হয়, একটু সমবেত স্বরে শোনা যায়।
ফ্লাডের ভেতর চালের ওপর একটা লোককে দেখতে-দেখতে দিন কাটানো যায়, না দেখতে-দেখতেও রাত পোয়ানো যায়। কিন্তু লোকটা সুপুরি গাছে উঠে উধাও হয়ে গেলে, ফ্লাডের তিস্তায় একটা লোক সুপুরি গাছ বেয়ে উধাও হয়ে গেলে, তাদেরই চর থেকে উধাও হয়ে গেলে, তারা এই বাঁধের ওপর বসে থাকবে কোন ভরসায়? না হয় এখন তাদের বাড়িজমির ওপর দিয়ে কয়েকমানুষ-ডোবা জল এই বেগে বয়ে যাচ্ছে। তবু তারা ঐ চরের মুখোমুখি এই বাধে তাদের গরুবাছুর, ছাওয়াছোট, বেটিছোয়া নিয়ে ত অপেক্ষা করে আছে যে জল একদিন নামবে ও তারা আবার কাদামাটি ভেঙে তাদের চর চিনে নিতে পারবে। এর মধ্যে কিছু অনিশ্চয়তা ত আছেই–তিস্তা ঐ চরটাকে খেয়ে দিয়েছে কি না তা ত জল না নামলে বোঝা যাবে না, কিন্তু এখন ঐ জলঢাকা চরে কি আরো এমন কোনো ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, যার ওপর তিস্তার ফ্লাডেরও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই? যে-লোকটার ভেসে আসা তাদের দেখা, টিনের চালের ওপর বসে থাকা তাদের দেখা, সুপুরি গাছ বেয়ে ওঠাও তাদের দেখা-সূপুরি গাছ থেকে সেই লোকটার না-নামাও ত তাদের দেখা। তা হলে তাদের চরের ওপর দিয়ে তিস্তার বন্যাই যে বয়ে যাচ্ছে তা নয়, সুপুরি গাছের মাথা দিয়ে যাদের যাতায়াত তারাও কি এসে চরটার দখল নিয়ে নিল নাকি? সেইটি যাচাই করার জন্যেই মিলিটারি দরকার, মিলিটারির নৌকো দরকার। কিন্তু সেই দাবিটা যে অফিসারের কাছে করা যায় না, তা এরা বোঝে।
.
১৩৯. বাঘারুউদ্ধার সংক্রান্ত বাজেটবিতর্ক
মানে? লোকটা সুপুরি গাছে উঠেছে, আপনারা দেখেছেন? অফিসার ভিড়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে।
হয়, ভিড়টা মাথা নাড়ে।
তারপরে আর নামে নি, সেটাও দেখেছেন?
হয়।
গাছের ওপর থেকে পড়েটড়ে যায়নি ত?
কেউ কোনো জবাব দেয় না।
আপনারা দেখেছেন, পড়েটড়ে যায়নি ত?
আবারও সেই একই নীরবতা। একটু পরে আড়াল থেকে জগদীশ বারুই বলে ওঠে, পইড়লে ত অবার উইঠত চালে?
