সকালে যখন অশ্বিনী রায়ের চালের ওপরে বাঘারুকে প্রথম দেখা গিয়েছিল তখন বাধসুন্ধু মানুষই, এক নিতাই ছাড়া, ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এখন, যখন তাকে উদ্ধার করে আনবার জন্যে শহর থেকে অফিসার এসে কিছু না করে ফিরে যাচ্ছে, তখন কারো আর সে ব্যাপারে কোনো উৎসাহ নেই। বাঘারুকে আর দেখা যাচ্ছে না, লোকটা ওখানে আছে কি নেই তাইই বোঝা যাচ্ছে না, ভেসে গেলে ত ভেসেই গেছে–এরকম একটা যুক্তি ত ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। লোকটা সুপুরি গাছে চড়ে উধাও হয়ে গেছে–এর ভেতরকার রহস্য ও ভয় ইতিমধ্যে এই এত বৃষ্টিতে, হাওয়ায় ও কথায় অস্পষ্ট হয়ে এসেছে। ফ্লাডের তিস্তায় এমন ভৌতিক দৃশ্য, এখন অবান্তর অথচ ভবিষ্যতের প্রাসঙ্গিক, গল্প হয়েই থাকল। সারা দিনের মধ্যে হাওয়া আর বৃষ্টি যে একটুও কমল না–সেটা আরো বেশি বাস্তব ভয়ের কারণ হয়ে উঠছে এই বিকেলে। আজও সারা রাত এই বৃষ্টি আর হাওয়া যদি চলে তা হলে ফ্লাডের চেহারা কী হবে তা এরা কেউ ভেবে উঠতে পারছে না। ভাবতে চাইছেও না হয়ত! কিন্তু সেই ভাবতে না-চাওয়ার মধ্যেই নিজেদের প্রস্তুত করে তুলছে আরো বিপদের জন্যে।
তা ছাড়াও এই ভিড়ের ভেতর আর-একটা অনিশ্চয়তাবোধ এই বিকেল থেকেই ছড়াতে শুরু। করেছে। এদের হিশেব অনুযায়ী আজই ফ্লাডের চরম দিন হওয়ার কথা। কিন্তু এই ফ্লাড় যদি আরো বাড়তেই থাকে, তা হলে কি তাদের চরের আর কিছু বাকি থাকবে? যেন তারা জানত, এই আজকে দুপুর পর্যন্ত যত জল এসেছে তার তলায় তাদের চরটা তাদেরই থেকে যাবে। কিন্তু এর পরও জলের যে-ঢল নামছে তাতে তাদের চরের জমিও নদীর সঙ্গে মিশে যেতে পারে। তা হলে? আবার কে। কোথায় ঘর খুঁজবে? জমি খুঁজবে?
এ-সব কথা এখনো কেউ মুখে বলে নি, বলবেও না। কিন্তু কথাগুলো ভেতরে-ভেতরে তৈরি হয়ে গেছে। যখন তারা এই ঘটনার মুখোমুখি পড়ে যাবে তখন হয়ত সকলে প্রস্তুত হয়ে যাবে–একটা চর ডোবা মানে ত আর-একটা চর জাগা! কিন্তু সেই প্রস্তুতির জন্যেও ত একটা সময় দরকার। যখন অফিসার এসে কথা বলছিল, ফ্লাড় দেখতে আসা রায়পুর রংধামালির লোকজন ভিড় করেছে, তখনই, বানভাসি মানুষদের ভেতরে-ভেতরে বৃষ্টি আর হাওয়া আর নদীর জলের হিসেবনিকেশ শুরু হয়ে গেছে। তাই তারা এ-সব দর্শনার্থীদের সম্পর্কে কিছুটা উদাসীন হয়ে পড়ে।
তাও অফিসার পালিয়ে যাচ্ছে, তাকে ধরার জন্যে নরেশ হাঁক দিয়ে দৌড়ল, নরেশের সঙ্গে-সঙ্গে বা পেছনে-পেছনে তাদেরও ছোটারই কথা। অন্তত তাদের চরের ওপরই ত লোকটাকে সকালে দেখা গিয়েছিল, সুতরাং লোকটাকে উদ্ধার করা যেন তাদের চরেরই একজনকে উদ্ধার করা।
