জগদীশ বারুই পেছন থেকে বলে ওঠে, হয়। আপনারা নৌকা রাইখবেন, আলকাতরা মাখাইবেন, গাব ঘইষবেন আর উনারা আইস্যা বছরে একবার জিপে কইর্যা নৌকোবিলাস কইরবেন।
অশ্বিনী রায় নরেশ-অমূল্যর কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। নরেশ-অমূল্য কেউই তার দিকে চোখ তুলে তাকায় না। অশ্বিনী রায় একটু দাঁড়িয়ে থেকে সেখানেই উটকো হয়ে বসে। যেন তার পা ধরে গিয়েছে তাই বসেছে, এমন ভাবে বসে থাকে। একটু পরে নরেশের দিকে তাকিয়ে বলে, পুছিবার ধইচছে নৌকাখান কার? তা ক কেনে, কয়ি দে। সরকারের অফিসার
নরেশ বলে, আপনে কয়্যা দ্যান না, আমাগো কাছে আইছেন ক্যান? আমাগো ত নৌকা নাই।
নরেশ একটু জোরেই বলে–অনেককে শুনিয়ে। কথাটার মধ্যে একটু ঝাঁঝ ছিল–সেটা অশ্বিনী রায় বুঝতে পারে। তাই এমন মুখভঙ্গি করে বসে থাকে যেন কথাগুলো তাকে বলা হয় নি।
জগদীশ বারুই তার জায়গা থেকে উঠে নরেশের পাশে এসে বসে খুব নিচুগলায় বলে, সাতশতে রাজি হয়্যা যা, আমি কয়্যা দিচ্ছি, তগ মাথা পিছু দ্যাড়শ, আর একশ আমারে দিবি।
আপনে আবার এর মধ্যি বাসায় চাট মাইরবেন! দ্যাড়শতেও রাজি হবনে না। নরেশও প্রায় শোনা যায় না এমন স্বরে বলে।
তরা রাজি কি না সেইডা ক। অফিসার রাজি হয় কি না-হয় আমি বুঝব নে। অমূল্যরে জিগা।
নরেশ অমূল্যর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে কথা বলে যায়। তারপর জগদীশের দিকে ঘুরে জানায়, অমূইল্যা মাথাপিছু দুইশর কমে রাজি না। আর আপনার আবার কমিশন কিসের?
জগদীশ শ্লেষ্মাজড়িত হাসি হেসে বলে, তগই ভাল হইত। আমারে একশ দিতি। না-দিস ত আমিই অফিসারের কনট্রাক্ট নিব–তহন পঞ্চাশ টাহাও পাবি না, কথাটা বলে জগদীশ বারুই দাঁড়ায়–দুই হাতের আঙুল জড়িয়ে মাথার ওপর তুলে মটকায়, আওয়াজ করে একটা হাইও তোলে।
ততক্ষণে আর-একটু বিকেল হয়েছে, যদিও বিকেলটা তেমন বোঝাই যায় না। জগদীশ বারুই তাদের মগ্ন চরের দিকে একবার তাকায়। একটু তাকিয়ে থেকে বলে, মানষিডা চোখের সামনে ভাইস্যা আইসল, আর সুপুরি গাছে চইড়্যা চইল্যা গেল?
বাঘারুর সেই নিরুদ্দেশ নিয়ে এখানে দরকষাকষি শুরু হয়। সে দরকষাকষি এই বাতাস আর বৃষ্টির সঙ্গে মিশে যায়। বাঘারু জানবে কী করে যে সে সুপুরি গাছের মাথায় চড়ে আছে না ভেসে গেছে শুধু এইটুকু দেখে যাওয়ার জন্যে সরকারের অফিসারের সঙ্গে দরদাম নিয়ে কথাবার্তা চলছে। বন্যাতে অনেকেরই অনেক কিছু ভেসে চলে যায়, আবার অনেকের কাছেই ত অনেক কিছু ভেসে আসেও। জগদীশ, নরেশ ও অমূল্য বুঝতে পারে না–তাদের কাছে সত্যি কিছু ভেসে আসছে কিনা। তারা ভাসিয়ে আনতে চাইছে।
অফিসার বলে, দেখুন, আমি ত এখানে সারা দিন দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। আমি দেখলাম–কোনো লোক রেসকিউ করার নেই। আমি সেই কথাই রিপোর্ট করব। আর, তা না হলে আপনারা নৌকো কোথায় বলুন–আমরা রেসকিউয়ের ব্যবস্থা করছি।
.