সুপুরি গাছের মাথাটা জল থেকে খুব বেশি উঁচুতে নয়। সেখান থেকে পড়ে গেলে স্রোতের টানে লোকটি ভেসে যেতে পারে, কিন্তু ভেসে যেতে-যেতে আবার ঐ চালটাতে, বা, ঐ দিকের আর-একটা সুপুরি গাছে বা আরো দু-একটা চালে উঠতেও পারে–এই দুইয়ের মধ্যে কোনটা বেশি সম্ভাব্য অফিসার সেটা মনে-মনে যাচাই করে। যাচাই করতে গিয়ে সে জগদীশ বারুইয়ের প্রশ্নটার সামনে পড়ে যায়–লোকটি যদি কোনো রকমে ভেসে যাওয়া থেকে নিজেকে ঠেকাতে পারত, তা হলে ত তাকে আবার দেখা যেত। ঐখানে গিয়ে যাচাই করে না এলে কী করে জানা যাবে, লোকটি আছে কি নেই। অফিসার মনে-মনে খুব সতর্ক হিশেব কষে। তারা একটু দেরি করে এসেছে এই আন্দাজ থেকেই যে এর মধ্যে এখানকার লোকজন নিজেদের মত একটা ব্যবস্থা করে নেবে। দুপুরের পর দ্বিতীয় ফোনটা পেয়ে তাদের ঠিক করতে হয় যে এখানে আসতে হবে। কিন্তু এটা অফিসারের আন্দাজের মধ্যে ছিল না যে, সত্যি করেই এখানে এখন নদীতে নৌকো ভাসাতে হবে। অফিসার এটা বোঝে যে এই চারপাশের ভিড়টা তাকে কিছু না করে চলে যেতে দেবে না। এক, ফোন করব বলে গাড়ি নিয়ে রায়পুরে গিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে পারে–এখানে সেপাইদুটোকে রেখে। এখন যদি সে সত্যি কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে কথা বলে তা হলেও নতুন কোনো ব্যবস্থা সন্ধ্যার আগে করা সম্ভব নয়। মিলিটারির নৌকো ব্যাপারটা ভুয়ো। তাদের কিছু রাবারের নৌকো আছে–সে-নৌকো নিয়ে স্রোতের এ বেগ সামলানো যাবে না। অফিসার ঘড়ি দেখে-সাড়ে তিনটে বেজে গেছে, তার হাতে আর বড় জোর ঘণ্টা খানেক-ঘণ্টা দেড়েক সময় আছে। এখান থেকে কোনো নৌকো ভাসালে সেটা ফেরার পথে বিপদে পড়তে পারে, ততক্ষণে অন্ধকারও হয়ে যাবে।
অফিসার একটু অনিশ্চিত স্বরে বলে, আপনারা যারা ঐ চরের লোক, তারা ত সবাই চলে এসেছেন?
অফিসারের কণ্ঠস্বরে প্রশ্নটা খুব স্পষ্ট ছিল না বলেই হয় ত কেউ. কোনো জবাব দেয় না। একটু অপেক্ষা করে অফিসার বলে, মানে, আপনাদের কেউ ত আর ওখানে নেই? চরে?
না। তা নাই। আমরা ত এখানে ওঠা শুরু করছি শুক্রবার শেষ রাইত থিক্যা– জগদীশ বারুই আড়াল থেকে বলে।
সে ত ভালই করেছেন যে অপেক্ষা করেন নি। তাই গরুবাছুর সবই আনতে পেরেছেন।
সে আমাগো হিশাব আমাগো কাছে। আপনাদের উপর ভরসা করলে আর ধাধে উইঠতে হইত নরেশ মেজাজ দেখিয়ে বলে।
অফিসার একটু চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করে, আপনারা কী চান, সেটা বলুন, আমাকে ত কন্ট্রোলে জানাতে হবে। ঐ লোকটি ওখানে আছে কিনা সেটা দেখতে চান?
সেই লগেই ত সকাল থিক্যা ফোন করা হইল, নরেশ বলে।
শুনুন, অফিসার একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার ভঙ্গিতে বলে, আপনাদের এখানে কি কারো নৌকো আছে?
আমাগো নৌকা নিয়্যা যাবার উপায় থাইকলে আপনাগো ফোন কইরতে যাব কুন কামে? নরেশ জবাব দেয়।
কন্ট্রোলে ফোন করে এখানে নৌকোর ব্যবস্থা করতে করতে ফ্লাডের জল নেমে যাবে–অফিসার স্পষ্ট জানায়।
তয় যে রেডিওতে-টিভিতে এত মিলিটারি দেখান? একটা মেয়েলি গলায় পেছন থেকে কেউ বলে।
সে কোথায় কী দেখায়, সে-সব আমি বলতে পারব না। আমি আপনাদের কাজের কথা বলছি। আপনারা যদি কন্ট্রোলে জানাতে বলেন, আমি রায়পুর বাগানে গিয়ে ফোন করে দিতে পারি। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। তার বেশি আমার ক্ষমতার বাইরে। সেখানে ডি-সি ঠিক করবেন। আর, যদি আপনারা এখান থেকে কোনো নৌকো আর মাঝি দিতে পারেন, তা হলে আমি এখনই সেটা রিকিউজিশন করতে পারি।
