কিন্তু নরেশ আর অমূল্য অস্থির হয়ে ওঠে। তাদের কাছে এখন বাধে ফিরে যাওয়াটা খুব অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। সেই অনিশ্চয়তার সামনে এখানে এই লোকটির এমন বোবা ও অথর্ব হয়ে বসে থাকাটা অসহ্য ঠেকছে। লোকটাকে এই নৌকোয় তোলার একটা সমস্যা আছে। কিন্তু সে-সমস্যাটা ত পরের কথা। লোকটির সঙ্গে কথাই ত এখনো বলতে পারল না।
হঠাৎ মরীয়া হয়ে অমূল্য আর নরেশ একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠে, কী, শুইনব্যার পারেন না? বোবা কালা?
কাদাখোয়া গাছের ডালটা জড়িয়ে নৌকোর ওপরই বসেছিল–যে-দড়ি দিয়ে নৌকোটা বাধা সেটা স্রোতের একটানে ছিঁড়ে যাবে। নরেশ আর অমূল্য যে-ভাবে নৌকোর মধ্যে টলমল করতে করতে বাঘারুর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে, তাতে বাঘারু বুঝে ফেলে ওরা তার কাছে কিছু একটা চাইছে। সে লাফ দিয়ে দাঁড়ায়, তার কুড়োলটা নিয়ে। সেটা হাতে তুলে বাঘারু চিৎকার করে, নাগিবে?
নৌকোটা দুলে ওঠে। নরেশ আর অমূল্য একটু টাল খায়। তাড়াতাড়ি ঘাড় ফিরিয়ে সেই স্রোতপথ দেখে নেয়, গাছ থেকে আলাদা হয়ে গেলে যেখান দিয়ে তাদের ভেসে যেতে হবে।
নরেশ আর অমূল্য ঘাড় ঘোরাতেই বাঘারু নাইলনের দড়ির বাণ্ডিলটা তুলে ধরে চেঁচায়, নাগিবে? এইখান নাগিবে?
অমূল্যর মাথায় বুদ্ধি এসে যায়। সে দু হাত দিয়ে বোঝায় দড়িটা তাদের চাই। অমূল্যর ইঙ্গিত বুঝতে পেরে বাঘারু তাড়াতড়ি বাণ্ডিলটা থেকে দড়ি খুলতে থাকে। সেই প্রক্রিয়াটা ওদের দেখতে হয়–ঐ জলের ওপর দাঁড়িয়ে বাঘারু তার গলা থেকে পায়ে সোনালি দড়ির স্রোত নামিয়ে দিচ্ছে।
নরেশ বলে–এ কে রে? একেবারে কুড়াল নিয়া, দড়ি নিয়া, আমাগো রেসকু দিব্যার ধইরেছে। বলেই নরেশ আবার চিৎকার করে, হে-এ দাদা, হে-এ দাদা। দুহাতে দড়ি নিয়ে বাঘারু তাকায়। নরেশ হাত তুলে তাকে থামতে বলে। বাঘারু থামে। নরেশ অমূল্যকে বলে, হে-এ অমূইল্যা, বুঝ্যায়া দে, দড়িখান কাটার কাম নাই, ভাসায়্যা দিক, ঐ মাথা ধরা থাকুক। আমরা দড়ি ধরা টাইন্যা ওর বগলে যাই। নয়ত বুঝাবি ক্যামনে যে আমরা অকনিব্যার আইসছি? অমূল্য হাততালি দিয়ে বাঘারুকে ডাকে। তারপর এক হাত বাতাসে তুলে রেখে আর-এক হাত জলে লাগিয়ে তুলে আনে, যেন জল থেকে কিছু তুলে আনল এমন ভঙ্গিতে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে অমূল্য নিজের বুকে দুই হাত দু-তিনবার ছুঁয়ে বাঘারুর দিকে মেলে দেয়। দু তিনবারের পর, আরো দু-তিনবার। অমূল্য বোঝে, সে যদি এই কথাটা বোঝাতে পারে যে ওরাই বাঘারুর কাছে যেতে চাইছে, তা হলে বাঘারু দড়ি ভাসিয়ে দেবে। তাই সে দড়ি ভাসানোর অনুরোধ জানানোর ভঙ্গির আর পুনরাবৃত্তি করে না। অমূল্য যেন নিজেও নিশ্চিত নয় যে এক হাত জলে আর একহাত