আর, আমরা ভাবতাছি তুমি মানুষ, না ফ্লাডের ভূত। এ্যাহন চলো, চলো।
কোটত যাম? বাঘারু সোনালি দড়ি গুছোতে-গুছোতে বলে।
ঐঠে, বাধে যাব্যার নাগবে। আমরা ত তোমাক এসকু কইরব্যার আসছি।
মুই না যাও, বাঘারু তাদের দিকে পেছন ফিরে বলে। নরেশ রেগে যায়, নাযাও কি? তোমার বাবার আহ্লাদ। যাবার লাগব। তোমা এসকু করিবার তানে নৌকা নিয়্যা দুইবতে-ডুইবতে আসছি, আর এ্যাহন না যাও! চলো- নরেশের গলায় একটা বিরক্ত হুকুমের স্বর আসে বটে কিন্তু সেই স্বরে কোথায় যেন এই প্রস্তুতিও ধরা পড়ে যায় যে নরেশ যেন জানত, বাঘারু যেতে চাইবে না।
অমূল্য অশ্বিনী রায়ের চালের ওপর বসে পড়েছিল, বাঁধের দিকে মুখ করে। অমূল্যদের বাড়ি অশ্বিনী রায়ের বাড়ির পশ্চিমে, বাঁধের আরো সামনে, একটু কোনাকুনি, কিন্তু আলাদা পাড়ায়। অমূল্য নিজের সেই বাড়ির দিকে মুখ করেই বসে ছিল। অশ্বিনী রায়ের এই চালটা ভেসে থাকবে, সেখানে তারা এসে উঠবে ও বসবে, অথচ অমূল্যর বাড়ির, অত বড় বাড়ির, একটা মাথাও দেখা যাবে না, সমস্তটা জুড়ে শুধু। ঘোলা জল আরো ঘোলা জল উথলে বয়ে যাবে–এর ভেতর একটা অবিচার আছে, অমূল্যর ওপর একটা ব্যক্তিগত অবিচারই যেন। অমূল্যর ঘরজমির যে কোনো ইশারা পর্যন্ত পাচ্ছে না অমূল্য তাতে অন্যদের বাড়িঘর জমিজিরেত যেন ডাঙা হয়ে ওঠে। যেন, আর কারোই কিছু ডোবে নি, যা ডোবার তা এক অমূল্যরই ডুবল! অশ্বিনী রায়ের চালে উঠে যেমন বাধ দেখছে অমূল্য, সেরকম ত নিজের চালের ওপর বসেও দেখতে পারত–তাতেও বোঝা যেত, তার বাড়িটা আছে। কিন্তু যে-চরটায় তাদের বাড়িঘর, সেই চরটাতেই দাঁড়িয়ে বা বসে তারা শুধু জলই দেখে চারদিকে, সেই এক ঘোলা জল, এমন-কি আকাশ থেকে যেন সেই ঘোলাটে বৃষ্টিই হচ্ছে। অমূল্য বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে ওঠে, না-যায় ত যাক, চল, আমি আর থাকইব না–
নরেশ অমূল্যর দিকে তাকিয়ে কী বুঝে নেয়, তারপর গলার স্বর নীচে নামিয়ে বলে, কস কী? এডারে নিয়্যা না গ্যালে তরে টাকা দিব কেডায়?
না দিক। কেডায় জানত এড়া এহানে আছে
না-জানতি ত আলি ক্যা?
তুই টাকার তাল তুললি, শালা। টাকা? দেহিস না চাইরপাশে? তিস্তার তলে তর খাড়া জমিতে বালুবাড়ি হবার ধইরছে।
নরেশ বাঘারুকে বলে, এই দেউনিয়া শুনেন—
বাঘারু ততক্ষণে সোনালি দড়ি গুছিয়ে ফেলেছে। সে নরেশের দিকে তাকিয়ে বলে, মুই দেউনিয়া না হই। গয়ানাথা জোতদার মোর দেউনিয়া।
তোমরালার ঘর কোথায়?
ঐ বাঘারু যে-তিস্তা পেরিয়ে এসেছে, সেই পুরো তিস্তাটাকেই দেখায়। নরেশ ভেবেছে সে কিছু দেখাচ্ছে। তাই, বাঘারুর অঙ্গুলিনির্দেশে ঘাড় ঘুরিয়ে সেই একই জল দেখে ঘাড় ফিরিয়ে বলে, আরে, তোমার গাও কুথায়?
বাঘারু সেই একই তিস্তার ওপর দিয়ে হাত ঘুরিয়ে আনে–ঐঠে।
নরেশ আবার চুপ করে কিছু ভাবে। তারপর বাঘারুকে বলে, জলে ভাইস্যা গিছে তোমাগ গ্রাম?
বাঘারু ঘাড় নাড়ায়, না, ভাসে নি।
তা, তুমি ভাইস্যা আইল্যা কোথথিক্যা মণি?
গয়ানাথর ফরেস্ট তিস্তা চুকি গিছে।
তয়?
গাছ ভাঙি গিছে।
তয়?
গয়ানাথ গাছগিলাক আর মোক ভাসি দিছে।
তয়?
