নমস্কার। আপনাদের বাগান থেকে ফোন করা হয়েছিল এখানে এই বাধে লোজন ভেসে এসে চালের ওপর উঠে আছে, রেসকিউ করতে হবে। আমাদের একটু রিপোর্ট করুন।
ম্যানেজারবাবু সরাসরি অফিসারের মুখের দিকে তাকান না। পাশের শ্রমিকটিকে বলেন, রঘুবাবুকে ডা। তারপর রঘুবাবুকে খুঁজতেই সেই ভিড়ের ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে বলে যান, আমরা ত কিছু দেখি নি, আমরা ত এখন এলাম। এদেরই দুটো ছে,ে ফালে গিয়ে বলল, লোকজন ভেসে আসছে, ফোন করে দিতে। দাঁড়ান, আমাদের মধ্যে যে জানে তাকে ডেকে আনছে, সে সব বলতে পারবে।
ম্যানেজারবাবু তখনো ভিড়ের ওপর দিয়ে রঘু ঘোষকে খুঁজছেন। পেছন থেকে রঘু ঘোষ এসে বলে, কী হল?
আরে, তুমি কোথায় গিয়েছিলে? এই দেখো, এরা কী জানতে চাইছেন? ম্যানেজারবাবু আধ পা পেছনে যান, যেন রঘু ঘোষকে জায়গা দিতে। রঘু ঘোষ পেছন থেকেই বলে, ঐ ত ঐ চালের ওপর নাকি একটা লোক ভেসে এসে উঠেছে। কোন চালটা? অফিসার আবার নদীর দিকে ঘোরে, রঘু ঘোষ তার পাশে এসে দাঁড়ায়। অফিসার আর রঘু ঘোষ কয়েক পা এগিয়ে যায়। সেপাই দুটো সামনের লোকজনকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু কখন সরতে হবে লোকজন এর মধ্যেই তা শিখে গেছে।
রঘু ঘোষ নদীর দিকে আঙুল তুলে বলে, ঐ ত ঐ সব চালের কোথাও হবে। তারপর ভিড়ের দিকে তাকিয়ে গলা তুলে বলে, আরে, আপনারা বলছেন না কেন? আপনারা দেখেছেন, আপনাদের জায়গা, আপনারা বলেন। কে আছেন ঐ চরের?
জগদীশ বারুইয়ের গলা শোনা যায়, আরে, নিতাইডা ত আইল না এহনো। এই গজেন, নরেশ, অমূইল্যা, দ্যাখ না কী কয়?
নরেশ ভিড়ের ভেতর থেকেই বলে, কওনের কী আছে? ঐ ত ঐ চালডার উপুড় একখান মানুষ ভাইস্যা আস্যা উঠল, সকলেই দ্যাখছে।
অফিসার আঙুল দিয়ে নদী দেখিয়ে বলে, ঐ চালটার ওপর, ঐ সুপুরি গাছের ভেতরে যে-চালটা?
হ্যাঁ। নরেশ জবাব দেয়। নরেশ এগিয়ে আসে না, কিন্তু সে লম্বা বলে ভিড়ের ভেতরেও তাকে আলাদা করা যায়।
কই? কেউ নেই ত! অফিসার জিজ্ঞাসা করে।
আরে সেইডাই ত কথা, ভিড়ের আড়াল থেকে জগদীশ বারুইয়ের গলা ভেসে আসে, সকলে দেইখল্যাম, ভাইস্যা আইল, আবার সকলে দেইখল্যাম, নাই।
নাই মানে? আবার ভেসে গেল নাকি? অফিসার একটু উদ্বেগের সঙ্গেই জিজ্ঞাসা করে। তাদের আসতে একটু দেরি হয়েইছে। এর মধ্যে যদি কোনো লোক ভেসে এসে আবার ভেসে গিয়ে থাকে আর এ নিয়ে যদি কোনো গোলমাল বাধে, তা হলে, সে ফেঁসে যেতে পারে।
কেডা জানে? ভাইসল না উইড়ল না কোথায় গেল? হেই সকালের ব্যাপার। আপনারা আইলেন এতক্ষণে। তা লোক কি এতক্ষণ ধইর্যা সঁতরাব নাকি? জগদীশ বারুই আড়াল থেকে বলে ওঠে।
অফিসার গলাটা নরম করে বলে, আমাদের ত আরো দশ জায়গায় দৌড়তে হচ্ছে। কী করা যাবে বলুন। এখন বলুন, কী করতে হবে।
জগদীশ বারুইয়ের কথার ভঙ্গিতে নরেশও একটু সাহস পায়, আমরা ত ফোন কইর্যা কইল্যাম মিলিটারির নৌকা পাঠাইতে? তা আপনারা কি নৌকা নিয়্যা আইসছেন?
