হ্যাঁ হ্যাঁ চলুন, আমরা রওনা হয়ে যাই, পরে দেখা যাবে, বলেই সুহাস জামা-প্যান্ট পরতে ঘরে যায়। আর যেতে-যেতে ভাবে, নেহাত মাঠে যাওয়ার দরকার হলে বরং যেখানে যাচ্ছে সেখানেই সুবিধে। অবশ্য গা-সুদ্ধ লোক দাঁড়িয়ে থাকবে আর সাহেব মাঠে যাবে–সেটা দেখাবে কেমন। সার্ভে ত বেলা বারটা-একটা পর্যন্ত। দেখাই যাক। সুহাস বাইরে বেরিয়ে এসে বলে, চলুন, দেরি হল না ত? গিরিজাবাবু কে?
এখানকার হাট কমিটির, ঐ যে কাল আপনার সঙ্গে দেখা করলেন। না, দেরি আর কী, দেখতে-দেখতে পৌঁছে যাব।
কাল সন্ধ্যায়ই যার নিমন্ত্রণ অত করে প্রত্যাখ্যান করল সুহাস, আজ সকালেই তাঁর সাহায্য দরকার–এতে যেন লজ্জাই পায়। এখন আবার ভদ্রলোক বিকেলে এসে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে না চান, যেখানে অ্যাটাচড…। সামনেই ত চা বাগান আর তাদের ইস্পেকশন বাংলো৷ সুহাস যে মাঠে যেতে পারে নি এতেই যেন তার দুর্বলতা ধরা পড়ে গেল।
ওঁরা পাকা রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন। প্রিয়নাথ পেছন থেকে এসে বিনোদবাবুর হাতে চাবি দুটো দিল-তালা আটকাচ্ছিল। তারপর ওরা দক্ষিণ দিকে চলে। সুহাস কেবির (খানাপুরী কাম বুঝারত) কাজ শুরু করছে একেবারে তিস্তার পাড় থেকে–ঠিক যেখানে আপলাদ ফরেস্টের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমা, গাজোলডোবা চা বাগান। পশ্চিমে তিস্তা। গাজোলডোবার একটু দক্ষিণ থেকে একটা ছোট নদী, খানা, বেরিয়ে আরো দক্ষিণে গিয়ে তিস্তাতে মিশেছে। এখান দিয়েই ৬৮ সালের বন্যায় তিস্তার বান ঢাকে। গাজোলডোবা চা বাগানের আর ঐখানে আপলাদ ফরেস্টের বেশ বড় অংশ একেবারে ভেসে যায়। ফলে; ওখানে ম্যাপিং-এর একটা বেশ ঝামেলা আছে। অর্থাৎ এখন তিস্তা কোথা দিয়ে বইছে, চর উঠছে কি না, গাজোলডোবার কতটা নদীতে আর কতটা এখনো কায়েমে, ৬৮র বন্যার পর গত দশ-পনের বছরে আবার আগের ম্যাপের অবস্থায় ফিরে এসেছে কি না, আপলাদের সাদার্ন আর সাউথ ইস্টার্ন বর্ডার কোথায় ধরা হবে–এই সবের একটা মীমাংসা করতে হবে। তারপর আপলাদ ফরেস্টকে বয়ে, উত্তরে রেখে ওরা ধীরে ধীরে সোজা উত্তর-পশ্চিমমুখো আনন্দপুর চা বাগানের জোল্যাস্ত পর্যন্ত পৌঁছবে। এখানে ম্যাপিং-এর ঝামেলা কম, আর ফরেস্ট ল্যাণ্ডের ত মৌজা ম্যাপ ইত্যাদি ডিপার্টমেন্ট থেকেই তৈরি করে দেয়, চা-বাগানেরও তাই। সুতরাং ফরেস্টকে বঁ হাতিতে রেখে ঐ ফালিটার সার্ভে শেষ করে, পরের দফায় আবার রাজাডাঙ্গা দিয়ে ঘুরে, এর নীচের ফালিটা দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে সেই একেবারে খালপাড় পর্যন্ত যাবে। এই প্ল্যান অনুযায়ীই নোটিশ ও মৌজা-ইস্তাহার দেয়া হয়েছে।
