বাঁধের মুখোমুখি এসে নৌকোটা প্রায় বেঁকে যায়, অর্থাৎ স্রোতের অনুকূলে তার মাথা ও লেজ না থেকে, স্রোতের প্রায় আড়াআড়ি হয়ে যায়। এটা যদি ঠেকাতে না পারে, তা হলে নৌকোটা দুটো-একটা পাক খেয়ে স্রোতের ধাক্কায় কাত হয়ে যাবে।
কাদাখোয়া একবার ডাইনে একবার বায়ে মেরেও মেরেও নৌকোটিকে আর এটুকু সোজাও রাখতে পারে না, এদিকে অশ্বিনী রায়ের গুয়াবাড়ি প্রায় পার হয়ে যায়-যায়। হঠাৎ কাদাখোয়া বায়ে লগিমারা বন্ধ করে ডাইনেই পরপর তিনবার লগি মারে। সে লগিমারা যেন জলের মধ্যে বর্শা বেনো আর তোলা। নৌকোটা মুহূর্তের মধ্যে পাক খেয়ে যায়। বাধ থেকে একটা সমবেত আওয়াজ ওঠে, গেইল, গেই। কিন্তু ততক্ষণে নরেশ আর অমূল্যর মুখ চরের দিক থেকে বাঁধের দিকে ঘুরে আসতে থাকে আর কাদাখোয়া নৌকোর মাথায় চলে যায়। কাদাখোয়া নৌকোর দু-দিকে পা দিয়ে, যেন মাটি খুঁড়ছে, বা কোদাল মারছে এমন ভঙ্গিতে সেই লগি দু হাতে তুলে জলে বিদ্ধ করতে থাকে। জলে পড়তে না-পড়তে লগি কাত হয়ে যায়। কাত হতে না-হতেই লগি তুলে এনে আবার জলে বিধিয়ে দেয় কাদাখোয়া। নৌকোটা কোনাকুনি চরের দিকে ধেয়ে যায়–ঐ একখান সোঁতা পাইছে, পাইছে। ওখানে কোনো স্রোত চরের দিকেই যাচ্ছে। সেই স্রোতের বেগ ত চরের ওপর দিয়ে গেলেও কিছু কম নয়। কিন্তু ওরা নদীটা পার হয়ে চরে পৌঁছে গেছে। এখন চরে নৌকোটাকে আটকাতে পারবে কি না সেটা অন্য ব্যাপার। নৌকোটা ততক্ষণে অশ্বিনী রায়ের গুয়াবাড়ি ছাড়িয়ে সোজা দক্ষিণের স্রোতের দিকে যাচ্ছে। মাঝে-মাঝে জেগে থাকা এক-একটা চালের আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।
এই, এই, এই, আটকিছে, আটকিছে, বাধে একটা সাড়া পড়ে যায়।
কী হল, কী হল? বলে অফিসার দু-পাশে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে। কেউই জবাব দেয় না।
অফিসার, তাড়াতাড়ি বাধ বেয়ে নীচে নামতে শুরু করে। তার সঙ্গে সঙ্গে রঘু ঘোষ, তার বৌ, ভাগ্নী, অফিসবাবুর বড় শালী, গুদামবাবু, হাটের লোকজনও নামতে থাকে। নামতে নামতেই লিলি জিজ্ঞাসা করে, কী, নৌকোটা উল্টে গেছে?
গোপা বলে, বাবা, গেল কী করে? এখন ফিরবে, না ওখানেই থাকবে?
লিলি বলে, ওখানে কি ওদের জন্যে বাগানের ইনস্পেশকশন বাংলো বানিয়ে রেখেছে নাকি?
জলের ধারে পৌঁছে ওরা পেছনে পড়ে যায়। ওদের দিকে কেউ তাকায় না। অফিসার পেছন থেকে এমন কাউকে খোঁজে যার সঙ্গে আগে কথা বলেছে। কিন্তু তেমন কাউকে না পেয়ে সে একজনের জামা ধরে টানে। সে ঘাড় ঝাঁকিয়ে জামাটা ছাড়িয়ে নেয়। কিন্তু অফিসার আবার তার জামাটা টেনে ডাকে, শুনুত ত অফিসারের গলা শুনে লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই অফিসার জিজ্ঞাসা করে, কী? হলটা কী? নৌকোটি কি পৌঁছেছে?
হয়, হয়, আটকি গেছে, আটকি গেছে, বলে লোকটি আবার নদীর দিকে মুখ করে।
পেছন থেকে জগদীশ বারুই এসে অফিসারকে বলে, কী? দেখসেন? পৌঁছায়্যা গিছে?
অফিসার নদীর দিকে পেছন ফিরে জগদীশকে জিজ্ঞাসা করে, কী ব্যাপার? নৌকোটা উল্টেটুপ্টে যায় নি ত?
জগদীশ চিৎকার করে বলে ওঠ, উন্ট্যাবে ক্যান? কাদাখোগারে কন না, ঐ নৌকা নিয়া কাশিয়াবাড়ি চইল্যা যাবে। আর আমাগো নরেইশ্যা আর অমূল্যরও জোর আছে। জগদীশের ভঙ্গিতে একটা অধিকারের ভাব আসে যেন নরেশ, অমূল্য আর কাদাখোয়ার এই রকমের সাফল্যের পেছনে তারই প্রধান ভূমিকা।
অফিসার একটু অসহায় ভাবে বলে, এখন ফিরবে কখন?
