আবার সেই লোকটিও যখন নাকি সুপুরি গাছ বেয়ে উধাও হয়ে যায়, তখন তা নিয়ে যত হৈচৈই হোক না কেন, যত গল্পকথাই রটুক না কেন-ফ্লাডটার হিশেব তাতে আরো বেশি করে হিশেবের মধ্যে আসে। লোকটিকে যখন দেখা যাচ্ছে না, তখন ওরকম একটা লোক ভেসে এসেছিল সেটাও যেন আর তত সত্য থাকে না। ফ্লাডের তিস্তায় ওরকম হয়। কেউ হয়ত ঘরের চালের মায়া কাটাতে না পেরে চালের সঙ্গেই ভেসে যায়। কেউ হয়ত বাড়ির কাঁঠাল গাছের মায়া কাটাতে না পেরে সেই গাছের সঙ্গেই ভেসে যায়। এও হবে তেমনি কিছু একটা। তা ছাড়া পাগল-খ্যাপাও কেউ হতে পারে–সুপুরি গাছের ওপর নিজেকে বেঁধে রাখতেও পারে। সে যাই হোক না কেন–ফ্লাডের হিশেবের মধ্যে তাকে না নিলেও চলে।
তাই, এই বিকেলের দিকে এই বাঁধের ওপরের ভিড়টায় অলক্ষে দুটো ভাগ হয়ে যায়। চর থেকে যারা উঠে এসেছে তারা নিজেদের মত আলাদা হয়ে থাকে। কেউ-কেউ বৃষ্টিবাতাস থেকে একটু আড়াল বানিয়ে বাড়ির সবাইকে নিয়ে মাথা বাঁচায়, কেউ আবার এই ভিড়ের মধ্যেই ছড়িয়েছিটিয়ে থাকে। হাটের বা বাগানের লোকজনের কাছে গল্পটা ক্রমেই প্রধান হয়ে ওঠে। হতে-হতে শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায়, যেন তারা ঐ গল্পের জন্যেই এখানে অপেক্ষা করছে।
মোবাইল সিভিল এমার্জেন্সির গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল একটু আগেই বাঁধের ওপর লোজন-গরুমেষ দেখে। দুজন সেপাইকে নিয়ে অফিসার বাঁধের ওপর উঠে দেখে–তারা যে-সীমায় এসে উঠেছে, তাদের সামনে গরুবাছুর, মানুষজন, সংসারের আরো নানা জিনিশ নিয়ে বানভাসি লোকজন। তারা গরুবাছুরের সারির মাঝখান দিয়ে, কিছু-কিছু শুয়েবসে থাকা লোকজনের পাশ দিয়ে, এই ভিড়টার দিকে আসতে শুরু করে। এর মধ্যে ছোটখাট ত্রিপল আর প্লাস্টিকের চাদরের ঢাকনা কেউ-কেউ দিয়েছে, তাই অফিসারকে দূর থেকে দেখাও যায় না। নইলে টুপি, ওয়াটারপ্রুফ আর গামবুটে তাকে দূর থেকে দেখেই সবাই এগিয়ে আসত। ভিড়টার দিকে এগতে-এগতে অফিসার জিজ্ঞাসা করতে থাকে, কী, কোথায় লোক ভেসে এসেছে? কে ভেসে এসেছে? কোথায়? কে দেখেছে? ওদিক থেকে যে কেউ আসতে পারে সেটা, যারা শুয়েবসে ছিল তারা বুঝতে পারে নি। ফলে, আচমকা অফিসারকে তার লোকজনসহ দেখে তারা হকচকিয়ে উঠে বসে, বা দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর অফিসারের প্রশ্নটা শোনে। কিন্তু শুনেও বুঝে উঠতে পারে না। বোঝার পর যখন জবাব দেবার জন্যে অফিসারের দিকে দৌড়ায়, তখন অফিসার আরো খানিকটা এগিয়ে গেছে।
