ফরেস্টার তার পরনের কানিটুকু সরিয়ে পেছনটা উদোম করে দেয় আর যেন টর্চের আলো সত্যিই পড়েছে এমন ভাবে ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখায়, এক পাক, তার চার পাশে যেন সত্যিই দেখবার লোকের জটলা।
পাক শেষ করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ফরেস্টার বলে, ব্যাস, হুজুর। এ্যালায় ত জানি গিছেন, যায় বাঘা সে-ই সাচা ফরেস্টারচন্দ্ৰ। এইঠে ফরেষ্টার ত অনেক হুজুর বর্মনও হুজুর অনেক। রায়বর্মনও কনেক-আধেক আছে। কিন্তুক বাঘাবর্মন এই একোটাই। ত মুই যাছ হুজুর। গয়ানাথক হালুয়াকাম শিখাবার যাছি। তোমরালা কাল রায় দিয়া দিবেন–বাঘারু তার জমি গয়ানাথ জোতদারক দিয়া দিছে, এ্যালায় গয়ানাথ হালুয়া হবা ধরিবে-এ।
ত মুই যাছ হুজুর, বাঘারু কয়েক পা গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, হুজুর, একখান সিগারেট খায়্যা যাছু। বা কান থেকে একটা সিগারেট বের করে বাঘারু ঠোঁটে লাগায়। পোড়া সিগারেটের শেষাংশ। ডান কানের পেছন থেকে দেশলাইয়ের কাঠি আর কানের ভেতর থেকে দেশলাইয়ের বারুদ-লাগানো একটা টুকরো বের করে আনে। তারপর সিগারেট ঠোঁটে চাপাস্বরে বলে, সাহেব ভাবিছেন মুই মাতাল খাছি। দেখো কেমে, কেনং ফস করি জ্বালাম কাঠিখান। ওয়ান-টু-থিরি। প্রথমবার জ্বলল না। দ্বিতীয়বার জ্বলল। শিখাঁটিকে বাঁচাতে তার দুই পাঞ্জার ঘের দেয়। ওটুকু বেঁকাতেই তার শক্ত পাঞ্জায় টান ধরে, যেন ভেঙে যাবে। পাঞ্জার ওপর আনত মুখে ঐ অন্ধকারে খোদাই হয়ে যায় অনড় দৃঢ় মোঙ্গোলীয় স্থাপত্য। সিগারেটটা ধরিয়ে, কাঠিটা ফেলে দিয়ে, নাক-মুখ দিয়ে বাঘারু যত ধোয়া ছাড়ে তাতে মনে হয় সিগারেটটা একটানেই শেষ হয়ে গেছে। সিগারেটটা নামিয়ে বাঘারু তাকিয়ে-তাকিয়ে আগুন দেখে।
.
০১৫.
সার্ভে পার্টির যাত্রা
সুহাস টের পেয়েছিল যে ওঁরা জেগেছেন ও তৈরি হচ্ছেন। কিন্তু সারা রাতের ঘুম তখনই যেন চোখ ঝাঁপিয়ে আসে। সে পাশ ফিরে শোয়। কিন্তু পাশের ঘরের আওয়াজ আরো বাড়ছে। সকাল ছটা থেকে কাজ শুরু হবে সেই তিস্তা পারে– তারপর আপলাদের দক্ষিণ কিনারা দিয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে এগবে। এখান থেকে হাঁটতে হবে দু-তিন মাইল। এখনই না-উঠলে দেরি হয়ে যাবে।
একথা ভাবতে-ভাবতেই দরজায় টোকা পড়ে স্যার। বিনোদবাবুর গলা।
হু, সাড়া দিয়ে সুহাসকে উঠতে হয়। চোখ খুলতে পারে না, এত জ্বালা করে। ফলে, পা-টা কিছুতেই স্যাণ্ডেলে গলাতে পারে না! দরজা খুলে সুহাস বেরিয়ে দেখে তার ঘরের সামনে বারান্দায় একটা বড় বালতিতে জল, পাশে মগ।
মুখ ধোয়া শেষ হতে-হতেই প্রিয়নাথ একটা কাপে চা নিয়ে সুহাসের টেবিলে রেখে আসে। এইবার সুহাস বুঝতে পারে, তার পার্টির আর-সবাইই একেবারে তৈরি হয়ে আছে, শুধু তার জন্যই দেরি। সে অবিশ্যি এখুনি তৈরি হয়ে যাবে, কিন্তু প্রথম দিন সে সবার শেষে তৈরি হচ্ছে এতে সুহাস একটু লজ্জা পেল। তবে তাকে কেউ যেমন তাগাদা দিল না, তেমনি বিনোদবাবু বা অনাথ-প্রিয়নাথ কেউই খুব তাড়াহুড়োও করছে না। ওরা যেন জানেই সুহাসের দেরি হবে। বা, সুহাস যখন বেরবে তখনই কাজ হবে–তাই ওদের কোনো উত্তেজনা নেই।