বাতাসে রেখে সে তার কথা বোঝাতে পারবে কিনা। কিন্তু তার চাইতে এ ভঙ্গিটা অনেক বেশি নিশ্চিত–দুই হাতে নিজের বুক ছুঁয়ে, হাত দুটি বাঘারুর দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই ভঙ্গির দ্বিতীয় কোনো অর্থ হতে পারে না। বাঘারু দু হাতে নাইলনের দড়িটা ঝুলিয়ে অমূল্যর দিকে তাকিয়ে থাকে। সে অর্থটা বুঝতে চায়। বন্যার তিস্তায় কোন ভঙ্গির কী অর্থ তা যেন আগে থাকতেই ঠিক হয়ে থাকে। এমন জলের মধ্যে যদি এমন সাক্ষাৎকার ঘটে যায় তা হলে সেখানে অর্থবিনিময়ে দেরি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তবু যে ঘটছে তার কারণ বাঘারুর আজীবন অর্থবোধহীনতা, এমনকি অন্যের শরীরের ভাষা বোঝার অক্ষমতা, শরীরেরও অক্ষরজ্ঞানহীনতা। বাঘারু তার নিজের শরীর দিয়ে একটার পর একটা এমন কাজ করে যেতে পারে–যার অর্থ, একেবারে নিকট অর্থ, হয়ত তার কাছে ধরা পড়ে, বা, যারা দেখে তাদের কাছে হয়ত একটা দূরার্থও এসে যায়। এই যেমন, বাঘারুকে যখন গয়ানাথ গাছগুলোর সঙ্গে ভেসে যেতে বলেছিল, তখন, বাঘারুর কাছে তার অর্থ ছিল ফ্লাডের জল আর স্রোত আর ভাসমান ঐ চারটি গাছের সঙ্গে নিজের শরীরটাকে জুড়ে দেয়া আর গয়ানাথ আসিন্দিরের কাছে তার অর্থ ছিল জল নেমে গেলেও গাছগুলো নিরাপদ থাকবে। এখন তার এই চারটে গাছের মধ্যে বানানো মাচানটাতে দাঁড়িয়ে বাঘারুর বর্ণপরিচয় ঘটছে, অমূল্যর ইঙ্গিত বুঝতে বুঝতে বর্ণপরিচয় ঘটছে। তাই এ সাক্ষাৎকারে এমন অকারণ দেরি ঘটে যাচ্ছে।
কিন্তু বিকেল আর-বেশিক্ষণ নেই। ঝুপ করে অন্ধকার শুরু হলে এখান থেকে তারা আর ওপারে যেতে পারবে না। বৃষ্টি বাতাস কিছুই কমে নি। তিস্তায় এখনো এত জল আসছে যে তা মাপার মত কোনো দিগন্তও চোখের সামনে নেই। আজ রাতে এখানে গাছের ডালে, বা টিনের চালে, বা এই নৌকায়, বা ঐ মাচানে থাকা যাবে না। সারা রাতের মধ্যে এসব ভেসে যেতে পারে। নরেশ আর অমূল্যর পক্ষে সেটা আরো কঠিনফ্লাড আসার আগে যারা নিরাপদে গাই-গরু-সংসার নিয়ে বাধে উঠেছে, তাদের এখন এই ভরা ফ্লাডের ভেতর নিজের চরের চালে বা নিজের চরের গাছের ডালে রাত কাটাতে হবে? বাঁধের ওপর থেকে এই জেগে থাকা গাছ আর টিনের চালগুলোকে কত আপন লাগছিল তাদের, আর সেই চর-ডুবনো- এই জলরাশির ভেতরে ঐ গাছটাকেই, তাদের নিজেদের, চরের গাছটাকেই, কত অপরিচিত লাগছে। তিস্তার বন্যা যে তাদের সত্যি বসবাসহীন করে দিল–এটা বোঝার জন্যে কি এই বিকেলে কয়েকশ টাকার জন্যে নৌকো ভাসানো তাদের ঠিক হল? নরেশ আর অমূল্য যখন এমনই গৃহকাতর ও অস্থির হয়ে ওঠে তখনই অমূল্যর ভঙ্গির অর্থ বাঘারু বুঝে ফেলতে পারে। সে দড়ি ফেলে দিয়ে দুই হাত আকাশে তুলে তাদের আশ্বস্ত করে–আনছে, আনছে, তাদের এখানে আনছে। বাঘারু একথার পর মাচানটা দেখে, তারপর চালের টিনটা দেখে।
