কিন্তু মাত্র ত কয়েক হাতের ব্যাপার। তাই আস্তে-আস্তে টানলেও তারা ঐ গাছগুলোর কাছে পৌঁছে যায়। বাঘারু চালের ওপর হুমড়ি খেয়ে তলার বটমে হাত দিয়ে দড়িটা গুঁজে দেয়। কাদাখোয়া বাঘারুর গাছগুলোর একটা মোটা ডালে দড়িটা বেঁধে দিয়েও ডালটা ধরে থাকে।
সুপুরি গাছটা ধরার জন্যে এই গাছগুলোর একটা ডালে একটু পা দিতেই হয়। অমূল্য পা দিয়েই বোঝে, ঝোঁক দিলে ডালটা ডুবে যাবে। সে আলগোছে ডালে পা দিয়ে সুপুরি গাছটায় যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে। সুপুরি গাছ বেয়ে অমূল্য চালে নামতেই নরেশ তার লম্বা হাতে নৌকোর ওপর থেকেই সুপুরি গাছটাকে জড়িয়ে ধরতে পারে। ওরা দুজন নেমে গেলে নৌকোটা জলের ওপর আরো হালকা হয়ে যায়। কাদাখোয়া নৌকোর ওপর বসে বসে এই ডাল ঐ ডাল ধরে নৌকোটাকে ডালপালার আরো ভেতরে নিয়ে যায়। সেজন্যে তাকে বাধনটা খুলতেও হয়। নতুন বাধনে নৌকোটা আরো একটু ভালভাবে আটকা পড়ে। কাদাখোরা সামনে হেলে সুপুরি গাছটাতে হাত দেয়। কিন্তু কী মনে করে ঝাঁপ দেয় না–ধাক্কা দিয়ে হাতটা সরিয়ে আনে। তার ত চালের ওপর কোনো কাজ নেই, বরং এখানেই থাকুক, মুই এইঠে থাকি, নৌকোর ভিতর, এইঠে। সে নৌকোর ভেতর বসে পড়ে।
.
১৪৫. বাঁধের ওপর তর্কবিতর্ক
বাঁধের ওপর থেকে দেখা যায়—আরো দু-জন চালের ওপর নেমে এল। অমূল্যকে সবাই চিনে ফেলে–সবার চেয়ে খাটো বলে। কিন্তু যে আগে চালের ওপর দাঁড়িয়েছিল সে, নরেশ, না কাদাখোয়া, এ নিয়ে সন্দেহ ছিল। এখন, অমূল্যর সঙ্গে যে নামল, তাকে যদি নরেশ বলে ধরে নেয়া যায়, তা হলে আগের লোকটা ত কাদাখোয়াই হয়। তা হলে, যে-লোকটিকে উদ্ধার করার জন্যে এরা এখান থেকে নৌকো নিয়ে রওনা হল, সে লোকটা কোথায়? সুবুরি গাছে চড়ে সে লোকটা কি সত্যি-সত্যি উধাও হয়ে গেল নাকি?
অ্যাঁ? আরে, যে-মানুষডারে রেসকু কইরব্যার গেল, সেই মানুষই ত নাই, এহন অগরে রেসকু করার জন্যে আর একখান নৌকা ছাড়ো। অ্যাঁ?
কথাটা শুনে অফিসার ব্যস্ত হয়ে পড়ে, সে কী? লোকটি নেই? লোকটি নেই নাকি? কী? আপনারা লোকটিকে দেখতে পাচ্ছেন না?
পেছন থেকে একটা গলা শোনা যায়, চালের উপর কয়খান মানষি দেখিছেন?
দেখছি ত তিনজন, তিনজন, বলে অফিসার আবাব চালের দিকে তাকিয়ে মিলিয়ে নেয়, হ্যাঁ, তিনজনই।
এইঠে কয়ডা মানষিক নৌকা করি ছাড়ি দিলেন? আবার প্রশ্ন।
ওরা ত দুজন ছিল, আর-একজন ত এখান থেকে যাওয়ার কথা, সে গিয়েছে ত? অফিসার একটু ব্যস্ত হয়ে এপাশ-ওপাশ ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করে। তার কথাতে সবাই একসঙ্গে হেসে ওঠে। হাসিটার কোনো অর্থ অফিসার বুঝতে পারে না, কিন্তু তার কথার সঙ্গে এই হাসির সম্পর্ক অনুমান করে আবার এদিক-ওদিক তাকায়। হাসিটা থামার পর জগদীশ বারুই বলে ওঠে, এইখান থিকা আপনার চোখের সামনে কয়জনরে দেইখলেন নৌকা কইর্যা যাতে?