হামরালা ভাসি আসিছু।
আসিছু ত আসিছু। বাবা, এহন বাধে যাবার লাগব! অফিসার আইসছে। আমাগো পাঠাইছে। চলল, চলোনরেশ একটু এগিয়ে বাঘারুর হাত ধরে। বাঘারু বাধা দেয় না। নরেশ হাত ধরে টানে, বাঘারু নড়ে না। নরেশ হাত ছেড়ে দেয়, বাঘারুর হাতটা পড়ে যায়।
গয়ানাথ কহিছে, বাঘারু, গাছগিলার নগত ভাসি যা, য্যালায় বানা কমিবে তক খুঁজি নিম।
তা তোমার গাছগুল্যা নিয়্যাই চলো বাবাঐখান থিক্যাই তোমার দেউনিয়া তোমাক খুঁজি নিবে।
বাঘারু চুপ করে বাঁধের দিকে তাকায়। এই যুক্তিটা তার ভাল লেগে থাকতে পারে যে বাঁধের ওখানেই গয়ানাথের পক্ষে তাকে খুঁজে বের করার সুবিধে। আবার, ঐ পশ্চিম দিকে তাকিয়েই সে হয়ত রাত্রির আসন্নতা বুঝতে পারে। বাঁধ, বাঁধের মানুষজন, কিছু চলাফেরা–এসব তাকে টেনে থাকতেও পারে।
নরেশ বলে, চলো, চলো, গাছগিলা নিয়্যাই চলল, চল্ অমুইল্যা।
অমূল্য উঠে দাঁড়ায়। তারপর নরেশ সুপুরি গাছের দিকে এক পা বাড়ায়। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, বাঘারু নড়ে না।
.
১৪৭. কাদাখোয়ায় নৌচালনা
নরেশ ঘুরে সঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে বলে, কী হইল?
বাঘারু বাঁধের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, না যাম। মুই এইঠে থাকিম।
নরেশ গলা আরো তুলে বলে, আরে তোমা ত তোমার দেউনিয়া কইছে যেইখানে ঠেইক্যা যাবি সেইখানে গাছগুলো নিয়্যা থাকবি, তক আমরা খুঁইজা নিব। এই কইছে ত?
হয়। কহিছে।
তা, তোমার দেউনিয়া আসি যদি ঐ বাঁধের উপর খাড়ায় আর তুমি যদি তোমার ঐ গাছের মাচানের উপর বইস্যা থাক, তমার দেউনিয়া তোমাক দেইখবে ক্যামন কইর্যা?
বাঘারু বাধ থেকে চোখ সরিয়ে নরেশের ওপর আনে। নরেশ তার চোখ দেখে অনুমান করে–এই যুক্তিটা যেন তার মনে ধরছে। সে যুক্তিটাকে আর-একটু জোর দিতে চায়।
তোমার দেউনিয়া তোমাক বাধ দিয়্যা খুঁইজব না জল দিয়্যা খুঁইজব?
বাধত খুঁজিবে।
তা বোঝ ত সবই, কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা। বাধ দিয়া খুঁইজব ত বাধে চলো। এহানে খাবাডা কী? দেউনিয়া চিড়ামুড়ি কিছু দিছে?
নাই রো।
সারাদিন কিছুই খাও নাই?
খিদ্যা পায় নাই?
হয়।
নরেশ অমূল্যর দিকে তাকায়। তারপর নরেশ আর অমূল্য দুজন এক সঙ্গে বাঘারুর দিকে তাকায়। তারা বুঝে ফেলে–ঐ দেউনিয়া গাছগুলোকে বাঁচানোর জন্যে এই লোকটাকে গাছের সঙ্গে ভাসিয়ে দিয়েছে। যদি এখানে না ঠেকত তা হলে লোকটা আরো দূরে-দূরে ভেসে যেত। এই ফ্লাডের তিস্তা থেকে সে এক আজলা জলও ত পেত না। বাঘারুর দিকে তাকিয়ে এতক্ষণে নরেশ আর অমূল্য তাকে উদ্ধার করার জন্য আবেগ বোধ করে–জলে ভাসা ক্ষুধার্ত একটা মানুষকে উদ্ধার করার আবেগ। অফিসারটা এসে গেল বলে না-হয় নরেশ টাকার কথা বলেছে। কিন্তু অফিসারটা যদি না আসত আর এই লোকটাকে যদি এই চালের ওপর তারা বসে থাকতে দেখত, তা হলেও, তারা ঐ নৌকো নিয়ে এরকমই বেরিয়ে পড়ত। অমূল্য চালের ওপর দিয়ে হেঁটে, নরেশকে পেরিয়ে, বাঘারুর কাছে যায়। তারপর বাঘারুর হাত ধরে বলে, চলেন ত। এইঠে জলের মইধ্যে বইস্যা বইস্যা শুখায়্যা মইরবেন নাকি? চলেন। রাইতটা থাকেন। খান। ঘুমান। তারপর না হয় আপনি আপনার গাছ নিয়্যা ভাইস্যা যাইবেন।
