কী কইরব্যার পারেন? অমূল্য নরেশের পাশ থেকে জিজ্ঞাসা করে।
আমরা এখনই ভাড়া করে নেব।
আগে কইলেন নৌকা চাই, এ্যাহন কইলেন মাঝি চাই। তা আপনারা রেসকুটা কী কইরবেন? জগদীশ বারুই স্পষ্ট গলায় আড়াল থেকে বলে।
না। আমরা গবমেন্ট থেকে নৌকোর ভাড়া দেব, মাঝিদের ওয়েজ দেব মানে মাঝিদের টাকা দেব।
অফিসারের কথার পর হঠাৎ সবাই চুপ করে যায়। ঠিক বোঝা যায় না, এই নীরবতার অর্থটা কী? রঘু ঘোষ একটু অপেক্ষা করে বলে, কী? এখানে নৌকো আছে কারো?
আরে এহানে যে-নৌকা সেকি এই জলের টান সামলাবার পারব? আর নৌকাড়া নিয়্যা যাবেনে কে? কত টাকা দিবেন যে মানষি এই জলে ভাইসবে? জগদীশ প্রশ্ন করে।
এই অবস্থায় টাকা নিয়ে ত আর দরাদরি করব না আপনাদের সঙ্গে। আপনারা কত চান, বলুন না। নৌকো আছে এখানে?
আবার সবাই চুপচাপ। সেই নীরবতার মধ্যেই ভিড়টা যেন একটু আলগা হয়ে যায়। অমূল্য আর নরেশ প্রায় কানে কানে কথা বলতে-বলতে বাঁধের কিনারার দিকে একটু আড়ালে চলে যায়। আরো কিছু-কিছু এমন কথা হয়। আর, মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যেই অফিসার কেমন একা হয়ে যায় যেন, তার সঙ্গে সকলের কথাবার্তা শেষ হয়ে গেছে। আরো একটু অপেক্ষা করে অফিসার গলাটা তুলে বলে, শুনুন, আর দেরি করা যাবে না। হয় আপনারা নৌকো দিন, আর না-হয় আমি রায়পুর বাগানে গিয়ে কন্ট্রোলে ফোন করব। তারপর কন্ট্রোল যা করার করবে। ম্যানেজারবাবু, অফিসার পেছনে তাকায়।
রঘু ঘোষ হে-হে করে হেসে বলে, ম্যানেজারবাবু চলে গেছেন। আমরা আছি, আপনি গেলে চলুন।
আপনি বাগানের?
হ্যাঁ।
নরেশ আর অমূল্য ফিরে আসে, এসে দাঁড়িয়ে থাকে। অফিসার তাদের দিকে তাকিয়ে বলেন, কী হল? নৌকো পাওয়া যাবে?
তা যাবেনে। আমরা চারজন যাবার পারি। কিন্তু মাথাপিছু আড়াইশ টাকা দিবার লাগব। নৌকার ভাড়া আলাদা, নরেশ বলে।
নরেশ কথাটা বলে ফেলার পর হঠাৎ যেন চারপাশের সবাই চুপ করে যায়। শুধু বাতাস আর বৃষ্টির আওয়াজটা বেড়ে ওঠে। এই ভিড়ের ভেতর যারা বাগানের আর হাটের তারা হয়ত এখন একটা দরকষাকষির উত্তেজনাতেই চুপ করে যায়। আর, ঐ চরেরই যে বানভাসিরা ভিড়ের মধ্যে ছিল, তারা নরেশের কথাতেই হঠাৎ বুঝে ফেলে, তাদের নিজেদেরই চরে গিয়ে ফিরে আসার দাম এখন এতটাই বেড়ে গেছে।
অফিসারই প্রথম কথাটা বলে, সে কী হে? তোমাদের একটা লোক নাকি ওখানে চালের ওপর পড়ে আছে। তোমাদেরই ত উচিত ছিল এতক্ষণ নৌকো করে লোকটাকে নিয়ে আসা। আমরা খরচা করতে রাজি আছি শুনেই হাজার টাকা দর হাঁকলে–কথাটা শেষ করে অফিসার এদিক-ওদিক তাকায়, তারপর রঘু ঘোষের চোখ পেয়ে যায়। রঘু হে-হে করে হেসে অফিসারের কথাটাতে অন্য জোর সঞ্চার করে দেয়।
