কাদাখোয়া এই এত ভিড় দেখে না, এই এত হাওয়াবৃষ্টি দেখে না, নদীর এই এত জল দেখে না। সে যেন ঘুমতে-ঘুমতেই হেঁটে চলে গেল এমনই তার ভঙ্গি। বাঁধের ওপর থেকে নীচে লাফিয়ে লাফিয়ে নামার ফলে তার গা থেকে পাথরের কুচি ঝরে যায় কিছু-কিছু, সব নয়।
রংধামালি হাটের কোথায় নৌকাটা থাকে সেটা সবাইই জানে। নৌকোর একটা মালিকও আছে বটে কিন্তু সাধারণ সময়ে নৌকোটা চরের লোকজন তরি-তরকারির বোঝা হাটে নিয়ে আসার জন্যেই ব্যবহার করে। ঠিক খেয়া না হলেও হাটের দিন খেয়ার মতই নৌকোটা ব্যবহার করা হয়। চরের যারা নৌকোটা ব্যবহার করে তারা হাটের দিন মালিককে কিছু পয়সা ধরে দেয়। নৌকোর মালিকের একটা ছোট মনোহারী দোকান আছে। নৌকোর দেখাশোনা, ছোটখাট মেরামত চরের লোকেরাই করে নেয়। কাদাখোয়া ঘুমের মধ্যেই নৌকা শুনে জেগে উঠে কোথায় যেতে হবে তা বুঝে যায়।
তেমনি বুঝে যায় বাঁধের লোকজনও। চরের মানুষরা ত বটেই, হাট ও বাগানের মানুষও। তারা জানে নৌকোটা কোথায় বাধা আছে–এখান থেকে উত্তরে বাধটা যেখানে বাঁয়ে ঘুরেছে সেই কোণটাতে। অফিসার গাড়ি নিয়ে নরেশ-অমূল্যকে ঐ বাকটায় নামিয়ে দেবে আর কাদাখোয়া এদিক দিয়ে ঐ বাকটাতে গিয়ে পৌঁছুবে।
কিন্তু নৌকোটা ছাড়তে একটু প্রস্তুতির সময় লাগবে–এটাও বধের লোকজন জানে। এমনিতেই ভাঙাচোরা নৌকো-ঐটুকু জল পার হতেই নড়বড় করে। তার ওপর বৈঠা হিশেবে একটা বাঁশের সঙ্গে পেরেক সাঁটা একটা চওড়া কাঠ, থাকতে পারে, নাও পারে। এই ফ্লাডের জলে নৌকো ভাসানোর আগে, হাতুড়ি পাওয়া না যাক, অন্তত পাথর দিয়ে দুটো-একটা জায়গা ঠুকে নিতে হবে। আর, যেকজন যাবে, তিনজন ত হল, তাদের প্রত্যেকের হাতেই লম্বা লগি চাই, লগি ছাড়া এই জলের স্রোতে নৌকো সামলানো যাবে না। ভাল নৌকোই সামলানো যায় না, আর এ নৌকোর কথা কে বলবে?
বাঁধের লোজন নদীর দিকে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। উল্টোদিকে অফিসারের জিপ থামার আওয়াজ পাওয়া যায়। তখন আবার কেউ-কেউ উল্টো দিকে যায়। ততক্ষণে অফিসারই উঠে এসেছে।
.
১৪২. অপারেশন বাঘারু
বাঁধের ওপর উঠে এসে সোজা নদীর দিকে মুখ করে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে অফিসার বলে, এখুনি ছেড়ে দেবে। তারপর বাঁ দিকে তাকায়–নৌকোটা যেদিক দিয়ে আসবে। তার দেখাদেখি অন্যরাও বা দিকে তাকায়।
এখন নৌকোটার আসাই প্রধান ব্যাপার। তাই বাঁধের ভিড়টা কিছুটা উত্তর দিকেও ছড়িয়ে পড়ে–সেখানে যে-দুটো-চারটে গরু বাধা ছিল সেগুলোকেও ছাড়িয়ে। আর, জিনিশপত্র পাজা করে যেখানে চরের লোকজন সংসার পেতেছে–মেয়েরা সেখানেই দাঁড়িয়ে গেছে।
অফিসার একটু ডাইনোয়ে তাকিয়ে বলে, নৌকোর যে কনডিশন দেখলাম, যেতে পারবে ত?