তিনজন, তিনজন, তিনজনই ত ছিল– অফিসার জগদীশ বারুইকে খুঁজতে-খুঁজতে জবাব দেয়।
হয়? ঐ তিনজনই ছিল, তিনজনই, আছে, জগদীশ বারুই বিড়ি টানে সশব্দে।
তালই কি দেখব্যার পারতিছেন অগ? তয় না শুনি আপনার ছানি পড়ছে, খুব নিচু স্বরে কেউ বলে।
জগদীশ বারুই হাসতে গিয়ে কেশে ফেলে। তারপর, কাশিটা বাড়তে থাকে। বুক থেকে কফ তুলে কাশিটা শেষ। তারপরও জগদীশ বারুইকে গলা পরিষ্কার করতে হয়। এর মধ্যে একজন বলে, ঐটা কাদাখোয়া। কাদাখোয়াই আগত্ চালে উঠিছে, নরেশুয়ার গাওত ত জামা আছে
হয়, হয়, নরেশুয়া, অমূল্যা, কাদাখোয়া–এই তিনো মানষি। আর সেই মানষিডা নাই। কথাটা প্রায় সিদ্ধান্তের মত শোনায়।
অ্যাঁ? লোকটা নেই? যাকে রেসকিউ করতে গেল, সেই লোকটাই নেই? আর আপনারা এখানে এমন চেঁচামেচি শুরু করলেন যেন ওখানে কত লোক ভেসে এসে উঠেছে। তারপর আবার হাজার। টাকা-দেড় হাজার টাকা নিয়ে দর কষাকষি শুরু করলেন। এখন ত আমাকে এক্সপ্ল্যানেশন দিতে হবে-লোক না দেখে নৌকো পাঠালাম কেন? বলতে বলতে অফিসার সরে আসে আর রঘু ঘোষকে দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে চিৎকার করে, কী মশাই? আপনারাই ত বাগান থেকে ফোনের পর ফোন করলেন যে লোক ভেসে আসছে। এখন লোক কোথায়? দিন।
রঘু ঘোষ হে-হে করে হেসে ওঠে, আরে, আপনি আমার ওপর রাগারাগি করছেন কেন? আমি কী করলাম?
আপনারাই ত বাগান থেকে ফোন করেছেন–সকালে একবার, বিকেলে একবার।
সে ম্যানেজারবাবুকে বলুন, রঘু ঘোষ দায়িত্ব অস্বীকার করে, এখানকার লোক গিয়ে বলেছে তাই। ফোন করা হয়েছে।
তাই বলে না দেখে ফোন করবেন নাকি?
অফিসারের সঙ্গে রঘু ঘোষের কথাবার্তা শুনে বাগানের লোকজন পায়ে-পায়ে একদিকে জড়ো হতে শুরু করে–গুদামবাবু, অফিসবাবুর বড় শালী, লিলি, গোপা, আরো দু-একজন। গুদামবাবু জিজ্ঞাসা করে, কী? কী হয়েছে?
রঘু ঘোষ একটু সরে এসে বলে আরে, ওখানে লোক পাওয়া যায় নি সেটা কি আমাদের দোষ? ফ্লাডের সময় কেউ যদি এসে বলে নদী দিয়ে তোক ভেসে যাচ্ছে, ফোন করে দিন, তা হলে আমরা কী করব, ফোন করব না?
লিলি আস্তে বলে, অত চৈঁচাচ্ছ কেন?
গুদামবাবু বলে, ঠিক আছে, ঠিক আছে, ওঁদের কিছু বলার থাকলে হেড-অফিসে জানান, আমাদের বলে কী লাভ?
অফিসবাবুর বড় শালী বলেন, চলুন, চলুন, এখন ফিরে চলুন।
এদিকে বাগানের বাবুদের ও বাবুদের বাড়ির মেয়েদের এক জায়গায় জড়ো হয়ে এরকম কথাবার্তা বলতে দেখে বাগানের যেকুলিকামিনরা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিল, তারাও এসে এখানে দাঁড়ায়। তাদের মধ্যে একজন একটু এগিয়ে এসে রঘু ঘোষকে জিজ্ঞাসা করে, কী, হোগেলাক হে, অফিসবাবু!