১৪০. বাঘারুউদ্ধার নিয়ে আলোচনাসভা ত্যাগ ও পরে মতৈক্য
অফিসার একটু অপেক্ষা করে। কিন্তু অবস্থা কিছু বদলায় না। ভিড়টা আলগা হয়েই আছে, এখন যেন আরো আলগা হয়ে যেতে পারে। জগদীশ বারুই বাঁধের কিনারে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নরেশ-অমূল্যকে ঘিরে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারাও একটু-আধটু তফাতে সরে যায়। অফিসার নদীর দিক থেকে ঘুরে দাঁড়ায় উত্তর মুখো। বানভাসি লোকদের দুটো-চারটে গরু বাধা আছে কিন্তু তারপর ফাঁকা। খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে অফিসার নদীর দিকে একেবারে পেছন ফিরে সোজা হাঁটা দেয়।
অফিসারের পেছনে একটা ছোট ভিড় ছিল। অফিসার যে হাঁটা দেবে এটা কেউ বোঝে নি। ফলে দু-একজনকে হাত দিয়ে সরিয়ে অফিসার এগিয়ে যায়। তাকে এগিয়ে আসতে দেখে ভিড়ের লোজন তাকে পথ করে দিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে থাকে। রঘু ঘোষ অফিসারের পেছনে দু-এক পা গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
কেউই বুঝতে পারে না–অফিসার কোথায় যাচ্ছে। প্রথমে ভাবে–বোধহয় সঁহ্যাঁড়ানোর জায়গা বদলাচ্ছে। তারপর ভাবে, পেচ্ছাব করতে যাচ্ছে। পেচ্ছাব করতে হলে ত বাঁধের ওপরই উত্তর দিকে দু-পা গেলে হত। কিন্তু হয়ত বাঁধের ওপর থেকে অফিসারের পেচ্ছাব করা চলে না। ততক্ষণে অফিসার বাঁধের নীচে নেমে তার জিপের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। বাঁধের নীচে নেমে অফিসার চলে যাচ্ছে।
অশ্বিনী রায় ক্ষীণ স্বরে বলে, এ নরেইশ্যা, আরে অফিসার যে চলি যাছে রে, দেখ কেনে।
শুনে নরেশ-অমূল্য উঠে দাঁড়িয়ে সেখান থেকেই গলা উঁচিয়ে দেখে। কিন্তু বুঝতে না পেরে আঙুলের ওপর ভর দিয়ে তাকায়। পেছন থেকে জগদীশ বারুই মাথার ওপর দুই হাতের তালি বাজিয়ে বলে ওঠে, নেরে অমূইল্যা, তগ হাজার টাকা জিপে চইড়্যা চইল্যা গেল। এহন নিজের হাত নিজে চাট বইস্যা বইস্যা।
নরেশ গোড়ালি মাটিতে নামিয়ে জগদীশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে, চইল্যা গেল! মানে? আপনারা কি এহানে বইস্যা বইস্যা তামাশা দেইখতেছেন? চলেন, জিপটারে আইটক্যান। এই পর্যন্ত বলে নরেশ জগদীশের দিক থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে বাতাসে হাত ঘুরিয়ে বলে, এই চলো সবাই, জিপ আটকাও, জিও আটকাও।
বলে নরেশ, অমূল্যর আর পাশে যাকে পেল তার, হাত ধরে টেনে বাধ থেকে হুড় হুড় করে নীচে নেমে অফিসারের দিকে দৌড়তে শুরু করে। তাদের সঙ্গে-সঙ্গে আরো দু-একজন নামে। তারও পরে কিন্তু একটু বেশি পেছনে, আরো দু-একজন হেঁটে নামে, হেঁটে-হেঁটেই জিপগাড়ির দিকে যায়। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। বানভাসিদের বেশির ভাগই বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ-কেউ নদীর দিক থেকে রাস্তার দিকে গিয়ে লাইন বেঁধে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে। যারা নিজেদের জিনিশপত্রের আড়ালে শুয়েবসে ছিল, তারা সেখান থেকে যায় না।
