.
১৪৪. বাঘারু ও উদ্ধারকারীদল
বাঘারু চট করে একটা হিশেব করে নেয়। মাচান থেকে দড়ি জলে ফেললেই ওরা ধরে ফেলতে পারবে। তারপর সেই দড়িটায় টান দিয়ে দিয়ে এই গাছগুলোর তলায় পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু এই গাছগুলোর ডালপালা, এই মাচান কি চার-চারটি লোকের ভার বইতে পারবে? ওরা এক সঙ্গে এর কোনো ডালে পা দিলেই ত সে ডাল ডুবে যাবে। তার চাইতে টিনের চালটাতে ওদের ভোলা যায়। সুপুরি গাছ দিয়ে ওরা চালে উঠে যেতে পারবে।
বাঘারু ডাল বেয়ে-বেয়ে সুপুরি গাছটার কাছে গিয়ে সুপুরি গাছটাকে জড়িয়ে ধরে দু ধাক্কাতেই মাথায় উঠে যায়, তারপর একটু ঝুলে অশ্বিনী রায়ের চালে পা দেয়। যে-দড়িটুকু সে খুলেছিল, সেটুকু তার শরীর থেকে সেই জলের ওপরের শূন্যতায় ঝোলে, দোলে ও তার শরীরের গতির সঙ্গে সঙ্গে ঘুরপাক খায়।
বাঁধের লোকজন দেখে সুপুরি গাছের ওপর থেকে লোকটা আবার অশ্বিনী রায়ের চালের ওপর নেমে এসেছে।
নাইমছে, নাইমছে, চিৎকার ওঠে।
ক্যানং করি নামিবে, এতগিলা টাইম কায় পারে সুপুরি গাছের উপর বসি থাকিবার? ভাল করি দেখ, নরেশুয়াখান ঐঠে উঠিছে নাকি? কেউ একটু সন্দেহ জানাতেই সবাই এই বাধ থেকে মাপার চেষ্টা করে টিনের চালের ওপর লোকটা নরেশ কি না।
অফিসার দু পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে, কী? এই লোকটাই ভেসে এসেছিল নাকি? কিন্তু তার কথার কোনো জবাব কেউ না-দেয়ায় সে আবার দু পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, অ্যাঁ?
লিলিও এই একই প্রশ্ন করে রঘু ঘোষকে। রঘু ঘোষ ঘাড় না-ফিরিয়ে জবাব দেয়, তা আমি জানব। কী করে? তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে যোগ করে, সেই লোকটাই কী না, তা দিয়ে তোমার দরকারই বা কী? তোমার ত ঐ চালে একটা লোক দরকার–সে যোই হোক না।
অফিসবাবু পেছনে বাঁধের ওপর থেকে ডাকেন, এই রঘুবাবু, কী বলছেন? কে ওখানে?
রঘু ঘোষ হাত তুলে আঙুলগুলো ঘুরিয়ে দেয়।
না, না, কেডা কইছে নরেইশ্যা? নরেইশ্যা ত ফুলপ্যান্ট পইর্যা গিছে? এই লোকটার ত নেংটি। কেউ একজন নিশ্চিত স্বরে জানায়।
এতডা জল ঠেইল্যা গেলে ফুলপ্যান্টও নেংটি হয়্যা যায়, আর-একজন সেই নিশ্চয়তা মুহূর্তে ভেঙে দেয়।
তয়; কাদাখোয়া, হবা পারে, আর-একটা নতুন প্রস্তাব আসে।
এইবার আবার একটু সবাই চুপ করে যায়। এত দূর থেকে চালের ওপর লোকটার চলাফেরা আর দৈর্ঘ্যটাই কিছু বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু নরেশও ত লম্বাই–যদিও এতটা লম্বা ঠিক মনে হয় না। তা হলে কাদাখোয়া হতেই পারে। কিন্তু লোকটি যে-ভঙ্গিতে চালের ওপর চলাফেরা করছে, হাত নাড়ছে সেটা কাদাখোয়ারই কিনা তা চিনে নেবার মত গভীর ভাবে কে কবে এখানে কাদাভোয়াকে কাজ করতে দেখেছে? চালের ওপরের লোকটি কাদাখোয়াই কিনা এটা যাচাই করতে করতেই এই ভিড়ের কাছে চেনা কাদাখোয়া অচেনা হয়ে যায়।
হবা পাবে, কাদাখোয়া হবা পারে।
কাদাখোয়া হবা পারে নরেশুয়াও হবা পারে।
ঐ মানসিডাও হব্যার পারে। না হইলে রেসকু করবেন কারে?
