ঐ হাওয়ায় নরেশের কথা বধের ওপরে পৌঁছেছিল কি তা বোঝা যায় না। যদিও নরেশ যেখান থেকে কথাটা বলেছে সেখানে বাতাস প্রায় ছিলই না বাধে ঠেকে গিয়েছে।..কিন্তু বাঁধের ওপর ত বাতাস একই রকম। ততক্ষণে বালিশ বাঁধের ওপর উঠে ঘোষণা করে দিয়েছে–নৌকো ভাসবে, কাদাখোয়াকে পাঠাতে বলেছে।
কাদাখোয়া, অশ্বিনী রায় জোতদারের মানষি, চরের সবচেয়ে ওস্তাদ মাঝি।
৪.৩ কাদাখোয়ার নিদ্রাভঙ্গ
অফিসারের জিপগাড়ি নরেশ-অমূল্যকে নিয়ে চলে যাওয়ার পর অশ্বিনী রায় কাদাখোয়াকে গিয়ে ডাকে–হে বাউ। কাদাখোয়া অশ্বিনী রায়ের গরুগুলো যে-খুঁটিতে বাধা, তার নীচে বাঁধের পশ্চিম ঢালুতে শুয়েছিল। সেদিকে বোল্ডারের মধ্যে একটা সমতল জায়গা সে খুঁজে বের করেছিল। তারা সারা শরীরে শুধু একটা নেংটি পরনে, আর একটা গামছা, মাথার ওর ঢাকনির মত দেয়া। বাঁধের জন্যে হাওয়াটা এখানে অত জোরে বইছে না বলে কাদাখোয়র উপুড় করা মাথার ওপর থেকে ওটা উড়ে যায় নি। কাদাখোয়া অবিশ্যি গামছাটা দিয়ে গলা পর্যন্ত মাথাটা এমন করে জড়িয়ে রেখেছে যে গামছাটা উড়ে যাওয়া সম্ভবও ছিল না। তার সারাটা শরীর এমন উলঙ্গ যে মাঝখানের নেংটিটুকুও চামড়ার সঙ্গে মিশে থাকে। মানুষের যেখানে কাপড়ের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেখানে কাদাখোয়ার কোনো কাপড়ের রকার নেই। আর, যেখানে মানুষের কাপড়ের কোনো দরকার নেই, সেই মাথাটাকেই কাদাখোয়া গামছা দিয়ে ঢেকে প্রায় বেঁধে রেখেছে এমন করে যে চট করে দেখলে তাকে মানুষ মনে নাও হতে পারে। বন্যার সময় বাঁধের ওপর ওরকম কাঠ, গাছ কত পড়ে থাকে।
অশ্বিনী রায়ের গলার স্বর নিচুতে। বাঁধের ওপর থেকে তার ডাক কাদাখোয়া শুনতেই পায় না। অশ্বিনী রায় তখন বসে বসে বাঁধের একটা বোল্ডার থেকে আর-একটা বোল্ডারে পা দিয়ে দিয়ে নামে আর ডাকে, হে বাউ, বাউগে-এ। কাদাখোয়া তাও শোনে না। ততক্ষণে অশ্বিনী কাদাখোয়র কাছে পৌঁছে গেছে। গিয়ে বোঝে কাদাখোয়া ঘুমুচ্ছে। গামছায় মোড়া তার মুখের ভেতর থেকে আওয়াজ বেরচ্ছে। অশ্বিনী আরো একটু এগিয়ে কাদাখোয়ার মাথাটা ধরেই মৃদু ঝাঁকায়–হে বা, বাউ গে–ডাকতে-ডাকতে।
বাঁধের ওপর থেকে জগদীশ বারুই চেঁচায়–বোল্ডার দিয়্যা মারো মাথায়, ঐডা ত মরার নাখান ঘুমায়, ধাক্কা দ্যাও, ধাক্কা।
অশ্বিনী রায়ের মুখোচোখে সব সময়ই একটু অসহায়তার ভাব। সে জগদীশের দিকে তাকায়–যেন জগদীশের কথা না শুনলে জগদীশ রাগ করবে। তারপর আর-একটু এগিয়ে দুই হাতে কাদাখোয়ার পাথরের মত চওড়া পিঠটা ধরে নাড়ায় হে বাউ, বাউ গে-এ।
কাদাখোয়ার অত বড় পিঠ অশ্বিনী রায় তার ঐটুকুটুকু হাতে নাড়াতে পারে না। কিন্তু কাদাখোয়া যে জেগে উঠেছে তা বোঝা যায় তার হাতদুটো গুটিয়ে আনায়। এতে অশ্বিনী রায় গলা আর-একটু তুলে ডাকে–হে বাউ, বাউ গে-এ।
এবার কাদাখোয়া তার গোটা শরীরটাকে চিৎ করে। এক জায়গাতেই নয়–সে গড়িয়ে চিৎ হয়। ফলে বোল্ডারের ওপর যে-ছোট-ছোট গাছগাছালি ছিল সেগুলো তার বুকের ওপর লেগে থাকে, লেগে থাকে কুচিকুচি পাথরও। এখন, তার মাথাটা বোল্ডার থেকে সরে গিয়ে একটা ফাঁকের মধ্যে পড়ে পেছনে হেলে যায়-গলাটা টান-টান হয়ে থাকে। পা দুটো ফাঁকই থাকে। দেখে, কোনো জীবন্ত মানুষ মনে হয় না।
বাঁধের ওপর তখন একটা লাইনই হয়ে গেছে। রঘু ঘোষ চেঁচায়–আরে মাথায় জল ঢালেন, জল ঢালেন।
রঘু ঘোষের ভাগ্নী গোপা জিজ্ঞাসা করে–কী? নেশা করেছে নাকি?
