রঘু ঘোষ তার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে হেসে বলে, তোরা আবার কোত্থেকে এসেছিস? যা
তা তুইও চলেক একটা মেয়ে পেছন থেকে বলে ওঠে, হে বৌদি, অফিসবাবুকে লিগেলা?
কে রে? বলে রঘু ঘোষ হাসতে-হাসতে মেয়েদের দলটার দিকে চোখ পাকায়। অফিসার ততক্ষণে ভিড়টার পেছনে চলে গেছে। সেখানে দেখে জগদীশ বারুই আর অশ্বিনী রায় বোল্ডারের ওপর উবু হয়ে বসে বিড়ি খাচ্ছে আর মাঝেমধ্যে ঘাড় উঁচু করে ভিড়ের পেছনটা দেখছে। অফিসার তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলে, এই যে আপনারা এখানে! তখন ত খুব বললেন, কত লোক ভেসে আসছে, এখনি নৌকো পাঠাতে হবে, মিলিটারি চাই। মিলিটারি এলে ত আপনাদেরই এখন জলে ভাসাত
অফিসার দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বলছিল, ফলে, জগদীশ বারুই আর অশ্বিনী রায় বোঝে না কথাটা তাদেরই বলা হচ্ছে। তারা বিড়ি খেয়েই যায়। জগদীশ বারুই একবার মুখ তুলে জিজ্ঞাসা করে, কীরে, কিছু হইল নাকি?
অফিসার বলে ওঠে, হবেটা আবার কী? লোক থাকলে ত আনবে। লোক না থাকলে কোত্থেকে আনবে? আর আপনারা এদিকে ত বলছিলেন কত লোক ভেসে আসছে–
অশ্বিনী রায় ঘাড় তুলে অফিসারকে দেখে উঠে পঁড়ায়। জগদীশ বারুই অশ্বিনীকে দাঁড়াতে দেখে ঘাড় তুলে দেখে–তারপর সেও দাঁড়ায়। অশ্বিনী রায় একটু সরে যাওয়ার চেষ্টা করে! জগদীশ বারুই তার হাত ধরে টেনে অফিসারকে জিজ্ঞাসা করে, কী কন?
বলছি, তখন ত খুব লোক ভাসাচ্ছিলেন, এখন ত ওখানে একটা লোকও পাওয়া যাচ্ছে না। মিলিটারি এলে কী হত?
সে কী হইত, আপনারা জানেন। লোক না থাইকলে কি লোক পয়দা কইর্যা ভাসায়্যা চালের উপর থুইয়্যা আইসব নাকি? তাও ত দশমাস লাইগব। সকাল বেলায় জ্বলজ্যান্ত মানুষরে সাগলে দেইখল চালের উপর, আর, সুপুরি গাছে চইড়া গেল কুথায়? সেইডা জিগান না?
গেল কোথায়, সেটা কি আমি খুঁজে বের করব নাকি? অফিসার রেগে সরে যায়। ওরকম রেগে-রেগে অফিসার ক্রমেই ভিড়টার পেছনে সরে এসেছিল। সে প্রায় বাঁধের নীচে গিয়ে দাঁড়ায়। তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতেই একটা ইতস্ততের ভাব ছিল, যেন সে বাধ বেয়ে উঠে, ওদিক দিয়ে নেমে গিয়ে জিপে চড়ার একটা উপলক্ষ খুঁজছে। কিন্তু সেটা ঠিক পেরে উঠছে না।
অফিসার আবার ভিড়টার মধ্যে এসে, দু-একজনকে সরিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। তখন দেখা যাচ্ছে, সেই টিনের চালের ওপর ওরা তিনজন মিলে কথাবার্তা বলছে। অমূল্য চালের একদিকে বসেই পড়েছে, আর নরেশ কাদাখোয়া কথা বলে যাচ্ছে। কথা বলাটা বোঝা যায়, দু জনের দাঁড়ানোর ও হাত-পা নাড়ার ভঙ্গি থেকে।
অমূল্যা করে কী ঐখানে বইস্যা বইস্যা?
কাদাখোয়ার তানে এ্যাত কথা কী কছে নরেশুয়া?
