আর-একটু পরেই দেখা যাবে, কে টিনের চালে উঠেছে, আর কে সুপুরি গাছে উঠেছে, রঘু ঘোষ ঘোষণা করে।
কেন? মিলিটারি আসবে নাকি? গুদামবাবু জিজ্ঞাসা করেন।
এই ত আসার আগে ফোন করলাম। জ্যোতিদা ফোন করে দিয়েছিলেন। ওরা রওনা হয়ে গিয়েছে, যে-কোনো সময়ই এসে পড়বে, রঘু ঘোষ প্রায় ঘোষণার মত করে বলে।
রঘু ঘোষের কথাটা চকিতে বিধময় ছড়িয়ে যায় যে মিলিটারিরা টাউন থেকে রওনা দিয়েছে, ৫-কোনো সময়ই এসে পড়বে। এমনকি বানভাসিদের মধ্যেও একটু নড়াচড়া দেখা দেয়। তারা অনেকেই বহুক্ষণ নদীর দিকে তাকায় নি, এখন, কেউ-কেউ আবার তাকিয়ে নেয়। কখনো এক ঝলক, কখনো তাকিয়ে থাকে–চোখ আর ফেরায় না। তেমন তাকিয়ে থাকা কাউকে দেখলে হঠাৎ মনে পড়ে যায় দুদের বাড়িঘর, খেতিবাড়ি, ফসল, সব কিছুর ওপর দিয়ে তিস্তার এই জল দিগন্তগুলিকে ঠেলতে-ঠেলতে ছুটছে। নিজেদের সর্বস্ব এই জলের তলায় রেখে লোকগুলো বাঁধের ওপর বসে আছে কি আবার ওখানে ফিরে যাওয়ার আশায়?
রঘু ঘোষের বৌ লিলি আর রঘু ঘোষের ভাগ্নী গোপা পেছন থেকে এসে রঘু ঘোষকে ডাকে। রঘু ঘোষ তার সেই অপ্রস্তুত হাসি নিয়ে বলে, কী?
গোপা জিজ্ঞাসা করে, মিলিটারি নাকি সত্যি আসবে?
হ্যাঁ ত—
লিলি বলে, তুমি ফোন করেছিলে?
হ্যাঁ।
হা? আরে, সকালে ত ম্যানেজারবাবু জ্যোতিদাকে ফোন করেছিলেন। জ্যোতিদা ওদের বলে দিয়েছে। আমরা ফোন করাতে বলল, এখনই যাচ্ছি।
কী করবে, এসে?
সে আমি কী করে বলব? থাকো, নিজেরাই দেখতে পাবে।
ঐ যে বলছে, একটা লোক নাকি সুপুরি গাছ দিয়ে ভ্যানিশ হয়ে গেছে বলেই লিলি খিলখিল করে হেসে ওঠে। রঘু ঘোষও হেসে ফেলে তাড়াতাড়ি বলে, এই কী হচ্ছে, ম্যানেজারবাবু আছেন। ততক্ষণে গোপাও মুখে আঁচল চাপা দিয়েছে।
এখন এই ঘটনাটি আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগের ব্যাপার মাত্র নেই। তিস্তার বন্যায় একটা লোক ভেসে এসেছিল–তেমন ভেসে আসতে পারেই, প্রায় প্রতি বছরই আসে। লোকটা অশ্বিনী রায়ের চালের মাথায় উঠে বেঁচেছে–তেমন বাঁচতেও পারে, ফ্লাডের ভেতর এরকম করেই বাঁচতে হয়। লোকটা অশ্বিনী রায়ের সুপুরি গাছে উঠেছিল–তেমন উঠতেও পারে, তাকে ত কিছু একটা খেতে হবে কিন্তু সে আর সুপুরি গাছ থেকে নেমে আসে নি।
এই শেষ জায়গাটায় ঘটনাটি যেন আর ঘটনা থাকে না–আজকে সকালেরই একটা ঘটনা। লোকটির সুপুরি গাছে ওঠা আর নেমে না-আসা যেন তিস্তা নদী নিয়ে কত অসংখ্য কাহিনীর একটি হয়ে যায়। তিস্তা যেন আর নদীমাত্র থাকে না–সে তার প্রাচীন অস্তিত্বে ফিরে যেতে চায় এই একটিমাত্র কাহিনীকে অবলম্বন করে। তিস্তার দুই পাড় দিয়ে বাঁধ বাধা হয়েছে। সেই বাঁধের ওপর সবাই দাঁড়িয়ে। একটা ট্রানজিস্টারের আওয়াজও মাঝে-মাঝেই পাওয়া যায়–বোধহয় বানভাসিদেরই ভেতর থেকে। কিন্তু তিস্তা আর তিস্তানদী না থেকে তিস্তাবুড়ি হয়ে ওঠে। সেই তিস্তাবুড়ির মূর্তি পাটকাঠি আর পাট দিয়ে বানিয়ে লোকে পুজো করে। সেই তিস্তাবুড়ি, এখনো পারে তার বুকে ভাসমান একটা লোককে আকাশে উধাও করে দিতে।
বন্যার উপকথা জন্মাচ্ছিল–নতুন।
.