অফিসার দু পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করে, লোকটিকে পেয়েছে ত, নাকি? কিন্তু অফিসারের কথার কোনো জবাব কেউ দেয় না। অফিসার আবার ঘাড় ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করে, পেয়েছে নাকি?
বাঘারু টিনের চালের কিনারে এসে দাঁড়ায়, তারপর তার পেছনে নাইলনের যে-দড়িটা ঝুলছে সেটা টেনে-টেনে এনে জড়ো করে। এই দড়ির ত কোনো আগা নেই, সবগুলো গাছই দড়িতে-দড়িতে বাধা। বাঘারুর হাতে টান লাগে, আর-দড়ি আসে না। তখন সে ঐ সবটা দড়ি পা দিয়ে নীচে ফেলে দেয়, জলে। জলে পড়া মাত্রই দড়িটা অনেকগুলো দড়ির মত চারদিকে ছড়িয়ে পড়েই সোজা হয়ে যায়। দড়ির মাঝখানের বৃত্তটা বড় হয়ে যায়। কিন্তু নরেশদের নৌকোর কাছে দড়িটা পৌঁছয় না। অমূল্য একটা লগি দিয়ে দড়িটা টেনে নেয়।
নরেশ আর অমূল্য যেন বাঘারুকে উদ্ধার করতে আসে নি, বাঘাই যেন তাদের উদ্ধার করছে—অমূল্য এমন ভাবে দড়িটা টেনে পরীক্ষা করে। দড়িটাতে টান দিতেই তাদের নৌকোতেও টান লাগে, নৌকোটা চালের দিকে ঘোরে। কাদাখোয়া জিজ্ঞাসা করে, খুলি দিম? অমূল্যর সঙ্গে নরেশও দড়িটায় হাত লাগিয়ে আস্তে বলে, দে কেনে। কিন্তু নরেশের কথায় কিছু একটা সংশয় ছিল। কাদাখোয়া দড়ি খোলে কিন্তু গাছ ছাড়ে না।
দড়িটা বিপরীত দিকে কিসের সঙ্গে বাঁধা তা ত আর ওরা জানে না, ফলে ওরা দড়িটাতে জোরে টান দিতে ভরসা পায় না। যেখানে দড়িটা বাঁখা আছে সেটা যদি তাদের টানে খুলে যায় তা হলে স্রোতের একটা টানে নৌকোটা এমন ছিটকোবে, তারাও সেরকম ছিটকে জলে গিয়ে পড়তে পারে। সেই ভয়ে তারা নৌকোর ওপর দাঁড়িয়ে জোরে-জোরে টেনে পরীক্ষা করারও সাহস পাচ্ছে না। চালের ওপর থেকে বাঘারু চিৎকার করে, টানেন, টানেন, না-ছিড়িবে, না-ছিড়িবে, কিন্তু সেটুকু বলেই বাঘারু বসে থাকে না, সে দড়ির আর-একটা দিক চালের ওপর থেকে হাতে তুলে নেয়, দড়িটাকে সমান করে নিয়ে জোরে টানে। সেই টানের জোরে অমূল্য আর নরেশ বোঝে দড়ি খুলে যাবার কোনো ভয় নেই। খুলি দে, খুলি দে, কাদাখোয়াকে নরেশ বলে।
কাদাখোয়া দড়িটা খুলতেই নৌকোটা গাছ থেকে সরে যায়, দড়িটা টানটান হয়ে পড়ে আর জলস্রোত এসে নৌকোর সামনে উছলে ওঠে। মাত্র কয়েক হাতের সেই দূরত্ব স্রোতের বিপরীতে যেতে তার সমস্ত জোর হাতে এনে দড়িটা ধরে টানে। কাদাখোয়ও হাত লাগায়। কিন্তু তাদের তিনজনই বুঝে ফেলে স্রোতের বিপরীতে একটা হেঁচকা টানে এই দূরত্বটা পার হতে গেলে স্রোত ফুলে উঠে নৌকো উল্টে দিতে পারে। তা ছাড়া, দড়িটাতে হাত লাগিয়ে শরীরটা ঝুলিয়ে দিয়ে যে-টান দেয়া যায়, তার জন্যে ত গোড়ালি রাখার একটা জায়গাও দরকার। এ নৌকোতে তেমন কোনো জায়গা নেই। স্রোতের মুখে নড়বড় করতে করতেও যে-নৌকো এ পর্যন্ত এসে গেছে, স্রোতের বিপরীতে সে-নৌকোর তলার তক্তা ফাঁক হয়ে যেতে পারে।