এই দুটি জিজ্ঞাসা নিয়ে এ-পাড়ের ভিড় খুব বিব্রত হয়ে ওঠে।
.
১৪৬. শীর্ষ বৈঠক
চালের ওপর নেমে নরেশ বাঁধের দিকে তাকায়। বাঁধের ওপর থেকে এই চালটাকে যত কাছে মনে হচ্ছিল, চালের ওপর থেকে বাধটাকে তত কাছের ত লাগেই না, একটু যেন দূরের লাগে। বাতাস আর বৃষ্টির কুয়াশায় আর তিস্তার জলস্রোতের শীকরে এই দূরত্বটার মধ্যে একটা পর্দার মত তৈরি হয়েছে ত বটেই, যেমন হয় ভোর রাতে, কিন্তু তা ছাড়াও বাধটাকে যেন দূরেরই ঠেকে, নরেশের। একটু ঠাহর করতেই সে ভিড়টাকে প্রায় চিনে নিতেই পারে, এমন কি, আর-একটু নজর করলে লোকজনকেও চিনতে পারে–তবু অশ্বিনী রায়ের চালের ওপর উঠে নরেশ বাধটাকে আর কাছের দেখে না। অথচ, অশ্বিনী রায়ের যে-ঘরটা এখন জলের তলে, যেসুপুরি গাছগুলো জলের ওপর শুধু মাথাটা তুলে জেগে আছে, সেই ঘর, সেই সুপুরি গাছের পেছন দিয়ে, তলা দিয়েও, নরেশ ত তার এই এতগুলো বয়স ধরে সামনের এই বাধটাই দেখে এসেছে। তার জন্ম যদিও এখানে নয়, কিন্তু এই চরটাতেই ত জোয়ান হয়ে উঠেছে সে। বাঁধের ওপর থেকে এই চরটার দিকে সারা জীবন যতক্ষণ তাকিয়েছে নরেশ, তার চাইতে অনেক বেশিক্ষণ তাকিয়ে থেকেছে চর থেকে বাধটার দিকে। অথচ, এখন নরেশের মনে হয় স্বাধটাতেই তার বাড়িঘর, কত তাড়াতাড়ি সেখানে ফিরে যাবে! অশ্বিনী রায়ের বাড়ির সামনের রাস্তা থেকে নরেশের বাড়ি দেখা যায় না। অশ্বিনী রায়ের চাল থেকে কি দেখা যেত? নরেশ একবার বাঁধের দিকে পেছন ফিরে জলের তলার এই চরে তার বাড়ি যেদিকে থাকার কথা, সেদিকে ঘোলা জলের ওপর দিয়ে তাকিয়ে জলের তলায় যেসব গাছ, বাড়ি, বাগান, গোয়ালবাড়ি ডুবে আছে সেগুলোকে একবার দেখে নিতে চায়। অশ্বিনী রায়ের বাড়ি আর তাদের বাড়ি আলাদা পাড়ায়। মাঝখানে একটা ছোট খালও আছে। দেখা না-যাওয়ারই কথা। কিন্তু নরেশদের ঘরটা খুব উঁচু-তার টিনের চালটা হয়ত দেখা যেতে পারে। নরেশ দেখে-চারিদিকে ধু ধু করছে শুধু জল। এখন যদি নরেশকে জলের তলায় নিয়ে গিয়ে তার বাড়ি খুঁজে নিতে বলে কেউ, নরেশ পারবে না। বাঁধের ওপর থেকে এই জল দেখেও মনে ভরসা থাকে যে জল নেবে গেলে চরে ফিরবে। কিন্তু এখানে এই চরেরই ওপর দাঁড়িয়ে সেরকম কোনো ভরসা ত নরেশ পায়ই না, বরং বাধটার দিকে তাকিয়ে সে ফিরে যাওয়ার একটা তাড়া বোধ করে। একটু ভয়ও যেন পায়। নরেশ বাঘারুকে জিজ্ঞাসা করে-তুমিই সকালে এই চালে উঠছিল্যা না?
হয়।
তারপর সুপুরি গাছে উইঠ্যা ভ্যানিস? আর নামার নাম নাই।
গাছত আছিল।