চা খেতে-খেতেই সুহাস দ্রুত জল নিয়ে এল ও দাড়িতে সাবান ঘষতে শুরু করল। সুহাস ভেবেছিল। দু-চুমুক চা খেতে-খেতেই দুই টানে দাড়ি নামিয়ে দেবে। নামালও তাই, কিন্তু ঠেকে গেল গোফে। গোফে তাড়াহুড়ো করলে সময় আরো বেশি লাগবে। তাই সুহাস ব্লেডটা আস্তেই চালাতে চায়। কিন্তু আঙুলটা যেন ঠিক থাকে না। সুহাস তাড়াতাড়ি ব্লেডটা তুলে নিল। আর আয়নায় নিজের গোফটার দিকে তাকিয়ে ভাবলু, প্রতিটি দিন ত এই গোফ তাকে জ্বালায় ও জ্বালাবে। এখুনি সে ত এটাকে নামিয়ে দিতে পারে। বড়জোর বিনোদবাবু, প্রিয়নাথবাবু আর অনাথবাবু সেটা টের পাবে। আর ত কেউ তাকে আগে দেখেও নি। অফিসে ফিরে গেলে, তখন…। এই সুযোগ ত তার দ্বিতীয়বার না-ও আসতে পারে। আজই ত সবাই গোফঅলা হাকিমকে দেখে ফেলবে। তখন ত আর সে গোফ উড়িয়ে দিতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত সুহাস ব্লেডটা নিয়ে নীচের লাইনটা একটু সোজা করে দেয়, আর ওপরে ব্লেডটা-একটু বোলায় মাত্র। তবু যেন অভ্যাসবশেই আয়নায় দেখে নিতে হয়। আর দেখলে তখন সেই ছোট কাচিটাও তুলতে হয়। একটু লাইটা ঠিক করে আয়না থেকে তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নেয়।
বিনোদবাবু জানলায় এসে বলেন আপনি তৈরি হোন, আমি বরং ওদের নিয়ে এগিয়ে যাই। জ্যোৎস্নাবাবু আপনাকে নিয়ে যাবেন।
আমার ত হয়েই গেছে, বলে চায়ের কাপটাতে শেষ চুমুক দিয়ে সুহাস, বাথরুমটা যেন কোনদিকে? বলেই বোঝে বিপদে পড়ল। কাল সন্ধ্যাতেও দু-একবার মনে হয়েছে, কিন্তু জিজ্ঞাসা করে উঠতে পারে নি। বিনোদবাবু জানলা থেকে সরে গিয়েছিলেন, সেখান থেকেই বললেন, পায়খানা কি আছে? দেখি।
তার মানে, এরা সেই অন্ধকার থাকতে উঠে মাঠে বা ঝোঁপঝাড়ে কোথাও গিয়ে কাজ সেরে এসেছেন। এখন বেলা হয়ে গেছে। মাঠে যাওয়া সম্ভব নয়। তা ছাড়াও, সুহাস মাঠে যেতে পারবে কি? এই ব্যাপারটাতে সুহাস প্রথম থেকেই একটু অনিশ্চিত। এখনো সে অনিশ্চয়তা কাটে নি, ভাবছে, এদের মত শেষ রাতে উঠলে হয়ত তার পক্ষেও মাঠে যাওয়া সম্ভব হত। কিন্তু এখন বেরিয়ে দুপুর বারটা-একটা পর্যন্ত কাজ। তৈরি না-হয়ে বেরয়ই বা কী করে? দুপুরে ফিরে এলেও ত আর এখানে বাথরুম গজাবে না। একটু অপ্রস্তুত ভাবেই সুহাস ঘর থেকে বেরয়। তার বাথরুমের জন্যে সমস্ত পার্টির কাজে রওনা হতে দেরি হয়ে যাবে- এটাও তার ভাল লাগে না। তার চাইতে বরং বিনোদবাবু যা বললেন, সেটাই ভাল, প্রিয়নাথবাবু আর অনাথবাবুকে নিয়ে বিনোদবাবু গিয়ে পৌঁছন, জ্যোৎস্নাবাবুর সঙ্গে সে না-হয় একটু দেরিতেই পৌঁছবে। বারান্দায় কাউকে না-পেয়ে সুহাস সিঁড়ির মাথায় এসে দেখে, কুয়োপাড়ের কাছে বিনোদবাবু আর প্রিয়নাথবাবু দাঁড়িয়ে, আর জ্যোৎস্নাবাবু একটা লোককে কিছু বলছেন। সুহাস কিছু বলার আগেই বিনোদবাবু বললেন, স্যার, পায়খানাটা ত নোংরা হয়ে আছে, ভেতরে জঙ্গলও হয়েছে, এখন বলা হল, পরিষ্কার করে রাখবে। আপনি — বিনোদবাবু কথাটা শেষ করতে পারলেন না। ততক্ষণে জ্যোৎস্নাবাবু লোকটির সঙ্গে কথা সেরে ফিরে বিনোদবাবুর কথার পিঠেই সুহাসের দিকে তাকিয়ে বললেন, গিরিজাবাবুর কাছে খবর পাঠালাম, আমরা ফেরার আগেই সব ঠিকঠাক করে রাখবে।