অফিসার বোধ হয় কোনো একটা উত্তর প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু উত্তর না পেয়ে সে আবারও ডাইনে বায়ে তাকায়। আবার, বা দিকে নৌকোর প্রবেশপথের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে নিয়ে অফিসার একটু ঘুরে কাউকে খোঁজে। তারপর নদীর দিকে পেছন ফিরেই ঘোরে, আরে, সেপাই দুটো গেল কোথায়? অফিসার যখন সেপাই দুটোর খোঁজে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে তখনই বাঁধের মানুষজনের মধ্যে চাপা আওয়াজটা বাতাসের বিপরীতে খেলে যায়–আইসছে, আইসছে। প্রথম দেখতে পেয়েছিল–যারা বাঁধের উত্তরদিকটাতে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার পরে যারা ছিল তারা দেখবার জন্যে হুড়মুড় করে এগিয়ে যেতে-যেতে বাঁধের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে যেতে থাকে ততক্ষণে নৌকোটা একটা টুকরো কাঠের মত স্রোতের মুখে এই বাঁধের লোকজনের মুখোমুখি এসে পড়েছে। বাঁধের বাকি অংশ থেকেও সবাই হুড়মুড় করে নীচে জলের একেবারে কিনারায় নেমে যায় বাঁধের ওপর থাকে অফিসার, রঘু ঘোষ, লিলি, গোপা, অফিসবাবুর বড় শালী, গুদামবাবু, হাটের কেউ-কেউ। বানভাসিদের দিকেও দু-একজন বয়স্কা আর নীচে নামেনি। গরুগুলি কী রকম বুঝতে পারে নদীতে কিছু ঘটছে, তারা নদীর দিকে মুখ করে গলা বাড়িয়ে দেয়। একটা গরুর গলায় দড়ি পেঁচিয়ে যায়। স্রোতের ধাক্কায় নৌকোটা স্রোতের মুখে বেঁকে গেছে। পাড় থেকে মনে হচ্ছে যে-কোন সময় ঐ দিক দিয়ে উল্টে যেতে পারে। কিন্তু নরেশ, অমূল্য আর কাদাখোয়া সেদিকে তাকাতেও পারছে না। নৌকোটা আর সোজা নেই, বেঁকে গেছে। এটাই নৌকোর পক্ষে বিপদ-সোজা না-থাকলেই নৌকো ডোবে। স্রোতের সঙ্গে ভেসে যেতে-যেতেই নরেশ, অমূল্য আর কাদাখোয়া তাদের সমবেত শক্তিতে নৌকোটাকে সোজা করার জন্যে জলের ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে–নৌকোর ওপর দাঁড়িয়ে থেকে যতটা হুমড়ি খাওয়া সম্ভব। নৌকোর মাথার দিকে একটু আগুপিছু দাঁড়িয়ে নরেশ আর অমূল্য লগি মারছে আর তুলছে, মারছে আর তুলছে। তারা স্রোতের বিপরীতে লগি মারছে যাতে স্রোতের মুখে নৌকোর গতি বাধা পায়। কাদাখোয়া নৌকোর পেছন দিকে দাঁড়িয়ে স্রোতের দিকে মুখ করে সেই একই কাজ করছে। কিন্তু তাকে একা দুজনের কাজ করতে হচ্ছে–সে লগিটা তুলে একবার ডাইনে মারছে, একবার বায়ে মারছে। তিনজনেরই কাজ নৌকোটাকে স্রোতের বিপরীতে রাখা। আর সেই চেষ্টার ফলেই নৌকোটা স্রোতে ভেসে যায় না, কিছুটা এদের লগির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণটা আসে এরকম স্রোতের মুখে বেশ কিছুটা গেলে। স্রোতের মুখে নৌকোটা ছেড়ে দেয়ার পর প্রথম কাজ নৌকোটা সোজা রাখা। সোজা রাখতে পারলে কিছুক্ষণের মধ্যেই এই লগিফেলা-লগিতোলার মধ্যে একটা ছন্দ তৈরি হয়। তখন এমন স্রোতের মুখেও নৌকোটা আর ডোবে না। কিন্তু এখানে সেই সময়টা নিতে গেলে ঐ চর ছাড়িয়ে নৌকো চলে যাবে। তখন নৌকো ফেরানো অসম্ভব। বাধ থেকে ঐ চরের দূরত্বটা এখন জলে-জলে এতই কম যে কোনো রকমে নৌকোটাকে ঠেলে একটু সরিয়ে নিতে পারলেই নৌকোটা চরের কোনো চালে বা গাছে ঠেকে যাবে। কিন্তু এই স্রোতের বেগ ঠেলে সেই সামান্য সরিয়ে নেয়াটুকুও সম্ভব নয় যেন।