১৩৮. বাঘারু উদ্ধার সংক্রান্ত অনুসন্ধান
বাঁধের ওপরে বানভাসি মানুষের ভিড়টা এই নতুন কথার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন করে দর্শনীয় হয়ে ওঠে। বর্ষায় তিস্তায় বারকয়েক ফ্লাড ত হবেই, কোনো-কোনোবার তার মধ্যে একটা ফ্লাড বড় হয়ে যায়। বৃষ্টি যদি তেমন পড়ে তবে একটা ফ্লাডই গোটা তিনেক ফ্লাডের সময় জুড়ে বহাল থাকে। এবার যেমন বৃষ্টি হচ্ছে গত প্রায় সপ্তাহ খানেক ধরে তাতে এরকম একটা ফ্লাড ত প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু সেই হিশেবের বাইরে যদি ফ্লাড়টা চলে যায়, তা হলেই সকলে নড়েচড়ে বসে।
এবারের এই ফ্লাডটা এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে ঢুকছে। আজ, এই পরিবারের দিকটা সেদিক থেকে খুব দরকারী দিন। এখন এই বিকেলের দিকেও হাওয়া আর বৃষ্টির বেগ কিছুমাত্র কমে নি। কিন্তু সকলেরই মনে একটা হিশেব ছিল যে আজ দুপুরের পর থেকে এই বেগটা কমতে শুরু করবে। এখনো অনেকেই মনে মনে হিশেব কষছে যে বাতাস আর বৃষ্টির বেগ হয়ত একটু কমেছে, কিন্তু এখনই সেটা বোঝা যাচ্ছে না, রাতের মধ্যে নিশ্চয়ই বোঝা যাবে। এরকম ভাবাটাও অনেকটা মনে-মনে সান্ত্বনা পাওয়ার মত। এই সান্ত্বনাটুকু না থাকলে এখনই সকলকে প্রস্তুত হতে হয় যে কালও যদি এই বাতাস আর বৃষ্টি অব্যাহত থাকে তা হলে তিস্তার এই ফ্লাড হিশেবের বাইরে চলে যাবে। গেলে, তাদের কী করতে হবে–তা, এই বানভাসি মানুষজন, বা তখন যাদের নতুন করে বানে ভাসতে হবে, তারা, জানে না। কোনো ইস্কুলটিস্কুলে ক্যাম্প তৈরি হবে? বাঁধের ওপর থেকেও লোক সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে? ওপরে, বা নীচে, হয় ত এখানেই, বাধ ভাঙবে?
কিন্তু বাতাস আর বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল সেই অনুমানের আড়ালেও যেন আর মাথা বাঁচানো যায় না–যখন সত্যি করেই চোখের সামনে একটা লোককে তিস্তার জলে ভেসে এসে অশ্বিনী রায়ের চালে উঠতে দেখা যায়। সেটা ছিল, যেন সমস্ত হিশেবের বাইরে। এরকম বৃষ্টি আর বাতাস থাকলে মঙ্গলবার নাগাদ ওরকম একটা ঘটনা ঘটলেও ঘটতে পারত।
ফলে, বাঘারুর পরে আর নতুন লোকজন যখন সারে-সারে ভেসে আসে না এই প্রায় বিকেল পর্যন্ত, তখন ফ্লাডের হিশেব আবার প্রত্যাশিত সীমার মধ্যেই থাকে। একটা লোকই ভেসে এসেছে–তেমন ত যে-কোনো সময়ই হতে পারে। ঐ একটা লোক টেলিফোনে-টেলিফোনে যতই কেন না আরো অনেক লোক হয়ে যাক, মিলিটারির নৌকোর জন্যে যত ডাকাডাকিই হোক না কেন-বন্যার জলের বাড়া কমার সঙ্গে যাদের মরণর্বাচন জড়িত, তারা কিছুটা আশ্বস্তই হয়।
