কিন্তু নরেশ গাছটা জড়িয়ে ধরলেই যে কাদাখোয়া ঝাঁপ দিয়ে জলে পড়ে সেটা এক অদ্ভুত রহস্যনদীর স্রোত আর সেই স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার বহু কালব্যাপ্ত এক অভিজ্ঞতা আর অভ্যাসের ফল, সমবেত অভিজ্ঞতা ও সমবেত অভ্যাসের ফল। অথচ এর পরের কাজটার সমর্থন ছাড়া আগের কাজটা সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে যায়। কাদাখোয়া ঝাঁপ দিলেই নরেশের ঝাপটার একটা অর্থ আসে। সে-অর্থ আসবে কি আসবে না, না-জেনেই নরেশকে ঝাপটা দিতে হয়, তারপর অর্থটা বুঝতে হয়। নরেশ ঝাঁপ দেবে কি দেবে না, সেটা না-জেনেই কাদাখোয়া ঝাপটা দেয়। এমন হতেও পারত যে কাদাখোয়াই আগে ঝাঁপ দিল, নরেশ পরে গাছটা ধরল। কিন্তু এই দুটো কাজ কোনো এক ভাবে গাথা হয়ে যায় এই বিকেলে, এই আসন্ন আকাশের নীচে, এই অঝোর বৃষ্টি আর বাতাসের অভ্যন্তরে। রংধামালির হাটের কাছে যে-পচা পাটের দড়িটা দিয়ে নৌকোটা বাধা থাকে, এই ভরা ফ্লাডে অমূল্য সেই দড়িটা দিয়েই গাছের ডালের সঙ্গে নৌকোটাকে বাধে। তারপর, তারা সকলে বাঘারুকে দেখতে পায়।
বাঘারু তার গাছগুলোর মধ্যে মাচানের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। সে বসেই ছিল–হঠাৎ ঐ চালটার ওপাশে মানুষের এমন ভেসে আসা স্বরে সে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। নরেশ আর অমূল্য তাকে আগেই দেখতে পারত, আর গাছগুলোর পাশ দিয়েই ত কোনা মেরে নৌকোটা ঢুকল। কিন্তু সেই সময় ত নরেশ বা অমূল্যর আর-কিছু দেখার দিকে চোখ ছিল না। বাঘারু যখন দেখে, ওরা তাকে দেখেছে, সে বসে পড়ল। এদের দিকে মুখ করে দুই হাঁটু জড়িয়ে ধরে বসে থাকল।
এখন এই নৌকো আর বাঘারুর গাছের মধ্যে মাত্র কয়েক হাত জল, জল না থাকলে এখানে অশ্বিনী রায়ের বেড়ার পরের খালি জমি। সেই খালি জমি, বাঁশের বেড়া, লাউয়ের মাচা, মটর শাকের ওপর কয়েক মানুষ সমান জলের মাথায় এই নৌকো আর ঐ মাচান। মাটিতে গাছের যে-ডালটা ঘাড় হেলিয়ে দেখতে হত, সেই ডালটাতে হাত লাগিয়ে নরেশ এখন তাকিয়ে বোঝে অশ্বিনী রায়ের চালের কাছে সুপুরি গাছের মাথাটা ঐ লোকটার ঐ মাচানে নামার সিঁড়ির মত। সুপুরি গাছে উঠে ও নেমে এসেছে–আর নরেশরা বাধ থেকে দেখল, নোকটা সুপুরি গাছে উঠল অথচ নামল না।
বাঘারু তার মাচানে বসে বোঝে, এই জায়গাটায় তা হলে আরো অনেকেই এসে পড়বে। এসে পড়ারই কথা। জলভোবা তিস্তায় ত এতগুলো চাল আর গাছ এক জায়গায় পাওয়াই মুশকিল। এখন এই জায়গাটাকে নদীটার মাঝখানেই মনে হচ্ছে বাঘারু জানে না আসলে কতটা মাঝখানে। বাঘারু দেখে–এর তিনজন তোক একটা নৌকো নিয়ে এসেছে কিন্তু কোনো গাছ নিয়ে আসে নি।
তাদের দাঁড়ানো জলের তলার ঘরবাড়ি খেতখামারের ওপর দিয়ে নরেশ চিৎকার করে–আরে, তুমি ঐ চালের উপুর বইস্যা ছিলা? সেই তখন?