পাকা রাস্তা ছেড়ে ওরা মাঠে নামে, আল ধরে যেতে হচ্ছে বলে একটা লাইনও হয়ে গেল। সবচেয়ে আগে অনাথ-কাঁধে ফোভিংসার্ভে-টেবিল। তার বেশ পিছনে প্রিয়নাথ শিকলভরা থলিটা তার ডান কাঁধে, কিন্তু বা আর ডান দুই হাত দিয়েই সেটা চেপে ধরা। ভারের চোটে প্রিয়নাথের মাথা ব্যায়ে হেলে গেছে। তার পেছনে জ্যোৎস্নাবাবু–তার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, হাতেও একটা বোঁচকা। তার নিজের জিনিশপত্র ব্যাগে, আর হাতে লাল সালুতে মোড়া মৌজার একটা অংশ। তার পেছনে সুহাস। দুই হাতই খালি। পেছনে বিনোদবাবু-তার হাতেও ত মৌজাই। সুহাসকে এরা কেউই কিছু নিতে বলে নি, সুহাসও কিছু চায় নি। কারণ সুহাস বুঝে উঠতে পারে না এর মধ্যে কোনটা সে চাইতে পারে। একমাত্র মৌজার দু-একটা খাতা সে নিতে পারত। কিন্তু এরা বস্তাগুলো বেঁধেইছেন এমন করে যে তার কিছু চাওয়ার উপায় থাকে না। কিন্তু সুহাসের নিজের পক্ষে এটা বড় খারাপ লাগে যে বাকি চারজন, বা বলা যায় তিনজন, কারণ জ্যোৎস্নাবাবু ত আর তার পার্টির লোক নন, যখন বেশ ভারী-ভারী মাল বইছে তখন সে একা একেবারে শূন্য হাতে। জ্যোৎস্নাবাবুরও ত কোনো কিছু বইবার কথা নয়। কিন্তু তিনি এই পার্টিতে থাকেন আর প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন বলে তাকে ওটুকু বইতেই হয়। এতে হয়ত তার প্র্যাকটিসেরও সুবিধে।
জ্যোৎস্নাবাবু, আমাকে আপনার কাঁধের ব্যাগটা দিন না-পেছন থেকে সুহাস বলে।
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই যেন জ্যোৎস্নাবাবু বলে ফেলেন, না স্যার, না স্যার, ও ত আমার ব্যাগ।
অগত্যা সুহাসকে চুপ করতে হয়–একবার শুধু পেছনে বিনোদবাবুর দিকে তাকায় দুই হাতে মোটা-মোটা মৌজা নিয়ে হাঁটছেন। সুহাস সেই মৌজার সাইজ দেখেই বোঝে, তার পক্ষে এ ভাবে ঝুলিয়ে নেয়া সম্ভব হত না, কাঁধে দিতে হত। এবং নিজের মৌজা নিজে কাঁধে নিয়ে সার্ভে অফিসার উপস্থিত হলে তাকে আর সার্ভে করতে হবে না!
.
০১৬.
গয়ানাথের হালুয়াগিরি প্র্যাকটিস
হালে বলদ জুতে, মাঠে নামিয়ে বাঘারুর বাইরে থেকে গয়ানাথকে ডেকেছে–হে দেউনিয়া, উঠ কেনে, শাদা হবা ধরিছে হে।
গয়ানাথ উঠে বিছানায় বসে কাশি শুরু করেছে। এই কাশি তুলবে, তারপর খানিকটা হাফাবে, তারপর গয়ানাথ নামবে।
বাঘারু দারিঘরে ঢুকে মাচার পোয়ালের ফাঁকে বিড়ি খোঁজে। পায় না। বেরিয়ে এসে দেখে ভটভটিয়াখান বাইরে এনে রেখে এখন আসিন্দির-জোয়াই (জামাই) দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে। হে জোয়াই, সিগারেট খিলাও একখান। নিজের সিগারেটটায় একটা লম্বা টান দিয়ে আসিন্দির হাত বাড়িয়ে রাঘারুকে দেয়। বাঘারুর সিগারেটটা হাতে ধরে রেখে টেনে-টেনে নিশ্বাস নেয়। সিগারেটের না, আসিন্দিরের গন্ধ। জোয়াইটার গা দিয়া ক্যানং প্যাটরোলের নাখান গন্ধ, আর ঐ বুড়াটার গাঅত কাদাখোচার গন্ধ।
