কিন্তু নরেশ-অমূল্য যেভাবে তার দিকে ছুটে আসছে, তাতে সে একটু ভয়ও পায়। বেশির ভাগ লোক বাঁধের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে দেখে আবার একটু ভরসাও পায়–এরা নিশ্চয়ই তাকে কিছু করবে না। তার ত কোনো দোষ নেই। এরা প্রায় দেড়-দু হাজার টাকা চেয়ে বসেছে, পঁচশ টাকার বেশি খরচ করার ক্ষমতাই তার নেই। কিন্তু তার বোধহয় এরকম আচমকা চলে আসাটিও ঠিক হয় নি। এখন যদি এরা এসে তাকে ধরে নিয়ে যায় সেটা আরো খারাপ হবে, সে আর এখান থেকে ফিরতেই পারবে না। অফিসার আবার জিপের দিকে হাঁটতে শুরু করে–এবার একটু আস্তে-আস্তে।
জিপের কাছে পৌঁছুবার আগেই নরেশ-অমূল্য, আর তাদের সঙ্গে যারা দৌড়চ্ছিল তারা, তার পেছনে এসে পড়ে। অফিসার দাঁড়ায় না, ঘাড়ও ঘোরায় না। নরেশ-অমূল্য তার কাছাকাছি পৌঁছে পেছনে-পেছনে হাঁটে আর জোরে-জোরে শ্বাস ফেলে কিন্তু কিছু বলে না।
অফিসার জিপের ড্রাইভারকে গাড়ি ঘোরাও, ঐদিক দিয়ে রায়পুর যাব, বলে গাড়ি ঘোরানোর জন্যে অপেক্ষা করে।
তখন নরেশ বলে, আপনি কি চইল্যা য্যান নাকি?
তাদের দিকে মুখ না ঘুরিয়ে অফিসার বলে, শুনলেই ত কী বললাম?
তা ঐ লোকটার রেসকুর কী হবে নে?
ওখানে ত কোনো লোক দেখলাম না। তোমরা বলছ লোক আছে। বললাম, লোক দাও, নৌকো দাও, টাকা দেব, তোমরা ভাবলে এই সুযোগে পঁহ্যাঁও মারবে। তা এসব ত আমি ঠিক করতে পারব না। আমি কন্ট্রোল রুমে জানাব। তারা যা করতে বলে, তাই করব।
নরেশ বা অমূল্য অফিসারের সঙ্গে এসব নিয়ে যুক্তি দিয়ে কথা বলার লোক না। তা ছাড়া বানভাসি সবাই যদি তাদের সঙ্গে আসত, তারা একটা চিৎকার-চেঁচামেচি তুলতে পারত। আবার, একথাও ঠিক যে তারা পঁও মারার মতই টাকা চেয়েছে। ফলে, অফিসারকে ধরার জন্যে তাদের এতটা ছুটে আসাটা কেমন তাদের নিজেদের কাছেই অনর্থক ঠেকে। জিপ গাড়িটা ঘুরে অফিসারের সামনে দাঁড়ায়। অফিসার ড্রাইভারের পাশে উঠে বসলে নরেশ এটুকুই একটু জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করে, আপনি কি ফিরা আইসবেন, না, বাগান থিক্যাই ফিরা যাবেন শহরে?
অফিসার বলে, দেখো ভাই, আমার ক্ষমতা পঁচশ টাকা খরচ করার। তোমরা যদি তার মধ্যে করতে পারতে তা হলে আমি এখনি করে দিতাম। আমি এখন কন্ট্রোলে ফোন করব। এখন তা আর কন্ট্রোল থেকে খবর দিয়ে আর্মির নৌকো পাঠানো যাবে না। যদি হয় তাও কাল দুপুরের আগে না। তা ছাড়া কাউকে ত দেখাই যাচ্ছে না। রেসূক করবে কাকে? যাক গে। অত কথায় কাজ নেই। আমি ফোন করে তোমাদের এখানে ফিরে আসব। কন্ট্রোল আমাকে কী বলল, সেটা তোমাদের জানিয়ে চলে যাব। আমার আর-কিছু করার নেই। চলো।
ড্রাইভার গাড়িটা চালানো শুরু করতেই নরেশ বলে ওঠে, খাড়ান, খাড়ান। ড্রাইভার গাড়ি থামায়। নরেশ এগিয়ে এসে বলে, শুনেন স্যার। এই নদীর মইধ্যে আপনার মিলিটারিও নামার সাহস পাবেনে না। জলের একখান এমন-অমন ধাক্কা যদি লাইগ্যা যায়, তাহলি নৌকা উল্টায়্যা যাবে। আপনারও আর কষ্ট কইর্যা ফোন করার কাম নাই–ঐটা এক হাজার কইর্যা দ্যান নৌকার ভাড়া ধইর্যা, আমরা এহনি নৌকা ভাসাই।
তোমরা এখনি যাবে? নৌকো কাছাকাছি আছে?