কিন্তু অফিসার নৌকোর ভাড়া আর মাঝির টাকা দেবে শুনে নরেশ মাথাপিছু আড়াইশ, তার মানে চার জনের এক হাজার, নৌকোর ভাড়া আলাদা, বলল যখন, তখন থেকেই যেন চরটাও আর তাদের থাকল না, চরের ঐ মানুষটাও আর তাদের মানুষ থাকল না। এরকম ফ্লাডে, এরকম বিপদের মধ্যে নৌকো নিয়ে যারা যাবে তারা তাদের খুশিমত টাকা চাইতেই পারে। এ ফ্লাডে নৌকো ভাসানোর বিপদও ত কম না! সে টাকা যে দিতে পারবে সে পারবে, যে পারবে না সে পারবে না। কিন্তু এটা ত সরকারি টাকা। নরেশ আর অমূল্য প্রথমে রাজি হয়ে সাহস করে বলতে পারল বলেই টাকাটা তারা পাচ্ছে–এটাতে চরের অন্য সব লায়েক মানুষের ত একটু দুঃখ হতেই পারে। সরকার যদি নিজের নৌকোয় নিজের মাঝি নিয়ে রেসুক করত সেটা হত সরকারের ব্যাপার। কিন্তু তিস্তার বন্যায় ভাসল একটা লোক, কে তা কেউ জানে না; সে নিজেই সাঁতরে উঠল অশ্বিনী রায়ের চালে; তারপর নিজেই সুপুরি গাছ বেয়ে উঠে গেল–এখন সেই লোকটার নাম করে নরেশ-অমূল্য আর-দু-জনকে নিয়ে হাজার টাকা পকেটে ভরবে–এটা কেউ ভাবতেই পারে নি। সকালে যখন এ নিয়ে শোরগোল পড়েছিল, তখন ত সবাইই লোকটাকে দেখে অস্থির হয়ে উঠেছে। তাই তে ফোনাফুনি। কিন্তু সকালের এই শোরগোল বিকেলবেলা নরেশ-অমূল্যর ব্যবসা হয়ে উঠবে, তা কে জানত? এখন নরেশ-অমূল্য যদি অফিসারকে ঘেরাও দিয়ে নৌকোর টাকা আদায় করতে পারে ত করুক। কিন্তু চরের মানুষরা নরেশ-অমূল্যর জন্যে হয়ত তে যাবে কেন? করতে পারে ত
হয়ত নিতাই থাকলে এ সব ঘটত না। পঞ্চায়েতের লোক হিশেবে অফিসারের সঙ্গে নিতাইই কথা বলত। আর, নিতাইয়ের সঙ্গে কথা হলে এই সব টাকা-পয়সার কথা হয়ত উঠতেই পারত না। বিনি পয়সাতেই নিতাই হয়ত নৌকা ভাসাত। কিংবা, এ নিয়ে মাথাই ঘামাত না। কিন্তু নিতাই ত সারাদিন শহরে–রিলিফের খোঁজে।
অফিসার জিপের কাছে পৌঁছনোর আগেই নরেশরা অফিসারকে ধরে ফেলে। ধরে ফেলে মানে অফিসারই ওদের দৌড়নোর আওয়াজে পেছন ফিরে ওদের দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সোজাসুজি ঘুরে দাঁড়ায় না, বাঁধের দিকে মুখ করে ওদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অফিসার অবিশ্যি নরেশের চিৎকার আগেই শুনতে পেয়েছে, ওরা যে দৌড়ে তার দিকে আসছে সেটাও টের পেয়েছে কিন্তু তার মনে হয়েছিল আগেই জিপের কাছে পৌঁছে যাবে। খানিকটা আসার পর তার সেপাই দুজনের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় এই যুক্তিও চলে আসে সে আসলে সেপাই দু-জনকে ওখানে পোস্টিং করে এসেছে কোনো লোক নদীতে ভেসে আসে কি না তার ওপর নজর রাখতে। কিন্তু আরো খানিকটা এগিয়ে তার মনে হয়, এভাবে জিপে চড়ে চলে গেলে ব্যাপারটা খারাপ হতে পারে। আবার এখান থেকে ডি-সিকে হয়ত ফোনটোন করবে, মাঝরাতে তাকে আবার হয়ত এখানে পাঠাবে। তখন ত তার পক্ষে এখানে কিছু করাও মুশকিল হবে। এত কিছু ভেবে অফিসার দাঁড়িয়ে পড়ে।
