নোঙর ছেড়ে সেই বহর ঘোলাটে আকাশের নীচে তিস্তার ঘোলাটে স্রোতে উচ্ছন্ন বেগে ভেসে যায়। বাতাসের বিপরীত ধাক্কায় গাছের পাতায়-পাতায় এক ভাসমান ঝড়ের অলৌকিকতা সঞ্চারিত হয়।