জগদীশ খুব নিশ্চিত স্বরে বলে, ক্যান? এহনই? দেরি করব ক্যান?
.
১৪৩. নৃত্যভাষায় সংলাপ
অশ্বিনী রায়ের চালের বা সুপুরি গাছের কাছে নৌকোটা ভেড়ে না, সেগুলোকে বায়ে রেখে নৌকোটা কোনাকুনি চরের মধ্যে ঢুকে গিয়ে একটা গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায় প্রায়। নরেশ গাছটাকে জড়িয়ে ধরলে নৌকো হঠাৎ টাল খেয়ে গাছটাকে ঘুরে স্রোতের মুখে চলে যায়। নরেশকে গাছ আর নৌকোর মাঝখানে ঝুলতে হয় কিন্তু ততক্ষণে কাদাখোয়া এক হাতে নৌকোটাকে আর-এক হাতে গাছটাকে ধরে জলে ঝাঁপ দিয়েছে। তাতেই নৌকোটা গাছের সঙ্গে সেঁটে যায়।
সমস্ত ঘটনাটা ঘটে যেন একেবারে সময়ের ছন্দে। বন্যার তিস্তার স্রোতে ভেসে এই গাছে এসে নৌকো লাগানোটা যেন অমূল্য, নরেশ আর কাদাখোয়র, প্রতিদিনের ফেরি পারাপারের মত দৈনন্দিন কাজ, যেন তাদের জানাই আছে স্রোতটার কোন জায়গায় এক দিক থেকে লগি তুলে নিলে নৌকোটা পাক খেয়েও ডুববে না, না-ডুবে সোজা এই চরের দিকে চলে আসবে, এবং অশ্বিনী রায়ের চালটাকে বায়ে রেখে কোনাকুনি এই গাছটাতে পৌঁছুবে।
আসলে ত এই নদীর, এই বন্যার এই স্রোতের সামান্য এক আঙুল জায়গাও তাদের চেনা বা জানা নয়। বন্যার জল কখন আসবে সেই হিশেবনিকেশ করে যাদের বাড়িঘর ও দাঁড়ানো ফসল ছেড়ে বাধে উঠে আসতে হয়েছে এবং সে-জল তাদের চোখের সামনে প্রতি মুহূর্তেই প্রায় সম্পূর্ণ অপরিচিত হয়ে উঠতে উঠতে বসবাসের চরে তাদের ফিরে যাওয়াটাই অনিশ্চিত করে তুলেছে–তারা কী করে আগে থাকতে জানতে পারবে এই দিনরাত রাতদিন ধরে বয়ে আসা জলস্রোত কোথায় কোন মোড় নিচ্ছে। তবু যে তারা একটা আধভাঙা নৌকো নিয়েও এই এমন স্রোতে এমন অনায়াসে ভেসে পড়তে পারে, তার কারণ এইটুকু স্থির বিশ্বাস যে খালি হাতপায়ে ভেসে গেলেও তারা শরীর নিয়ে কোথাও না কোথাও গিয়ে ঠেকে যেতে পারবে, জলে ডুবে মরবে না। নিজের ওপর এই বিশ্বাসটা স্থির–যতটা স্থির হওয়া সম্ভব। আবার, এই নদীর এখনকার অনিশ্চয়তাও সেরকমই স্থির। জলে ভেসে যাবার পর কিন্তু অমূল্য, নরেশ আর কাদাখোয়া তিনজনেরই একটা মাত্র ভয় মনের ভেতরে কাজ করে, যদি নৌকো উল্টে যায় তবে তারা এই জলের সঙ্গে ভেসে আর বেঁচে থাকতে পারবে না। কিন্তু তবু যে মৃত্যুভয়ে তারা অস্থির হয়ে ওঠে না–গায়ে আগুন লাগলে যেমন অস্থির হয়ে ছোটাছুটি করে ফেলে সবাই তার কারণ, তারা ত দেখেশুনে ভেবেচিন্তেই নৌকোটা ছেড়েছে, স্রোতটা কত খর বেগে বইছে তার একটা হিশেবও তাদের জানা আর স্রোতে কী ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে সেটাও তাদের আন্দাজ ছিল। তাই ঐটুকু প্রস্তুতি তাদের সামাল দেয়। কখনো একটা পায়ের ঝোঁকে, কখনো একটা হাতের চাপে নৌকোর টালমাটাল সামলাতে-সামলাতে তারা চরটাতে এসে যায়। নরেশ যে গাছটা জড়িয়ে ধরবে তা সে পূর্ব মুহূর্তেও জানত না, আর নরেশ গাছটা জড়িয়ে ধরলেই যে কাদাখোয়া গাছটা ধরে জলে ঝাঁপ দেবে তাও ঠিক ছিল না। এসব ত আর সেরকম ভাবে ঠিক থাকতে পারে না। এমন হতেই পারত যে নরেশ গাছের ডাল ধরে ঝুলে থাকল আর নৌকো তার পায়ের তলা থেকেও সরে গেল। তা হলে, নৌকো আর নরেশের পায়ের তলায় ফিরিয়ে আনা কারো পক্ষেই সম্ভব হত না। নরেশকে তা হলে ঐ গাছের ওপর উঠে বসে থাকতে হত।