রঘু ঘোষের বউ লিলি বলে–কোথায় টিভির নৌকা দেখব, তা না ঐ মিঠুন চক্রবর্তীকে দেখতে হচ্ছে। বলেই খিলখিল হেসে উঠতেই রঘু ঘোষও হেসে ফেলে বলে, মিঠুন চক্রবর্তী ও রকম নেংটি পরে নাকি?
এমন টাইট প্যান্ট পরে যে নেংটির মতই, বলে লিলি আর-এক দফা হাসে।
তোমার কাদাখোয়র জাগরণ ত কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ। খোয়া দ্যাও, খোয়া দ্যাও, নয় ত জাইগবে না, জগদীশ ওপর থেকে বলে।
আরো একবার তাকে ডাকার জন্যে অশ্বিনী হাত বাড়াতেই কাদাখোয়া দু হাত মুখের কাছে টেনে আনে। অশ্বিনী হাত সরিয়ে ডাকে, এই কাদাখোয়া, ঝট করি উঠ কেনে, ঝট করি উঠ, নৌকা ভাসিবার নাগিবে।
কাদাখোয়া উঠে বসে। সে যেভাবে গামছাটা মাথায় জড়িয়েছিল সেটা তার চিৎ হওয়ায় পাক খেয়ে গেছে। সে খুলতে পারে না। গামছায় জড়ানো মুখটা নিয়েই উঠে বসে। বসেও দু হাতে গামছার কোণটা পায় না। তখন গামছায় জড়ানো মুখটা নিয়েই উঠে দাঁড়ায় আর হাত দিয়ে গামছার কোনা খোঁজে। না পেয়ে, সে বাঁধের ওপরে উঠবার জন্যে গামছায় জড়ানো মুখ নিয়েই পা ফেলে। শেষে, গামছার কোনা না-পেয়ে গলার কাছ থেকে গামছাটা টেনে ওপরে তোলে। গামছার ভেতর থেকে তার ঠোঁটটা বেরয় কিন্তু গামছাটা নাকে আটকে যায়। অবশেষে বাঁধের ওপর উঠে একটা টান দিতেই গামছাটা খুলে যায়। গামছাটা হাতে নিয়ে সে মুখটা মোছে। তারপর অশ্বিনী রায়কে খোঁজে।
অশ্বিনী রায় তখনো বাঁধের ওপর উঠতে পারে নি। কিন্তু কাদাখোয়া গামছা খুলে ফেলতে পেরেছে দেখে চিৎকার করে বলে, হাটের বগলত চলি যা, নরেশুয়া আছে, নৌকা ভাসিবার লাগিবে।
কাদাখোয়া গামছাটা দিয়ে মুখটা আর-একবার ডলতে-ডলতে বাঁধের ঐ ভিড়ের মধ্যে দিয়ে বাঁধের পুব দিকের ঢালের বোল্ডারের ওপর লম্বা লম্বা পা ফেলে কোনাকুনি জলের দিকে নেমে যায়, তারপর জলনিকাশী নালীটা এক লাফে ডিঙিয়ে জালঘেরা বোল্ডারের ওপর পড়ে বাক নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।