কিন্তু রঘু ঘোষের হাসির পরও এই ভিড়ের নীরবতা ভাঙে না। একটা গোহাটে যেমন গরু কেনাবেচার সময় একটা গরু নিয়ে সারা দিন ধরেই দর কষাকষি চলতে থাকে, এখন বাঁধের ওপর যেন সেরকম একটা পরিস্থিতিই তৈরি হল। নরেশ-অমূল্য ভিড় থেকে একটু সরে গিয়ে মাটির ওপর উবু হয়ে বসে পড়ে–কিন্তু নিজেদের মধ্যেও কোনো কথা বলে না। ভিড়টা একটু আলগা হয়ে যায়–কেউ-কেউ অফিসারকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকে, কেউ-কেউ আবার সরে গিয়ে নরেশ অমূল্যর কাছে দাঁড়ায়। ভিড়টা একটু আলগা হওয়ার পর বোঝা যায়, অফিসারের ডান দিকে পেছনে জগদীশ বারুই মাটিতে বসে।
বললে যে, নৌকো পাওয়া যাবে, নৌকো কোথায়? অফিসার বলে কিন্তু সে কথার জবাব কেউ দেয় না। একটু অপেক্ষা করে অফিসার এবার গলা তুলে ও ঘাড়টা ঘুরিয়ে বলে, কী? এখানে নৌকো কার আছে? কোথায়?
অফিসারের কথার কেউ জবাব দেয় না। এবার একটু অধৈর্য হয়েই অফিসার বলে, বাঃ। তোমাদের হাজার টাকা দিতে রাজি হলে নৌকো পাওয়া যাবে আর তা না-হলে পাওয়া যাবে না? ফ্লাডের সময় এরকম করা কিন্তু বে-আইনি।
এবারও কেউ কোনো কথা বলে না কিন্তু অনেকেই নরেশ-অমূল্যর দিকে তাকায়। সেই চাহনি অনুমান করেই বুঝি নরেশ-অমূল্য মাথা নিচু করে মাটিতে কাঠি দিয়ে আঁকিবুকি কাটে। অশ্বিনী রায় পেছন থেকে এসে অফিসারকে বলে, স্যার, আমারই ঐ চালটা। লোকটা আমার গুয়াগাছটা উঠি আর নামিল না।
পেছন থেকে জগদীশ বারুই হেসে দুই হাত ঘুরিয়ে বলে, কিসের মধ্যে কী, পান্তাভাতে ঘি। কথা হব্যার ধইরছে রেসকুর, উনি কন উনার গুয়াবাড়ির কথা। জগদীশের মন্তব্যে একটুআধটু হাসিমশকরা। শুরু হওয়ার কথা, কিন্তু যারা হাসতে পারত বা পাল্টা মন্তব্য করতে পারত তারা মুখ খোলে না। পরিস্থিতিটা একটু বেশি গম্ভীর হয়ে যায়। অশ্বিনী রায় তার সঙ্গে কথা বলায় অফিসারও যেন একটা অবলম্বন পেয়ে যায়। সে অশ্বিনী রায়কেই জিজ্ঞাসা করে, আমি ত তখন থেকে চেঁচাচ্ছি এখানে নৌকো কার আছে, আপনারা ত তার কোনো জবাব দিচ্ছেন না। তা আমি কি সাঁতার কেটে গিয়ে লোকটাকে ধরে আনব? এখানে নৌকো কোথায় আছে? অফিসার রঘু ঘোষের দিকে ফিরে বলে, আপনারা জানেন নাকার নৌকো আছে?
আমরা কী করে জানব। আমরা কি রোজ এখানে আসি নাকি? রঘু ঘোষ হে-হে করে অফিসারের মুখের ওপরই হাসে।
আপনাদের বাগান নদীর এত কাছে, আপনারা নৌকো রাখেন না কেন একটা? অফিসার আচমকা রঘু ঘোষকেই জিজ্ঞাসা করে। রঘু ঘোষ প্রশ্নটা শুনে প্রথমে অ্যা বলে ফেলে, তারপর তার সেই হে-হে হাসিটা এবার অনেকক্ষণ ধরে হাসে। সেই হাসিটা শেষ করে জামার হাতায় মুখ মুছে সে বলে, বাঃ, আপনাদের বছরে-দু বছরে কখন দরকার হবে সেই জন্যে কোম্পানি বাগানে নৌকো পুষবে?