ফোন করলেই ত আর নৌকা তুলে আনা যায় না, আপনারা বলুন কী হয়েছে, তারপর নৌকো লাগবে কি কী লাগবে ঠিক করা যাবে।
এক কথাই ত কয়্যা আইসত্যাছি সকাল থিক্যা। মানুষ ভাইস্যা আস্যা উঠছে। এহন আপনার জিপগাড়ি নিয়্যা যান নদীর ভিতরে–দেইখ্যা আসেন মানুষ আছে কি নাই।
নরেশের কথায় সবাই হেসে ওঠে। অফিসার একটু এদিক-ওদিক তাকায়। তার সামনে বাঁধের বোল্ডার জল পর্যন্ত নেমে গেছে। সেই বোল্ডারের পরেই বন্যার তিস্তা। নরেশের কথায় রাগ ও অভিযোগ প্রকাশ হয়ে পড়েছে। ভিড়ের ভেতর থেকে ঠাট্টাবিদ্রূপ শুরু হয়েছে। নরেশের কথায় সবাই হেসে ওঠায় এই ভিড়ের মেজাজের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তাকে এখন এখানে কিছু কাজ দেখাতেই হবে, নইলে এরা হয়ত ফিরে যেতে দেবে না। অফিসার রঘু ঘোষের দিকে তাকিয়ে গলাটা একটু নামিয়ে বলে, কিন্তু এখন ত চালের ওপর কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
রঘু ঘোষ হে-হে করে হেসে বলে, আরে সেটাই ত সমস্যা। লোকটা নাকি এসেছিল, এখন আর নেই। তারপর আবার একটু হেসে নরেশকে বলে, কী? সবটা বলো–
কইল্যাম ত সবডা? আবার কী কব?
যাঃ। শুনলাম যে সুপুরি গাছে উঠেছিল লোকটা!
সুপুরি গাছে উঠেছিল মানে? ঐ সুপুরি গাছে? অফিসার জিজ্ঞাসা করে।
তা সুপুরি গাছেই উঠুক, আর গাবগাছেই উঠুক, সেইডা ত দেইখবার নাগব, না, কী? আড়াল থেকে জগদীশ বারুই বলে।
না। তা ত হবেই। আপনারা বলুন, কী হয়েছে। আমাকে ত সেই অনুযায়ী কন্ট্রোল রুমে জানাতে হবে। তারপর তারা ব্যবস্থা করবে। আমি ত আর পকেটে করে নৌকো আনতে পারব না।
যেই পারব, তারে পাঠাইলেই পারতান। নরেশ বলে।
না, সুপুরি গাছের ব্যাপারটা কী? অফিসার জিজ্ঞাসা করে।
তার কথায় কেউ জবাব দেয় না। রঘু ঘোষ বোঝে, চরের বানভাসি এই লোকজন ঐ কথাটি অফিসারকে বলতে চাইছে না যে, ভেসে আসা লোকটি সুপুরি গাছে উঠে উধাও হয়ে গেছে। এটা বললে, তাদের সমস্ত বক্তব্যটাই হালকা হয়ে যাবে। অথচ লোকটি যদি ঐ চালের ওপর এখনো বসে থাকত তাকে উদ্ধার করার জন্যে এদের এত মাথাব্যথা হত না। তিস্তার এই ফ্লাডে যে ভেসে এসে একটা চালে উঠতে পারে সে নিজেকে বাঁচাতেও পারে। কিন্তু তাকে আর দেখা যাচ্ছে না বলেই নৌকো করে ওখানে গিয়ে দেখে আসা দরকার, এদের আসল ইচ্ছে সেটাই।
শুনুন, বলে রঘু ঘোষ হাসে, আমরা এসে শুনলাম ঐ লোকটি সুপুরি গাছে উঠেছে কিন্তু আর নামে নি। এখন আপনারা মিলিটারির নৌকো নিয়ে এসে ওখানে দেখুন লোকটি আছে কি নেই।