কথাটা কী রকম অবান্তর হয়ে যায়। বাঘারু তার গাছগুলোর মধ্যে মাচানে আর এরা তিনজন এই একটা নৌকোয় একটা গাছ জড়িয়ে-মাঝখানে কয়েক হাতের তফাত। কিন্তু এই কয়েক হাতের ওপর দিয়ে জলরাশি বাকি জলস্রোতের মতই তীব্র, ঘোলাটে, ঘূর্ণিময় ও প্রায় ঢেউহীন। মাত্র এই কয়েক হাত জলের দূরত্ব তারা ঘোচাতে পারে না। কিন্তু সেই জলে গাছ ধরে ঝুলে থাকার প্রাণান্তিক ভঙ্গিতে নরেশ এমন কাতর স্বরে এই সামাজিক জিজ্ঞাসা ছাড়া আর-কিছু উচ্চারণ করতে পারে না। ঐ পাড় থেকে নরেশ আর অমূল্য যখন নৌকো নিয়ে ভেসেছে তখন তাদের লক্ষ্য ছিল এখানে এসে কোনো লোক থাকলে তাকে নৌকোতে তুলে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু ঐ নৌকোটা জলে ভাসা মাত্র তাদের সেই লক্ষ্য। তারা ভুলেই যায়। তখন তাদের প্রাণপণ চেষ্টা কোনো রকমে এই সুপুরি গাছ আর টিনের চালের কাছে পৌঁছনো। যখন পৌঁছয়, তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য তারা ভুলেই যায়। বাঘারুকে প্রায় আবিষ্কারের মত দেখে, আবার তাদের সেই কথা মনে পড়ে যায়। তখন ত তারা তিস্তার সেই দিগন্তব্যাপ্ত স্রোতের মুখে একটা কুটোর মত ভাসছে। নরেশের গলা থেকে ঐ অবান্তর সামাজিক জিজ্ঞাসা ছাড়া কিছু বেরয় না।
কিন্তু বাঘারু বোঝেই না কথাটা তাকে বলা হল। সে এদের দিকে তাকিয়ে থাকে। লোকগুলো যখন একটা গাছ ধরতে পেরেছে তখন কোনো একটা ব্যবস্থা করে নেবে। বাঘারু তার দড়ি আর কুড়োলের কথা ভাবে বটে কিন্তু সেটা ওদের কোনো কাজে লাগবে কিনা আন্দাজ করতে পারে না।
নরেশ দেখে, তাদের আবার কোন জলস্রোত ভাঙতে হবে। সে চিৎকার করে বলে, অমূইল্যা, জিগ্যাইবার পারস না?
অমূল্য নৌকোর ওপর থেকে বাঘারুকে ডাকে, শুইনছেন? এই দেউনিয়া, শুইনছেন? বাঘারু ওদের দিকেই তাকিয়ে, দেখেও যে ওরা কিছু বলছে, কিন্তু কোনো জবাব দেয় না। সে বুঝতেই পারে না, ওরা তাকে ডাকাডাকি করছে! অমূল্য এবার একহাতের আঁজলায় নদীর জল তুলে বাঘারুর দিকে ঘেঁড়ে। সে জল বৃষ্টির সঙ্গে মিশে তাদের গায়েই পড়ে।
আরে, বোবা নাকি? ফিইরতে হব না? নরেশ বাঘারুর দিক থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে সেই ফেরার অনিশ্চয়তাটা একবার মাপে। লোকটাকে নৌকোতে তুলে সেই স্রোতের মুখে আবার নৌকোটা ছাড়তে হবে।
অমূল্য লগিটা নিয়ে বাঘারু ও তাদের মাঝখানে যে-জল তাতে মারে। একটু জল ছিটকোয় বটে, লগিটা স্রোতের এক ধাক্কায় অমূল্যর পেছনে চলে যায়। অমূল্য লগিটা তুলে আনে।
বাঘারু বুঝে উঠতে পারে না–এরা তিনজন কী করছে। তোকগুলি এসে গাছটা জড়িয়ে ধরার পর সেই অবস্থাতেই আছে। গাছের ওপরও উঠছে না, গাছটাতে তেমন করে দড়িও বাধছে না। হাঁপি গেইছে, জিরাবার ধরিসে! এরকমই ভেবে নিয়েছিল বাঘারু। তারপর, ওদের জল ছিটনো, জলে বাশ মারা এগুলোর কোনো অর্থ তৈরি করতে পারে না। কিন্তু তার জীবনে, বা দৈনন্দিনেই যে কাজের সঙ্গে তার শরীরের সম্পর্ক তৈরি হয় নি, সে কাজের কোনো অর্থ তার কাছে তৈরি হয় না। বোঝার চেষ্টা না করার মধ্যে তার কোনো সিদ্ধান্ত নেই। শরীর ছাড়া সে কী দিয়ে বুঝবে? এমন কি, যেখানে তার শরীর থাকেও সেখানেও অনেক কিছু তার বোঝার বাইরে চলে যায়।