এই করতে করতে অফিসার যখন বান দেখতে আসা ঐ ভিড়টার মধ্যে গিয়ে পড়ে, তখন তার পেছনেও একটা বেশ বড় ভিড় তৈরি হয়ে গেছে। অফিসারকে দেখেই রায়পুর চা বাগানের ম্যানেজারবাবু একটু পেছিয়ে যান। অফিসারের কাছে যাওয়ার তাড়ায় লোকজন ম্যানেজারবাবুকে অফিসার থেকে আলাদা করে দেয়।
অফিসার জিজ্ঞাসা করে, কী? আপনাদের এখান থেকে ফোন করা হয়েছে, লোকজন ভেসে এসে চরের চালে উঠে বসে আছে। কোথায় ভেসে এসেছে? কখন? বলুন, বলুন, দেখি নদীটা দেখতে দিন, সামনে থেকে সরে যান
অফিসারের এই কথাতে সেপাইদুটো একটা কাজ পায়। তারা অফিসারের সামনে থেকে তোকজনকে দুদিকে সরিয়ে দেয়, লাঠিগুলো দিয়ে সেই ফাঁকটাকে বহালও রাখে। এখন অফিসারের সামনে সরাসরি নদী থাকে। সেই নদীর দিকে মুখ করে অফিসার দাঁড়িয়ে থেকে জিজ্ঞাসা করেই যায়।
যদি অফিসার একবার জিজ্ঞাসা করেই থামত, তা হলে হয়ত কেউ-না-কেউ একটা জবাব দিতে পারত। কিন্তু উত্তরের জন্যে অপেক্ষা না করে কথাগুলো সে বলেই যাচ্ছিল, ফলে, কেউ আর-কোনো কথা বলার সুযোগই পায় না।
কী? বলুন? কোথা থেকে কে ভেসে এসেছে? বলুন? ফোন গেল ত এখান থেকে। এখানে ফোন কোথায় আছে?
এবার যেন জবাব দেয়ার মত একটা প্রশ্ন পাওয়া যায়। ভিড়ের ভেতর থেকেই কেউ বলে, রায়পুর চা বাগান।
ও? রায়পুর? বলে অফিসার যে-ভাবে ঘাড় ঘুরিয়ে রায়পুরের দিকে তাকায়, তাতে বোঝা যায় রায়পুর বাগানটা চেনে। তার এই ঘাড় ঘোরানোর অবকাশে ভিড়ের ভেতর থেকে আর-কেউ বলে দেয়–ম্যানেজারবাবু ত আছেন।
কোথায় ম্যানেজারবাবু? অফিসার জিজ্ঞাসা করে।
ঐ ত ম্যানেজারবাবু। ম্যানেজারবাবু, ম্যানেজারবাবু।
ম্যানেজারবাবু আরো একটু পেছিয়ে গিয়েছিলেন। বাগানের শ্রমিকটি তার মাথায় ছাতা ধরেই ছিল। তিনি যে ইচ্ছে করে ক্রমেই পেছিয়ে পড়ছিলেন, তা হয়ত নয়, কিন্তু অফিসারকে ঘিরে অফিসারের পেছনের ভিড়টা এত বাড়ছিল যে তাকে পেছতেই হচ্ছিল।
ডাক শুনেও ম্যানেজারবাবু এগিয়ে আসেন না। অফিসার ঘাড় ঘুরিয়ে ম্যানেজারবাবু কোথায় তা দেখার চেষ্টা করে। তার চেষ্টার মধ্যেও সেই অপেক্ষা ছিল যে ম্যানেজারবাবু নিশ্চয়ই এবার এগিয়ে আসবেন। কিন্তু ম্যানেজারবাবু এগিয়ে না আসায় তাকে আরো একটু ঘুরে ম্যানেজারবাবুকে খুঁজতে হয়। ফলে অফিসার ও ম্যানেজারবাবুর মাঝখানের ভিড়টা দু ভাগ হয়ে যায়। অফিসার নদীর দিকে পেছন ফিরে ম্যানেজারবাবুর দিকে যখন ঘুরে দাঁড়ায় তখন ভিড়টা অফিসারের পেছনে চলে যায়। অফিসার ম্যানেজারাবাবু বলতে কাকে বোঝাচ্ছে তা বুঝতে পারে। সেখানেও একটা ইতস্ততের মধ্যে কিছুটা সময় যায়। অফিসার অপেক্ষা করে থাকে যে ম্যানেজারবাবু এবার এগিয়ে আসবেন। ম্যানেজারবাবু যে এগিয়ে আসছেন না এটা বোঝার পর অফিসার ম্যানেজারবাবুর দিকে এগিয়ে যায়।