হ্যাঁ। ঐ রংধামালি হাটের বগলে
তা হলে শোনো–আমি তোমাদের সাড়ে সাতশ টাকা দিতে পারি। কিন্তু এখন পঁচশ, কাল আমাদের অফিসে গিয়ে বাকি আড়াইশ আনতে হবে। আমাদের একটা ঘটনার জন্যে একবারে পাঁচশ টাকার বেশি খরচ করায় আইন নেই। আড়াইশ কাল তোমাদের দেব।
নরেশ হেসে-হেসে মাথা চুলকোর্তে-চুলকোতে বলে, কাইল আর-একডা রেসকু যখন বানাইবেনই ত সেডারেও পাঁচশ টাকার রেসকু দ্যান স্যার। বাড়িঘর জমিজমা ত সব দেইখলেন, ভাইস্যা গেল।
এবার অফিসার সস্নেহ ধমক দেয়, ওঠো ত গাড়িতে, এরপর আর তোমার নৌকো ভাসানোরও টাইম থাকবে না। ওঠো। চলো, নৌকা কোথায়, সেখানে যাব। আর কাকে কাকে নেবে, নিয়ে যাও। গাড়ি ঘোরাও।
নরেশ একবার তাদের পেছনের ভিড়টার দিকে তাকায়। তারপর এই বালিশ, শোন, বলে একটা। ছেলেকে ডাকে, দৌড়ায়্যা যা, অশ্বিনী কাকারে কবি অর মানষিডারে হাটের বগলে পাঠাইতে। নরেশ গিয়ে জিপের পেছনে ওঠে। অমূল্য যখন ঢুকছে তখন বালিশ পেছন থেকে বলে, মোক গাড়ি নিগাও কেনে।
নরেশ ধমকে ওঠে, কইল্যাম দৌড়ায়্যা যা।
আরে নাও না ওকে তুলে। তারপর কাকে নেবে তাকেও গাড়িতেই তুলে নাও, হেঁটে যেতে ত সময় লাগবে, অফিসার বলে।
বালিশ পেছনে উঠে পড়ে। গাড়ি বাঁধের তলা দিয়ে ঐ বানভাসিদের অস্থায়ী আবাসের দিকে চলে। নরেশ বলে, না, নৌকা যেইখানে আছে ঐ তক ত গাড়ি যাইব না। ও বাঁধ বরাবর গেলে আগে যাবে নে।
বলতে বলতেই গাড়ি পৌঁছে যায়। বালিশ পেছন থেকে টুক করে নেমে পড়ে। বাঁধের লোজন বুঝতে পারে না, কী হল। অফিসারই নরেশ আর অমূল্যকে ধরল, নাকি নরেশ আর অমূল্যই অফিসারকে ধরল–সেটা বোঝা যায় না। নরেশ আর অমূল্যর ছুটে যাওয়া, তারপর, অফিসারের গাড়িতে চড়ে তাদের এখানে ফিরে আসা–এর ভেতর কোথাও তাদের কোনো বিপদের আশঙ্কা আছে কিনা, এই নিয়ে বাঁধের লোকজনদের ভেতর একটা অনিশ্চয়তা থাকে।
নরেশ অফিসারের পাশ দিয়ে মুখ বের করে বাঁধের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে, অশ্বিনী কাহা, কাদাখোয়ারে পাঠাইয়্যা দ্যান হাটের বগলে– তারপর মুখ ঢুকিয়ে বলে, চলেন। নরেশের কথা বলার গরম ভাপ অফিসারের ডান কানের পেছনে ও ঘাড়ে লাগে। নরেশ মাথাটা সরালে তিনি রুমাল বের করে ঘাড় মুছে নেন। গাড়ি সোজাই চলছিল।
